কচুয়া শাড়ি দারাসিং লাফ

 

                                  

 

শাবানা বেগম গায়ে খেটে সংসার চালায়। সংসারটা ছোট। এক মেয়ে দীপ্তি, দুই ছেলে রিয়াজ আর রমিজ। মাত্র বাইশ বছর বয়সে বিধবা হয়ে দ্বিতীয়বার নিকা হতে পারত শাবানার। কিন্তু সে  সেই পথে হাঁটে নি। সে জানত, নিকা হলেও তাকে গায়ে খেটেই পেট চালাতে হবে।

 

ফুলপুর এক অজ পাড়াগ্রাম। এখানে গায়ে খাটা মানে ধনী লোকের বাড়িতে উঠান ঝাড়ু দেয়া থেকে গরুবাছুরের কুড়াসিদ্ধ করা, ধান পাকলে উঠানে সেই ধান শুকানো, রসুইঘরে ঢিপি-ঢিপি পেঁয়াজ-রসুন কাটা, যত রকমের ঝড়তি-পড়তি কাজ থাকে সংসারে – সব করা। আল্লাহ্‌ রহম,  শাবানার স্বাস্থ্য ভালো। শরীরে রোগ-বালাই নেই। শীত-গ্রীষ্ম তাকে কাবু করতে পারে না। খুব সে খাটে। চারটি পেট ভরাতে গিয়ে খাটনির একশেষ করে ছাড়ে সে।

সমস্যা হয়, পেটগুলো যখন দিনদিন বড় হয়। ভবিষ্যত উজ্জ্বল করার জন্য রিয়াজ-রমিজকে ইস্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে শাবানা। তারা যায় ইস্কুলে, লেখাপড়ায় মন আছে। কিন্তু উঠতি বয়সের খুদা তাদের। ডাইল-ভাতের ব্যবস্থা করতে গিয়ে কুল পায়না শাবানা। এমন সময় একজন প্রস্তাব নিয়ে আসে দীপ্তির নিকার।

-       নিকা দিবার লাগি তো টেকাপয়সা লাগে।

-       টেকাপয়সা লাগত নায়। ……..দুলার বয়সটাই কেবল একটু বেশি।

একটু বেশি মানে আটত্রিশ বছর বয়স। ঘরে আগের বিবি রয়েছে, নিত্যি রোগী। তার সেবার জন্যই আবার নিকা করতে চায় বিলাল মিয়া।

শাবানা বেগম চেয়েচিন্তে একখানি কচুয়া শাড়ি এবং একটি রূপার হার জুটিয়েছিল। এই পরে দীপ্তি স্বামীর ঘরে এল। শান্ত, চুপচাপ মেয়ে দীপ্তি। এতই শান্ত – তাকে দেখে মনে হবে, একেবারে নির্বুদ্ধি সে। বিলাল মিয়া তাতে খুশি হয়। দীপ্তি নীরবে পাগল সতীনকে স্নান করায়, চুলে তেল মাখিয়ে আঁচড়ে দেয়, ভাত বেড়ে খাওয়ায়। আর সতীপুত দু’জনের বাঁদরামি বরদাস্ত করে।  

                                                                                                                        

সতীন কেন পাগল হয়েছে, অনুধাবন করে দীপ্তি। বিলাল মিয়া লোকটা মহা বদ। রাতে তার উৎপাত অসহ্য হয়ে ওঠে। ছেলে দু’টোও বাপের স্বভাব পেয়েছে। বয়সে তারা দু’জন দীপ্তির চাইতে বড়। গায়ে গতরেও গাঁট্টাগোট্টা। তাদের নামে স্বামীর কাছে নালিশ করতে গিয়ে দীপ্তিকে শুনতে হয়েছে – সেই নাকি দোষী। তার চাল-চলন ঠিক নয় – ‘নিজোরে ঠিকমতো ঢাকি রাখতে পারস না!’

বিয়ের এক বছর পার হওয়ার আগে দীপ্তির এক মেয়ে-সন্তান জন্মায়। তারপর থেকে শুরু হয় আসল নির্যাতন। মেয়ে বিইয়েছে বলে সে অপরাধী। বিলালের নাকি মেয়ে হতেই পারে না। এটা আর কারোও মেয়ে। বিলাল মিয়ার সন্দেহের কারণ, সতীপুতদের নামে নালিশ করেছিল দীপ্তি। অপরাধের শাস্তি হিসেবে তাকে বাপের বাড়ি থেকে টাকা এনে দিতে হবে। তবেই এই মেয়েকে সে স্বীকৃতি দেবে।

রোজ এই নিয়ে দীপ্তিকে উৎপীড়ন করে বিলাল মিয়া। দীপ্তি ঘাড় গোঁজ করে থাকে। কিছুতেই সে যাবে না টাকা আনতে। বিলালের অসহ্য লাগে এই ঘাড়ুয়ামি। রাগে অন্ধ হয়ে কচি মেয়েকে উঠিয়ে আছাড় মারে উঠানে। চিৎকার করে দৌড়ে এসে মেয়েকে কোলে তোলে দীপ্তি। মেয়েটা কাঁদে না, নড়ে না, বুনি খাওয়াতে গেলে চোষে না, চোখ দুটো স্থির। দীপ্তি বেগম মেয়ের চোখে-মুখে জলের ছিটা দেয়। পাগলি সতীন পাখা নিয়ে এসে বাতাস করে। বলে – ‘মাথাত ফু দে’।

জলের ছিটা, না পাখার বাতাস, না মাথার তালুতে ফু – কোন টোটকায় কে জানে, কচি মেয়েটা লম্বা শ্বাস টানে আর কেঁদে ওঠে।

বিলাল মিয়া কোথাও নেই। ছেলে দু’টো তো কখনোই দিনমানে বাড়ি থাকে না। দীপ্তি বেগম ঘরে ঢুকে কচুয়া শাড়িটা পুঁটুলিতে বাঁধে। রূপার হারটা তো গলাতেই ছিল। সে পথে নামে। পেছন থেকে সতীন বলে – ‘……যা। এই রাইক্ষসোর থাকি বাঁচতে অইলে যা!’ শুনে দীপ্তির দুই চোখে নামে জলের ধারা। এই বাড়িতে এই একজনকেই সে ভালো বেসেছিল।

মেয়েকে কোলে নিয়ে সাত মাইল পথ হেঁটে সে এসে পৌঁছায় ফুলপুর। শাবানা বেগম যেন এই প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায়ই ছিল। সে জেনেছে – তার মেয়ের জীবনে দুর্দশার অন্ত নেই।  

                                                                                                                                   

দীপ্তি বেগম স্থির করে – মায়ের গলগ্রহ হয়ে থাকবে না সে। কী কাজ করবে, ভাবে সে। মায়ের মতো মানুষের বাড়িতে চাকরানি হবে? তাতে মন সায় দেয় না। গ্রামের একজন কাঁথা সেলাই করে রোজগার করে। পুরানো কাপড়ের কাঁথা নয়, কাঁথা-ফোড়ের শাড়ি, সালোয়ার-কামিজের কাপড় – এইসব। ওই বেটির কাছে যায় দীপ্তি। দীপ্তির সব কথা শুনে সে বলে – ‘মঙ্গলবারে সকালে আইও, ব্যবস্থা করি দিমু।‘

শমশের নগরে একটি মেয়েদের কোওপারেটিভ আছে। একশ টাকা দিয়ে সে তার মেম্বার হয়। এই টাকাটাও তাকে হাওলাত করে আনতে হয়েছে। কোওপারেটিভ থেকে সে কাপড় পায়, সুচ-সুতা পায়। ডিজাইনও তারাই দেয়। দীপ্তি বেগম দ্রুত রপ্ত করে ফেলে রান, ডবল-রান, বেঁকি, বখেয়া, জালি – সব রকমের ফোঁড়। তার হাতের কাজ পরিষ্কার – কোওপারেটিভের আপারা খুশি হন। মায়ের বাড়িতে একখানি আলাদা ঘর তুলে মেয়ে বুলবুলিকে নিয়ে সে জীবন শুরু করে। তার  রোজগারে মা-মেয়ের ভালোই চলে যায়। মাকেও মাঝে-মধ্যে টাকা দিয়ে সাহায্য করে দীপ্তি।  রিয়াজ যখন কলেজে ভর্তি হল, তাকে হাত খরচ বাবদ প্রতি মাসে কছু টাকা দেয় সে। বুলবুলি বড় হলে তাকেও স্কুলে ভর্তি করে দেয় । মেয়ে লেখাপড়া শিখে সরকারি চাকরি করবে – স্বপ্ন দেখে  দীপ্তি বেগম।

স্বপ্ন বেশিদিন টিঁকে না। বুলবুলির ইশকুল থেকে তাকে ডেকে পাঠান বড় আপা। ইশকুলে ছাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ডাক্তাররা এসেছিলেন। নাক-গলা-চোখ-কান এবং রক্ত-পরীক্ষা হয়েছিল ছাত্রীদের। বুলবুলির চোখে সমস্যা দেখেছেন ডাক্তাররা। তার চিকিৎসা করাতে মেয়েকে শমশের নগর জেলা হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললেন বড় আপা।

একেবারে ছোট বয়স থেকেই বুলবুলির চোখ লাল হয়। মাঝে মাঝেই সে বলে – ‘আম্মি, চোউখো বিষ করে’। দু’এক দিন পর তা সেরেও যায়। তাই এ নিয়ে দীপ্তি মাথা ঘামায় নি। ছোট

পুয়া-পুড়িন্তোর তো কত রকম অসুখ-বিসুখই করে থাকে। শমশের নগর হাসপাতালের ডাক্তার ওষুধ দেয়। ওষুধে সাময়িক আরাম হয়। কিন্তু কয়েক দিন পর আবার চোখ দুটো মাঝে মাঝে লাল হয়। বুলবুলির লেখাপড়া মাথায় ওঠে।

                                                                                                                       

 দীপ্তি ভেবেছিল – লেখাপড়া করলে মেয়ের জীবন তার নানি-আম্মির মতো হবে না। গভীর নৈরাশ্যের ফলে দীপ্তি বেগমের হাতের আঙ্গুলগুলো অবশ হয়। কাঁথার ফোঁড় তুলতে শক্তি পায় না সে।

কিন্তু শক্তি তাকে পেতেই হবে। মেয়েকে সে নিয়ে যাবে সিলেট। ভালো চিকিৎসা পেলে নিশ্চয় সেরে যাবে চোখ। টাকা লাগবে। রোজগার বাড়ানোর জন্য দিনরাত কাঁথার ফোড় তোলে সে। রাতে কুপির আলোয় কাজ করা মুশকিল। সে কিনে আনে একটি লন্ঠন। কুপির আলো থেকে লন্ঠনের আলোয় এই উত্তরন তার মনোবল বাড়ায়।

সিলেট, তারপর ঢাকা, সব জায়গায় ডাক্তাররা বলেন – এই চোখ ঠিক হবে না। ধীরে ধীরে অন্ধ হবে মেয়ে। ঢাকার ডাক্তার জিজ্ঞাসা করেছিলেন – ‘মাথায় চোট পাইছিল কোনোদিন’? দীপ্তি বেগমের মনে পড়ে – কচি মেয়েকে উঠানে আছাড় মেরে ফেলেছিল বিলাল মিয়া।

একজন বলে – ইন্ডিয়ায় নিয়ে গেলে হয়তো ভালো হবে চোখ। ইন্ডিয়ায়, হায়দ্রাবাদে খুব ভালো চোখের চিকিৎসা হয়।  

অসম্ভব। হায়দ্রাবাদে গিয়ে চিকিৎসা করানোর স্বপ্ন দেখার সাহস হয় না দীপ্তির। বড় বিমর্ষ লাগে তার। বিহ্বল চোখে শূণ্য পানে চেয়ে থাকে সে। কিন্তু মন জিনিসটা তো কেবলি ডিগবাজি খায়। আজ তার এক ভাব, তো কাল সম্পূর্ণ বিপরীত। বুলবুলি যখন বলে – ‘আম্মা, চোখুত বিষ করে’ , দীপ্তি বেগমে অন্তরাত্মায় তুফান ওঠে, যেন এক মথন-খুরা অনবরত ঘুঁটতে থাকে তার কলিজা। অসম্ভব যন্ত্রণা হয় দীপ্তির। বিদীর্ণ হতে হতে কাটে তার সারারাত। সকালে উঠে মন্ত্র-চালিতের মতো সে হাঁটা দেয় শমশের নগর অভিমুখে।

কোওপারেটিভের আপারা মন দিয়ে শোনেন দীপ্তির কথা। তারা বলেন – অনেক টাকার ব্যাপার। তার ওপর পাসপোর্ট-ভিসা …..।

-‘ইতা ব্যবস্থা করি দিব আমার ভাই।‘

ডাঁহা মিথ্যা বলে দীপ্তি। রিয়াজের সাথে এ নিয়ে কোনো কথাই সে বলে নি। রিয়াজ কেন, কারো সাথেই কোনো পরামর্শ করে নি। কার সাথে করবেই বা।

                                                                                                                                    

কোওপারেটিভ থেকে লোন পায় দীপ্তি। লোন, সঙ্গে কিছু নিজের জমানো টাকা, এর-ওর থেকে

হাওলাত, নানা জনের থেকে সাহায্য নিয়ে তৈরি হতে হতে দীপ্তি ভাবে, ভাগ্য ভালো, পৃথিবীর সব লোক বিলাল মিয়া নয়। রিয়াজ আর রমিজ সিয়ান হয়েছে। তারাই যোগাযোগ করে দালালের সাথে। দালাল তাদের ইরানি বর্ডার দিয়ে পার করায়। ইন্ডিয়ার দালাল তাদের নিয়ে তুলে দেয় কুমারঘাট ট্রেনে। সঙ্গে একজন লোকও দেয়। এইভাবে মেয়ে নিয়ে সে পৌঁছায় হায়দ্রাবাদে।

 

হাসপাতাল জিজ্ঞাসা করে নাম-ঠিকানা, আই-কার্ড দেখতে চায়। সঙ্গের দালাল ত্রিপুরার ঠিকানা দেয়, তার নিজের ঠিকানা। আই-কার্ড নিয়ে সমস্যা হয়। প্রথম দিন রেজিস্ট্রেশন হয় না। নিয়মের ফাঁক-ফোকর গলিয়ে, দালাল জানে ঘাৎঘোঁৎ, বুলবুলিকে নিজের মেয়ে পরিচয় দিয়ে মেয়ের চিকিৎসা শুরু হয়। দীপ্তি অথবা বুলবুলি, দু’টি নামের মধ্যে মুসলমান গন্ধ নেই বলে সুবিধে হয়।

 

ডাক্তার দেখে বলে, চিকিৎসায় সময় লাগবে কিছুদিন। র‍্যাটিনার চিকিৎসা হবে। ডান চোখে অপারেশন লাগবে। এই অবসরে দীপ্তি বেগম নিজের চোখও দেখায়। দিনরাত কাঁথার পুকি তুলে আজকাল যেন একটু আবছা দেখে সে। চক্ষুধন তার মূলধন। দীপ্তি চশমা পরে বোঝে, এতদিন কত কষ্ট হচ্ছিল তার।

রোজ টাকা কমে। দালালের সাহায্যে সে রূপার হারখানি বিক্রি করে। দালালের মায়া হয়। সে দীপ্তির রোজগারের ব্যবস্থা করে। কাছেই এক নার্সিং হোমে রোগী দেখার কাজ করে দীপ্তি। সেবা  তার রক্তে। যখন সে রোগীকে স্নান করায় কিংবা চুল বেঁধে দেয়, মনে পড়ে সতীনের কথা। এ যেন তার আর জন্মের স্মৃতি। দীপ্তি বেগমের নাভিমূল থেকে দীর্ঘশ্বাস ওঠে।

চিকিৎসাশেষে কৈলাসহর ফিরে আসে তারা। এবার বাড়ি ফেরার পালা। আনন্দ আর ধরে তা তাদের। বুলবুলির চোখ ভালো হয়ে গেছে। তবে এক বছর পর একবার গিয়ে দেখাতে হবে। দেখাবে দীপ্তি। অবশ্যই দেখাবে। নিজের ওপর বিশ্বাসে তার হাঁটার ভঙ্গি বদলে গেছে আজকাল।

হায়দ্রাবাদ থেকে মেয়ের জন্য জরির কাজ করা ঘাঘরা-ব্লাউজ কিনেছে সে। সেটি পরে মেয়ে

                                                                                                                                     

বাড়ি যাবে। বিজয়ীর প্রত্যাবর্তন তো জমকালো হতে হয়।

এবার অন্য দু’জন লোক তাদের পার করাবে। দীপ্তি বলে – মেয়ে ফাল দিতে পারবে না। দিলে তার চোখের ক্ষতি হবে। সদ্য অপারেশন করা চোখ।

-       ‘তেইলে তো হে পারে কেউরে উবাইতে অইব। আমরা তাইরে কুরো তুলি হের আতো লামাই দিমু। টেকা বেশি লাগব।‘

লাগুক। টাকা দেবে দীপ্তি। রোগীর সেবা করে তার হাতে টাকা আছে। ভেবেছিল, ফিরে গিয়ে এই টাকা দিয়ে কর্জ চুকিয়ে দেবে। সে না হয় পরে হবে।

গভীর রাতে তারা রওয়ানা হয় যে পথ দিয়ে ঢুকেছিল, সেই পথে। একটু দুরেই কাঁটাতারের বেড়া। দুজন মেয়ে মানুষ হাত ধরাধরি করে হাঁটছে– যেন লকলকে ডুগাসুদ্ধা বর্ষার কচি লাউ। দালাল দুজন চোখে চোখে কথা বলে। তাদের কামদণ্ড অস্থির হয়।

সহসা আক্রান্ত হয়ে স্থান-কাল ভুলে পরিত্রাহী চিৎকার করে দীপ্তি আর বুলবুলি। ছুটে আসে অনতিদূরে পাহারারত বি.এস .এফ। দালাল দু’জন ততক্ষণে পালিয়েছে।

ভোররাতে তাদের থানায় নিয়ে গিয়ে হস্তান্তর করে জওয়ানরা। নিকটবর্তী পুলিশ-কোয়ার্টার থেকে ডেকে আনা হয় এ.এস.আই পুণ্যবতী চাকমাকে। দীপ্তিকে পুণ্যবতী জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সে অকপটে বলে সমস্ত ঘটনা – একেবারে শুরুর থেকে, কবে কীভাবে সে বর্ডার ক্রস করেছিল, কেন এসেছিল ইন্ডিয়ায়  . . . . আদ্যোপান্ত বলে দীপ্তি।  

-‘তুমরার লগে পুরুষমানুষ নাই?

-‘যেগুলা আছল, পুরুষই তো !’

জবাবটা ধারালো। পুণ্যবতী কী যেন ভাবেন। একজন কন্‌স্টেবলকে ডেকে চা আর গ্লুকোজ বিস্কুট আনিয়ে খেতে দেন এই দুই অপরাধীকে। দশ বছর পুলিশে চাকরি করে পুণ্যবতী মানুষের

চোখ পড়তে পারেন। এই দুই অপরাধীর চোখগুলো অপাপবিদ্ধ। তাদের বসিয়ে রেখে কোথায় যেন চলে যান পুণ্যবতী।

এস.আই অরবিন্দ দেবনাথ বলেন – ‘কী করা যায়, কও দেখি পুণ্যবতী?’

                                                                                                                             

-‘এরারে বাংলাদেশ ফিরৎ পাঠাইয়া দেন স্যার।‘

অরবিন্দ দেবনাথের রিটায়ার করার আর মাত্র তিনমাস বাকি। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে এই জাতীয় কেইসে রাষ্ট্রের ভূমিকা দেখে দেখে বীতশ্রদ্ধ তিনি। অরবিন্দ জানেন – নিয়ম মানতে হলে এই দু’জনকে স্টেট উইমেন্‌স হোমে পাঠাতে হবে। তারপর শুরু হবে দুই রাষ্ট্রের মধ্যে চিঠি চালাচালি। সেটা শুরু হতেই ক’মাস লাগে কে জানে। এখান থেকে তা হবে না, দিল্লিতে হোম মিনিস্ট্রির হাতে চলে যাবে পুরো ব্যাপার। বাংলাদেশ হয়তো স্বীকারই করবে না – এই দু’জন মা আর মেয়ে তাদের নাগরিক। এইভাবে মাস যাবে, বছর যাবে, আরো আরো বছর যাবে। এই সময়টা এই দু’জনকে জেলে রাখা হবে। এইভাবে দু’টি জীবন ধ্বংস হবে। শেষ পর্যন্ত হয়তো এদের পুশব্যাক করা হবে। সে আরেক ঝঞ্ঝাট !

স্যারকে ভাবতে দেখে পুণ্যবতী অপেক্ষা করেন।

গোঁফগুলো তর্জনী দিয়ে অনেকক্ষণ ঘষেন অরবিন্দ। তারপর একসময় থামেন। পুণ্যবতীকে বলেন – ‘তারারে এইখানে লইয়া আও তো।‘

দীপ্তি বেগম বলে – ‘আব্বাজান, এই পুড়ির চোউখোর লাগি অত আড়াঝ-পাড়াঝ . . . অখন তাই যে কান্দে, কানলে তো চোউখগুলা আবার যাইব !’ হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলে দীপ্তি।

অরবিন্দ দেবনাথ পুণ্যবতীকে বলেন – আজকের দিনটা ওদের কোথাও রাখার ব্যবস্থা করতে। ব্যাপারটা যেন একদম জানাজানি না হয়। জানাজানি হলে বাধ্য হয়ে এদের সরকারের হাতে তুলে দিতে হবে।

-‘আমার বাড়িত নিয়া রাখি স্যার।?

-‘ভালা।‘

পুণ্যবতী ওদের নিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বেরোতে যাচ্ছে, অরবিন্দ বলেন – ‘দাঁড়াও, প্ল্যানটাতে একটা ভুল রইয়া গেছে . . . । বি.এস.এফের কাছে তো হ্যান্ড-ওভারের কাগজপত্র আছে ….., কাজেই এইভাবে হইব না। তুমি এদের মহিলা হোমে পাঠাইয়া দেও।‘

                                                                                                                             

স্যারের কথামতো কাজ করেন পুণ্যবতী। তারপর এসে জিজ্ঞাসা করেন – ‘এইবার কী করবেন স্যার?’

নিজের বদমাশি হাসিটি হাসেন অরবিন্দ। বলেন – ‘বুঝলা না, মহিলা হোমের দেয়াল চাইরদিকে ভাঙ্গাচোরা। . . . ওইখান থ্যে ওদের ভাগানের ব্যবস্থা করুম। . . . কারোর ঘাড়ে দোষ পড়ব না। হোমের বাউন্ডারি ওয়াল রিপেয়ারের লাইগ্যা দুই বছর আগেই চিঠি গেছে সরকারের কাছে। মেয়েলোকও ভাগতে পারে, এই কথা সরকারের মাথায় ঢোকে না। দেখবা, এরারে ভাগাইলে রাতারাতি রিপেয়ার স্যাংশন হইব!‘ 

এস.আই  খবর পাঠান দারা সিং-কে।

এটা সর্বজনবিদিত ব্যাপার যে বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় খানসেনাদের ধর্ষণের ফলে এই মানুষটা জন্মেছিল এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তার মা তাকে ফেলে দিয়ে চলে গিয়েছিল। এক হতদরিদ্র দিনমজুর তাকে পালন করেছিল। নাম রেখেছিল সুবল। বয়স বাড়ার সাথে এই ছেলের খুদার অন্ন যোগানো অসম্ভব হয়ে উঠল। দরিদ্রের সংসারের যৎসামান্য আহারে তার ক্ষুন্নিবৃত্তি হয় না। রোজ তার নামে নালিশ আসে, প্রতিবেশিদের ঘরে ঢুকে খাবার চুরি করে সে। লোকজনের উঠানের গাছ থেকে পাকা কাঁঠাল কিংবা আনারস অথবা কলা-পেয়ারা চুরি করে নিয়ে যায় সুবল। রোজ রোজ নালিশ শুনে অতিষ্ঠ হয়ে সুবলকে খুব পিটিয়েছিল সুবলের পালক পিতা । সুবলের তখন বারো বছর বয়স। সেইদিনই বাড়ি ছেড়েছিল সুবল। কয়েক মাইল হেঁটে এসে উপস্থিত হয়েছিল কৈলাসহরে, এবং সেই থেকে সে নিজের পেট চালাতে শুরু করেছিল প্রথমে মন্দিরের বাইরে খুলে রাখা জুতা চুরি করে। ক্রমে তার শরীর এমন দশাসই হল, হিন্দী সিনেমার পালোয়ান দারাসিং-এর নামে তার  নাম রাখল স্থানীয় লোকেরা। এখন সে পুলিশের ইনফরমার। এবং এ ছাড়াও পুলিশের জন্য নানা আ-কাম বিশ্বস্ততার সঙ্গে করে দেয়। দারা সিংকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে নিশিন্ত বোধ

 করেন ও.সি। লোকোটার খুব উপস্থিত বুদ্ধি, পরিস্থিতি সামাল দিতে ওস্তাদ এবং আলুর বাতিক নেই।

 গভীর রাতে দারাসিং পথে বেরোয় দীপ্তি এবং বুলবুলিকে নিয়ে। মহিলা হোমের পেছনের

                                                                                                                             

 ভাঙ্গা দেয়াল দিয়ে বেরোয় তারা। বাইরে অনেকটা খালি জঙ্গুলে জমি। দুনিয়ার আবর্জনা – ভাঙ্গা কাঁচ, প্লাস্টিক, মরচে ধরা টিন, লোহালক্কড়ে নরক করে রেখেছে জায়গাটা। খুব সাবধানে পা ফেলে ওরা। একটি সাপ সরসর করে সরে যেতে যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় এই উৎপাতের দিকে। খাদ্য অন্বেষণে বিঘ্ন হল বলে বিরক্ত বোধ করে সে। দু’জন নারীর সাথে এক দ্যৈত্যাকার পুরুষ দেখে সাপটি সাত-পাঁচ ভাবে।  চেরা জিভ বার করে ব্যাপার কি, আন্দাজ করতে চায়। ততক্ষণে মনুষ তিনজন অনেক দূরে চলে গেল বলে সাপটি নিশ্চিন্ত হয় – না, তার অনিষ্ট সাধন করতে চায় না তারা। তবে মানুষ জাতটাকে বিশ্বাস করা উচিত নয়। তাই আহার-অনুসন্ধান মুলতুবি রেখে গর্তে   লুকায় সাপ।

দারাসিং-এর চেহারা দীপ্তি বেগমকেও ভয় পাইয়েছে। সমানে তার বুক ধড়ফড় করে। সে আল্লাহ্‌কে স্মরণ করতে করতে, বিড়বিড় কড়ে – ‘বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুরু . . . . ।‘

বর্ডারের কাছাকাছি চলে আসে তারা। এই সব জায়গার নাড়িনক্ষত্র দারাসিং-এর নখদর্পণে। কোথায় বি.এস.এফ আছে কিংবা নেই – গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারে সে। বুলবুলিকে পিঠে নিয়ে চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতায় লাফ মেরে সে উঠে দাঁড়ায় একটি পিলারের ওপর। বেড়ালের নিঃশব্দ পায়ে লাফ দিয়ে পড়ে ওপারে। দীপ্তির সারা শরীর থরথর কাঁপে – ওপারে মেয়েটিকে মাটিতে পেঁড়ে ধরে যদি ! আজ  দীপ্তি পরেছে সেই কচুয়া শাড়ি। এটা ঠিক করে নি সে। শাড়িটি অপয়া . . ।

 

মুহূর্তে পিলারের ওপর আবার দেখা দেয় দারাসিং। হাত দিয়ে টেনে তোলে দীপ্তিকে। নিজে বাঁদরের মতো ঝুলে থেকে দীপ্তিকে দাঁড়ানোর জায়গা দিয়ে বলে – ‘ফাল মার!’

দীপ্তি বেগম লাফ দেয়। শব্দ হয় – ঝুপ। দারা সিং কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করে – শব্দ শুনে বি.এস.এফ এগিয়ে আসছে না তো!

                                                                                                                        

না, ধারেকাছে নেই ওরা। সে নিশিন্ত হয়ে ফেরার পথ ধরে।

দীপ্তি বেগম ইতি-উতি তাকায়। ঝোপের আড়াল থেকে ফিশফিশ ডাক শোনে – ‘আম্মি!’

                                                                                                                                

মেয়ের হাত ধরে ছুট লাগায় দীপ্তি। সঙ্গের স্যুটকেসটা কম ভারি নয়। দৌড়াতে কষ্ট হচ্ছে তার। তবু জান হাতে নিয়ে দৌড়ায় ওরা। অনেকক্ষণ দৌড়ানোর পর তারা এসে দাঁড়ায় ধানক্ষেতের একটি চওড়া আলের ওপর। এটি আল এবং রাস্তাও। ভোরের আলো ফুটছে তখন। দূরে দেখা যাচ্ছে কয়েকটি ঘরবাড়ি এবং একটি মসজিদের চূড়া। দীপ্তি বোঝে, ঠিক পথেই এসেছে তারা।

 

তখন থানার বাইরেও ভোর। দারাসিং এসে বসে কালভার্টের ওপর। দারোগাবাবু এলে তাকে খবর দিতে হবে –  যে কাজ তিনি দিয়েছিলেন, তা সে করেছে। কিন্তু বেলা আটটার আগে তিনি আসবেন না। আটটা বাজার দেরি আছে।

দারাসিং ঠোঁটে বিড়ি গুঁজে ফস করে দেশলাইর কাঠি জ্বালায়। ভোরের ফুরফুরে হাওয়া নিবিয়ে দেয় কাঠি। কী মনে করে বিড়িটা ফেরৎ কোমরে গুঁজে রাখে সে। তারপর টানটান শুয়ে পড়ে কালভার্টের ওপর। চোখ বুঁজতেই গতরাতের এক অতি দ্রুত সবুজ লাফের সাথে তীব্র এক গন্ধ, . . ঝোপঝাড়ের আড়ালে কোথাও কি ফুটেছিল নাগকেশর . . . কিন্তু এখন তো নাগকেশর ফোটার সময় নয়  . . .সেটা কিসের গন্ধ ছিল তবে? দারাসিং-এর মাথার ভেতরটা ঝিমঝিম করে।

                                                       

দারাসিং তার জন্ম-বৃত্তান্ত জানে। এই নিয়ে শিশুকাল থেকে ঘৃণা, অনাদর, বিদ্রুপ আর অবহেলা জুটেছে তার। এসব কারণে, অথবা তার ধর্ষিতা মায়ের নিরন্তর যন্ত্রণার, ভয়ের আর অসহায়ত্বের রক্তে গড়া বলেই হয়তো যৌনতার প্রতি এক মজ্জাগত ভয় তার। দারাসিং-এর যাপন প্রণালী ভিন্ন। নারী-সংসর্গ সে এড়িয়ে চলে। কাল শেষরাতের সবুজ লাফটির সাথের উগ্রগন্ধটি ভোলার জন্য উঠে বসে ভোরের হাওয়াকে হাতের আড়াল করে বিড়ি ধরায় দারা সিং। যোনিপুষ্পের গন্ধ তার জন্য নয়। হঠাৎ কী মনে করে, যে দারাসিং রাস্তা থেকে আধপোড়া বিড়ি উঠিয়ে খায়, সদ্যোধরানো বিড়িটি দূরে ছুঁড়ে ফেলে দারোগাবাবুর কোয়ার্টারের দিকে হাঁটে। অপেক্ষা না করে খবরটা এখনি দিয়ে আসবে দারাসিং।

মাঝে মাঝে, কাপড়ে কাঁথাফোড় তুলতে তুলতে দীপ্তিবেগমের মনে পড়ে ইন্ডিয়ার অভিজ্ঞতার

                                                                                                                           

 কথা। কত লোকের সাহায্যের কথা, শেষ মুহূর্তে এসে বিপদ হল, আল্লাহ রহম, বিপদ কাটলও। আর ওই দৈত্যের মতো একটা লোক, দেখলেই ভয়ে বুক কাঁপে, কিন্তু হাত ধরে যখন পিলারের ওপর টেনে তুলল, একটুও ব্যথা দেয় নি। আর আগের দিনের ওই দুটি লোক, দেখে মনে হচ্ছিল ভালোমানুষ!  চেহারা দেখে মানুষ চেনা যায় না। চেহারা দেখে মানুষের বিচার করতে নেই। দীপ্তির চিন্তা হয় আজকাল। তার মেয়ে বড় হচ্ছে, চেহারা দেখে সে না ভুল করে ! জীবনটাকে নষ্ট না করে!  এসব ভাবনার সাথে তার দক্ষ হাত নিজে নিজে কাপড়ের ওপর পেন্সিলে আঁকা ডিজাইনকে স্থায়ী করে তোলে।

বুলবুলি আজকের মতো বই বন্ধ করে বলে – ‘ আম্মি, চল ঘুমাই।‘ জবাবে দীপ্তি বলে – ‘চেয়ারা দেখিয়া মানু চিনা যায় না . . . ।‘ বুলবুলি বোঝে, আম্মি কেন একথা বলছে। সে গভীর চোখে তাকায় মায়ের মুখের দিকে। সে জানে, দু’মাস পর আবার তাকে হায়দ্রাবাদে নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখাতে হবে, এই চিন্তায় অস্থির লাগছে আম্মির। তাই মানুষের ওপর ভরসা রাখার পাঠ নিজেকে অনবরত পড়াচ্ছে আম্মি।   

 

গল্পে ব্যবহৃত সিলেটি শব্দের অর্থ

অইলে, অইব (হলে, হবে) আইও (এসো) আতো (হাতে) আড়াঝ-পাড়াঝ (যোগাড়-যন্ত্র) ইতা (এসব) উবাইতে (দাঁড়াতে) কচুয়া (সবুজ) কুপি (লম্ফ) কুরো (কোলে)ঘাড়ুয়ামি (জেদ) পুকি (ফোঁড়) পুয়া-পুড়িন্তোর (ছেলে-মেয়েদের) ফাল (লাফ) বিষ করে (ব্যথা করে) বুনি (স্তন) বেটি (মহিলা) মথন খুরা (মন্থন দণ্ড ) লামাই (নামিয়ে) চেয়ারা (চেহারা) সিয়ান (বড়)

Comments

Popular posts from this blog

স্ত্রীর পত্র