আমি প্রণতি চক্রবর্তী

আমি প্রণতি চক্রবর্তী। বয়স এখন বাহাত্তর। এই বয়সে এসে জীবনের পেছনদিক দিনের অনেকটা সময় জুড়ে থাকে। কত কথা মনে পড়ে। এখন আর তখনের মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। এ যেন এক অন্তবিহীন পথ পেরিয়ে আসার গল্প। অন্তবিহীন পথ পেরিয়ে নিজের কাছে ফিরে  আসার গল্প।

ধর্মনগরে জন্ম। সেখানেই বড় হওয়া। বাবা গার্লস ইশকুলের ইংলিশের শিক্ষক ছিলেন। খুব ভাল পড়াতেন বলে নামডাক ছিল। অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার ছিলেন। স্কুলের লাগোয়া সরকারি কোয়ার্টারে দুই বোন, অলি আর মলি, এক ভাই প্রবাল, বড় হয়েছি। বাড়িতে বাবা আমাদের যত্ন করে পড়াতেন।

কেরানি আর মাস্টার, এবং হাতে গোনা কয়েকজন বিভিন্ন সরকারি অফিসের ছোটবড় অফিসার – এই পর্যন্তই ছিল এই শহরের চিকুরিজীবীদের সংখ্যা। আর ছিলেন কয়েকজন উকিল, জনা তিনেক সরকারি ডাক্তার, কয়েকজন নার্স। আর সব ছোটখাটো ব্যবসায়ী, দোকানদার। কাঁচাপয়সা কামানো কনট্রাক্টরও ছিলেন কয়েকজন। সবাই সবাইকে চিনতেন, কিন্তু মেলামেশা করতেন পদমর্যাদা বুঝে। অফিসাররা সাধারণ চাকরেদের সাথে মিশতেন না। তাদের মেয়েরাও ইশকুলে হাইহিল জুতো পরে গটগটিয়ে হাঁটত, সর্বশরীরে লেগে থাকত অফিসারকন্যাসুলভ ফুটানি। দু’চার বছর বনবাস কাটিয়ে তাদের বাবারা ফিরে যেতেন আগরতলা। তাঁদের মেয়েরা তুলসীবতী ইশকুলে ফিরে গিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচত।

স্কুলের বেশির ভাগ ছাত্রীরা আসত আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে। কেউ তিন মাইল, কেউ বা পাঁচ-ছ’ মাইল কাঁচারাস্তা খালি পায়ে হেঁটে। বর্ষায় রাস্তাগুলোতে এক হাঁটু কাদা, শীতে কাদাগুলো শুকিয়ে ধুলো। তাদের অনেকেই ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চে বসে ঘুমে ঢুলে পড়ত। এবং পড়া ধরলে পারত না বলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থেকে স্যার-দিদিমণিদের বকুনি খেত।

আমরা থাকি স্কুল-সংলগ্ন কোয়ার্টারে। আমাদের বাবা এই ইশকুলেরই ডাকসাইটে স্যার। আমি ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল। গড়গড়িয়ে পড়া পারি। কয়েক পা হাঁটলেই বাড়ি। মাত্র তিন ভাইবোনের ছিমছাম পরিবার। ক্লাসের মেয়েরা আমাকে দেখত সম্ভ্রমের চোখে। মনে হত, ওরা আমার মতো জীবন চায়। এখন স্পষ্ট বুঝি, আমিও ওদের অবজ্ঞার চোখে দেখেছি। কাঁচা বয়সে যেরকম দেখেছি, সেরকম শিখেছি। বললাম না, ধর্মনগরের লোকজন  স্টেটাস বুঝে মানুষের সাথে ব্যবহার করত। আজকাল ক্লাসের সেইসব মেয়েদের কথা নাম ধরে ধরে মনে পড়ে। তাদের কাছে পেতে যতটা ইচ্ছে করে, মলিকে ততটা করে না। মলির সাথে একদম মেলে না আমার।

ধর্মনগরে একজন ছিলেন, অমলেন্দু দত্ত। এস.ডি.ও অফিসের কেরানি। তিনি খুব ভালো গান জনতেন। ধর্মনগরের ছেলেমেয়েরা ব্যাচে ব্যাচে ওঁর কাছে গান শিখত। আমিও শিখতাম,হিন্দুস্থানী ক্লাসিক্যাল। ভালোই শিখেছিলাম গান। রোজ সকালে গলা সাধতাম। যতদিনে ক্লাস ইলেভেনে উঠলাম, ভৈঁরো থেকে মালকৌষ …. নানা রাগ-রাগিনীতে গান গাইতাম। আমার গলা নাকি খুব মিষ্টি, বলত সকলে।

মিষ্টি গলার গান শুনে আমার প্রেমে পাগল হওয়া একজনের সাথে আমার বিয়ে হয়েছিল। আমিও প্রেমে পড়েছিলাম কি না, সেকথা আজ আর হলপ করে বলতে পারব ন। তবে ডগমগিয়ে উঠেছিলাম। কারণ বিয়ের কল্যাণে এঁদো শহর ধর্মনগর থেকে গৌহাটিতে জীবন স্থানান্তরিত হয়েছিল। হ্যাঁ, বড় শহর, বিশেষ করে কোলকাতার প্রতি মোহ তৈরি হয়েছিল। গল্পের বইয়ে কোলকাতার জীবন সম্বন্ধে যে ধারণা হয়েছিল, তা আমাকে আকর্ষণ করত। কোলকাতা যখন হল না, গৌহাটিই বা মন্দ কী – ভেবেছিলাম।

কিছুদিন কলেজে পড়েছিলাম। পাশটাশ করার আগেই বিয়ে হল। পাত্র ভালো, সরকারি চাকরি করে, ভালো চাকরি, জাতেও মেলে। বয়সের পার্থক্য একটু বেশি – কিন্তু সেটা কোনো ব্যাপার না। ডগমগ, গদগদ বিবাহিত জীবন। প্রাণ ভরে সিল্কের শাড়ি পরে সাজিগুজি, সিনেমা দেখি, টুকটাক শখ মেটাই। আস্তে-ধীরে গৌহাটি শহরের ছোটখাটো ফাংশনে গান গাওয়ার সুযোগ পাই। গান গেয়ে হাততালি কুড়াই। জীবন ধন্য।  

বিয়ের দু’বছরের মাথায় ছেলে হল। তারো দু’বছর পর মেয়ে। ছেলেমেয়েদের মানুষের মতো মানুষ করার নেশায় মত্ত হয়ে রইলাম বছরের পর বছর। নামী স্কুল। ইংলিশ মিডিয়ম। তারপর আই.আই.টি, আই.আই.এম। এসব মদে সাংঘাতিক নেশা। সে নেশা আরও বাড়িয়ে দেয় চাকরিতে স্বামীর ক্রমাগত উন্নতি। সেসব নেশা যেদিন কাটল, নিজের দিকে চেয়ে দেখি – কেমন ছিবড়ে হয়ে যাওয়া এক অস্তিত্ব।

নেশা কেটে যাওয়ার পেছনে ছোট্ট একটা গল্প আছে। স্বামী গিয়েছিলেন লক্ষনৌ – কম্পিউটার ট্রেনিং নিতে। সেসব দিনে কম্পিউটারে কাজ করতে শিখতেই হচ্ছিল সরকারি চাকরেদের। তিনমাসের ট্রেনিং শেষে ফিরে এলেন। গৌহাটিরই আরেকজন, মীনাক্ষী ডেকা, স্বামীর সাথেই ট্রেনিং নিয়ে ফিরে এসেছে। তার সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে আমার স্বামীর। একদিন মেয়েটাকে খেতে ডাকলেন আমার স্বামী। মীনাক্ষী এল। আমি তখন মাংস রাঁধছিলাম। স্বামী পরিচয় করিয়ে দিলেন। মীনাক্ষী অসম্ভব ব্রিলিয়ান্ট। কম্পিউটার দক্ষতায় সবাইকে ছাড়িয়ে। স্বামীর চোখে সেদিন সেই মুগ্ধতা দেখেছিলাম, বহুবছর আগে আমার দিকে যে চোখে তাকাতেন, সেই চোখ।

আমার রান্না হতে বাকি আছে – তাই মীনাক্ষীকে নিয়ে গেলেন ছাদের বাগান দেখাতে। আমাকেও সঙ্গে ডাকলেন। বাগানটা আমারই করা। কোনোদিন সঃেই বাগানে তাঁর আগ্রহ দেখি নি। সেদিন বাগান আলো করে বেলফুল ফুটেছিল। জুলাই মাসের মেঘচাপা জ্যোৎস্না আর বেলফুলের সুবাস ….। আমার রান্না শেষ হয়নি বলে চলে এলাম নিচে। সেই রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর, রাত একটু বেশিই হয়ে গিয়েছিল, স্বামী অকাতরে ঘুমোলেন। আর আমি নীরবে কাঁদলাম।  

এরপর কয়েকদিন ধরে নিজেকে বোঝানোর কত চেষ্টা করলাম, আমার স্বামী এমন কিছুই করেন নি , যার জন্য আমি এতটা মুষড়ে পড়েছি। সংসারের চার দেয়ালের ভেতর থেকে থেকে আমার মন ছোট হয়ে গেছে, আমি বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। এটা কোনো কাজের কথা নয়। বিয়ের পর পর আমার উচ্ছ্বাসের বাড়াবাড়ি দেখে শাশুড়ি বলতেন – ‘ইমম্যাচিওরড’। আজ এত বছর পর ম্যাচিওরড হওয়ার চেষ্টা করি। সারাদিনের চেষ্টা সন্ধ্যায় ধরাশায়ী হয় স্বামীর কোনও না কোনও মন্তব্যে অথবা অচরণে। মীনাক্ষী ডেকা তাঁরই অফিসে এসেছে ডেপুটেশনে। জুনিয়র কর্মচারিদের কম্পিউট্র ট্রেনিং দিচ্ছে। কী অসম্ভব ব্রিলিয়ান্ট সেই মেয়ে! স্বামীর মুখে মীনাক্ষী ডেকার প্রশংসা শুনতে শুনতে রবীন্দ্রনাথের ‘সাধারণ মেয়ে’ কবিতাটা মনে পড়ে।

খেয়াল করে দেখলাম – আমার জোরের জায়গা ছিল সঙ্গীত। চর্চার অভাবে সেই জোরটা আর নেই। বয়স হয়ে গেছে পঞ্চাশের ওপর। রান্নাবান্নায় পারদর্শী হওয়ার চেষ্টায় – স্বামী খেতে ভালোবাসেন তাই, আর ছাদে বাগান করে অভিভূত থেকে নিজেকে জলাঞ্জলি দিয়েছি। কেউ একদিনও বলে নি – ‘গান এভাবে ছেড়ে দিও না’। বাবা-মাও বলেন নি। তারা দেখেছেন – মেয়ে কত সুখী, তাই হয়তো বলেন নি।

আজকাল কেন জানি – ধর্মনগরের দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে। বাবার মাস্টারির রোজগারে তিন ছেলেমেয়ে আর এক ভাইপোকে নিয়ে সংসার চলত টেনেটুনে। মা যত্ন করে সব্জিবাগান করতেন। খরচ কমানোর জন্য খুব পরিশ্রম করতেন মা। আমাদের জামাকাপড় নিজে সেলাই করতেন। সারাদিন খাটতেন সংসারের পেছনে। আর আমাদের লেখাপড়ার দিকে নজর রাখতেন। সেই অনাড়ম্বর সুখের দিনগুলোর জন্য প্রাণ কাঁদে। এই কান্নার মানে নিজেই বুঝি না। কেবল মনে হয় – কী যেন নেই জীবনে।

এই বিষণ্ণতার মাঝে এক বিকেলে তানপুরার ধুলো ঝাড়লাম। আঙ্গুল ছোঁয়াতেই তারগুলো যেন কেঁদে উঠল। গলা খুলতে গিয়ে সে এক হাস্যকর অবস্থা। চর্চার অভাবে সুর-তাল, কড়ি-কোমল – সব তালগোল পাকিয়েছে। খুব খারাপ লেগেছিল। কিন্তু হাল ছাড়ি নি। কয়েকদিন লাগাতার চেষ্টার পর আগের অনায়াস সঞ্চরণ পুনরার্জন না হলেও অনেকটা এগোই।  

এই পাড়ায় বাড়ি করে উঠে এসেছি আমরা কয়েক বছর আগে। বড়লোকের পাড়া। সুন্দর সব বাংলোবাড়ি। আমার নিয়মিত সঙ্গীতচর্চার ফলে এক-দু’জন করে প্রতিবেশীরা আগ্রহী হয়ে ওঠেন। অনুরোধ করেন তাদের ছেলেমেয়েদের গান শেখাতে। আমি রাজি হই। আমার ছেলেমেয়ে দু’জনেই বাইরে পড়ে। আমার সময়ের অভাব নেই। গান শেখানো শুরু করি। প্রাণ ঢেলে শেখাই। গানের মাস্টার হিসেবে আমার নাম হয়। আর শেখাতে শেখাতে নিজেরও চর্চা হয়।

আমার স্বামী চাকরিতে ধাপে ধাপে উন্নতি করে শহরের ধনী এলাকায় এই বাড়িটি করেছেন। আশেপাশের সকলেই বড় চাকরে। তাদের ছেলেমেয়েদের গান শেখাই। সেই সুবাদে, একজন ছাত্র – যার বাবা আকাশবাণীর ডায়রেক্টর, আমাকে রেডিওতে গান গাওয়ার সুযোগ করে দিলেন।  মীরাভজন এবং রাগপ্রধাণ গান গাওয়ার নিয়মিত ডাক পড়ছিল। গাইয়ে হিসেবে বেশ নাম হল আমার। ফাংশনে প্রণতি ছক্ররবর্তীর গান শুনতে লোকের ভিড় হল। এই করে কিছু নতুন লোকজনের সাথে পরিচয় হল। এঁদের একজন আমাকে বললেন – তাঁর ইশকুল আছে একটা। হতদরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েদের পড়ানো হয় সেই ইশকুলে। আমি যদি সেইসব ছেলেমেয়েদের সপ্তাহে একদিন কিংবা দু’দিন গান শেখাই।

রাজি হয়ে গেলাম। শুরু হয়ে গেল জীবনের এক নতুন যাত্রা। এই যাত্রার প্রথম লগ্নে বুঝিনি – এর ফল সুদুরপ্রসারী হবে। সেই ইশকুলের কয়েকজন ছাত্রছাত্রীর গলা খুব ভালো। একটি ছাত্র, শ্রীকুমার দাস, বাবা তার মাছওয়ালা, জাল দিয়ে আওড়-বাওড় থেকে মাছ ধরে বিক্রি করে। গরিবের তস্য গরিব। শ্রীকুমারের গলা কী যে ভালো, বলে বোঝাতে পারব না। আরোও ক’জন ছাত্রছাত্রীও ভালো। ওদের গান শিখিয়ে বড় সুখ। শ্রীকুমার খুব দ্রুত শিখে নিচ্ছিল। ওকে ‘ইন্ডিয়ান আইডল’ বানাতে উঠেপড়ে লাগলাম।

আমার স্বামী ততদিনে রিটায়ার করেছেন। তিনি চান – আমি যেন সর্বক্ষণ বাড়ি থাকি। দায়িত্বপূর্ণ সরকারি পদ থেকে অবসিত হয়ে হঠাৎ তাঁর জীবনটা বড় ফাঁকা হয়ে গেছে। ক্ষমতার স্বাদ থেকে হঠাৎ-বঞ্চিত এক মানুষ, কাজ করার ক্ষমতা আছে, কিন্তু কাজ নেই – এ এক শোচনীয় পরিস্থিতি। কিন্তু আমিই বা কী করি। দিনের বেশ কিছুটা সময় বাড়ির বাইরে যাওয়ার রুটিন হঠাৎ বন্ধ করে দিতে মন চায় নি। ইশকুলের ছেলেমেয়েদের কাছে আমি যে ভালোবাসা পাই – তার মূল্য অনেক। আমার নিজের ছেলেমেয়ে যখন বড় হয়ে গেল, স্বামীও চাকরি নিয়ে অসম্ভব ব্যস্ত, তখন বাগান করে, ঘর সাজিয়ে-গুছিয়ে, নানা রকমের রান্না করে একাকীত্ব ভোলার কম চেষ্টা করিনি। সংযোগবশে ইশকুলের সাথে যুক্ত হয়ে বুঝেছিলাম – মনুষ্যসংশ্রব ছাড়া জীবনধারণের তৃপ্তি থাকে না। আমি যে কষ্ট দিনের পর দিন নীরবে সহ্য করেছি, এখন আমার স্বামীও সেরকম কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন। বড় চাকরি করে মানুষটা হয়ে উঠেছিলেন অহঙ্কারী। বন্ধুবান্ধব বলতে কেউ নেই তাঁর। আত্মীয়-স্বজনরা তো শাশুড়ির আমল থেকেই দূরের মানুষ। অতএব আমি সর্বক্ষণ বাড়িতে থেকে তাঁকে সঙ্গ দেব, এটা তিনি আশা করেন। কিন্তু আমাদের দু’জনের জগৎ যেখানে এত আলাদা হয়ে গেছে, সেখানে এত বছর পর হঠাৎ পরস্পরের সান্নিধ্যে ডুবে যাব, এ হয় না। দাঁড়ালে পায়ের পাতা ঠিকমতো ভেজে না, এমন জলে ডুব দেয়া যায় কি?

কাজেই অনুযোগ। অনুযোগ থেকে অভিযোগ। অভিযোগ থেকে বিবাদ। মনে মনে বলি – মীনাক্ষী ডেকা এখন কোথায় ! ছেলেমেয়েরা দূর থেকে বাবার হয়ে আমাকে সদুপদেশ দেয়।   আমি ওদের কথামতো চলি না বলে বিরক্ত হয়। তারা বলে – ‘তোমার কিসের অভাব যে। ……’।

সত্যিই তো – ওরা আমার কোনো কিছুর অভাব রাখে নি। কিন্তু জীবনে আমার চাওয়াগুলোই যে ঠিক কোন সময় থেকে বদলাতে শুরু করেছিল – নিজেই তা খেয়াল করি নি। ওরা যখনি আসে,নানা উপহারে ভরিয়ে দেয় আমাকে। খেয়াল করে দেখে – ঘরে কোন জিনিসটা পুরোনো হয়ে গেছে। পুরোনো মিক্সির জায়গায় নতুন মিক্সি কিনে দেয় । দরকার নেই – তবু ফ্রিজটা বদলে আরো ভালো ফ্রিজ কিনে দেয়। দু’বছর আগে মেয়ে এসে ননস্টিক তাওয়া-কড়াই কিনে দিয়ে গেল। তাতে কাঠের অথবা রবারের খুন্তি দিয়ে রান্না করতে হয়, সন্তর্পণে তরকারি নাড়াচাড়া করতে হয়, আলতো করে মাছ উল্টে দিতে হয়। আমার সারা জীবনের খুন্তি নাড়ার স্টাইল বিপন্ন হয়। রাঁধছি না মেক-আপ করছি, বুঝে উঠতে পারি না। ও চলে যেতেই সেগুলো তুলে রেখে আমার লোহার কড়াই-খুন্তি নামিয়ে আনলাম। মুখ ফুটে বলতে পারি নি, ওসব আমার চাই না। জলে-ভাতে জীবন কাটাতে ভালো লাগে আমার। ইশকুলের পরিবেশ আমার এই বাসনাকে অনেকটা চরিতার্থ করে।

সেদিন শ্রীকুমারের অডিশন। আমি বেরোবার জন্য তৈরি হচ্ছি। স্বামী বললেন – ‘যেয়ো না।‘ কিন্তু অন্যদিন হলে না হয় কথা ছিল। আজ যে ওর অডিশন !

-       -‘অন্য কেউ যাক। অডিশন তো ও দেবে, তুমি সেখানে কী করবে।‘

-       -‘আমি থাকলে ও সাহস পাবে।‘

স্বামীকে বোঝাতে পারি নি – শ্রীকুমারের মতো ছেলেরা বাইরের চটকদার দুনিয়ায় পা রাখতে ভয় পায়। ছেলেটার বয়স মাত্র পনর।

অডিশনে বহু ছেলেমেয়ে এসেছিল। ঘন্টা চারেক পর শ্রীকুমারের পালা এল।  অডিশন দিয়ে বেরিয়ে এসে শ্রীকুমার বলল – ভালো হয়েছে অডিশন। এতক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে এবং আসন্ন পরীক্ষার উদ্বেগের কারণে শ্রীকুমারকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। দেখে মায়া হল। ওকে বাড়ি পৌঁছে দিতে গেলাম। ভেবেছিলাম – পৌঁছে দিয়েই চলে আসব। কিন্তু ওর মা জলচৌকি পেতে দিয়ে এমনভাবে অনুরোধ করলেন একটু বসার জন্য। অনুরোধ এড়াতে পারি নি। দরিদ্র গৃহস্থালি ওদের। কিন্তু নিকানো-পোঁছানো চারপাশ। বারান্দার একপাশে একটা তাঁত – তাতে শ্রীকুমারের মা গামছা বোনেন। আমাকে ঠাসা বাইনের একটা গামছা উপহার দিলেন। ফেরার পথে গামছার প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ে গেল। আমাদের জেঠতুত দাদা, কল্যাণদা, আমাদের বাড়িত থেকে বি.বি.আই- ইশকুলে পড়ত। পরীক্ষার খাতায় মাল্টিপারপাস বাঁধের সাথে সে গামছার তুলনা করেছিল। গামছা যেমন পরা যায়, স্নান করে গা মোছা যায়, গরম লাগলে তা দিয়ে বাতাস করা যায়, ঘাম মোছা যায়, আবার রোদের তাপ এড়াতে মাথায় বাঁধে নেয়া যায় – সর্বোপরি দামেও সস্তা – মাল্টিপারপাস বাঁধও সেরকম। তার বহুমুখী উপযোগিতা রয়েছে।

কল্যাণদার মাস্টার এই উপমা দেখে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেছিলেন, বাবার কাছে নালিশ করেছিলেন, টু দি পয়েন্ট উত্তর লেখে নি বলে। বাবা বাড়ি এসে কল্যাণদার পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন – প্রথাগত শিক্ষার সাথে জীবনের অভিজ্ঞতাকে জুড়ে দেয়া মুখের কথা নয়। আর বলেছিলেন – কল্যাণদা জীবনে উন্নতি করবে। করেছিল।

পুরোনো স্মৃতি আজকাল বড়ো বেশি বিধুর করে আমাকে। ধর্মনগর গার্লস ইশকুলের মিনতি দেবনাথ, যার ছিল গজদন্ত – হাসলে খুব সুন্দর লাগত। গানের ক্লাসের তন্ময়, খুব ভালো গাইত। বিশারদ পরীক্ষা দিতে গিয়ে ভয়ে তার গলা কাঠ হয়ে গিয়েছিল। তাই দেখে অমলেন্দু দত্ত খুব রেগে গিয়ে তন্ময়কে লাথি মারলন। অমনি তন্ময়ের গলা খুলে গেল ! মনে পড়তেই আপনমনে হেসে উঠি। তখন রিক্সায় বসে যাচ্ছিলাম কোথাও। আমার হাসি শুনে রিক্সাওলা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। তার চোখে ভয়, ভর দুপুরে এমন একা একা হাসে, হতে পারে কোনও ভূত-পেত্নী, কিংবা পাগলি ! আমাকে গন্তব্যে নামিয়ে দিয়ে পয়সা না নিয়েই প্রায় চলে যাচ্ছিল রিক্সাওলা।

যত বেশি স্মৃতিকাতর হই – তত বাড়ে ছেলেমেয়দের সাথে দূরত্ব। এই দূরত্ব বহুগুণ বাড়ে – যখন আমার স্বামী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন। ভোর রাতে স্ট্রোক হয়েছিল। খবর পেয়ে উড়ে এল ছেলে । উড়ে এল মেয়ে। তিনদিন যমে-মানুষে টানাটানি হয়ে মারা গেলেন তিনি। মেয়ে মুখের ওপর বলল – ‘বাবার যত্ন হত না .....।‘ এই অভিযোগ যে মিথ্যা, তা প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করি নি । করে লাভ নেই – তাই।

হঠাৎ উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য পোড়া দাগওলা লোহার কড়াই-খুন্তি লুকিয়ে ফেলার সময় পাই নি। তোয়ালের বদলে শ্রীকুমারের মায়ের দেয়া আমার প্রিয় গামছাখানি দেখে নাক সিঁটকাল আমার মেয়ে। ছেলে বলল – এ সাইক্রিয়াটিক ডিসঅর্ডার। কাউনসেলিং দরকার।

ওদের দোষ নেই। ওদের জীবনবোধের জায়গা থেকে ওরা আমাকে দেখছে। শ্রীকুমারের পরিবারের সঙ্গে আমার মমতার সম্পর্ককে ওরা বোঝে না, তাই এটাকে বলে ‘অ্যাভারশন’।

ওরা ফিরে গেল। বলল, আবার তাড়াতাড়ি আসবে। আমার পাসপোর্ট সময়মতো রিনিউ হয়নি দেখে ছেলে খুব বিরক্ত হয়েছিল।

কুড়ি দিন ছিল ওরা। পরশু ছেলে চলে গেছে। গতকাল মেয়ে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই কী এক মুক্তির আনন্দে গেয়ে উঠলাম ভৈঁরো রাগ। তানপুরার তারের কম্পনধ্বনীর সাথে আমার রক্ত মন্দ্রিত হল যেন। নতুন এক বোধ হল আমার। অনন্তের স্তবগান করতে হলে প্রথমে নিজেকে মুক্ত করে নিতে হয়। জানি, সেই স্তরে পৌঁছোনোর বিদ্যে কিংবা বয়স নেই আমার । তবু চেষ্টা করার মধ্যেও আনন্দ আছে।  

                           

 

 

 

Comments

Popular posts from this blog

স্ত্রীর পত্র

কচুয়া শাড়ি দারাসিং লাফ