অপুরুষ

নয়ডা মোড়ে এসে জয় ঘড়ি দেখে। ঘণ্টা দুয়েক ফ্রি সময়  হাতে  আছে। ছোট মাসির বাড়িতে একটা ঢুঁ মেরে যাওয়া যায়। বছর খানেক যাওয়া হয়ে ওঠে নি। ভাবতে না ভাবতেই গ্রীন লাইট। বাইকটা সোজা চালিয়ে দেয় জয়। ময়ূর বিহার ফেজ টু-র মোড়েও আটকাতে হল না। অলরেডি গ্রীন ছিল লাইট। আজ কপাল ভালো। খুব স্মুথ রাইড হচ্ছে। একেবারে জ্যাম ছিল না কোথাও। জয় বাঁ দিকে টার্ন নেয়। একটু এগোলেই টেকনোলজি অ্যাপার্টমেন্টস। ছোটোমাসির ফ্ল্যাট।    

দরজা খুলে দিলেন ছোট মেসো। গাল দুটিতে হাওয়া ভরে ফুলিয়ে ইশারায় বোঝালেন – ছোট মাসি খুব রেগে আছেন। পিউ নিজের ঘর থেকে গলাটা বাড়িয়ে কে এসেছে দেখে নিয়ে আবার ভেতরে ঢুকিয়ে নিল। পিউ সাধারণত জয় এলেই হই হই করে ওঠে। আজ অন্য রকম। সারা রাস্তা গ্রীন লাইটের পর এখন একেবারে লাল!   

মেসো বলেন – ‘আয়, বোস।‘

‘তোমার আফিস নেই?’

‘সি.এল.। কাল হোলির ছুটি। পরশু-তরশু উইক-এন্ড। আজ সকালে আমাদের জয়পুর রওয়ানা হওয়ার কথা ছিল।‘

‘গেলে না?’

‘সকালে পিউর সাথে তোর মাসির ঝগড়া লেগেছে। পিউ দু’খানা কুর্তি কিনে এনেছিল। এখন সেগুলো তার পছন্দ হচ্ছে না। তাই পরবে না। ছোটমাসির মতে, নিজে পছন্দ করে এভাবে একবারও না পরে বাতিল করা আহ্লাদিপনা……। একগাদা দাম দিয়ে কিনে ….।‘ একটু থেমে মেসো আবার বলেন – ‘পিউ বলছে, দোকানে তো খুব ভালোই লাগছিল, এখন বিচ্ছিরি লাগছে তো সে কী করবে!’

জয় পিউর ঘরে ঢোকে। বলে – ‘দেখি তো কুর্তিগুলো?’ বিছানার ওপর দলা পাকিয়ে পড়ে থাকা জামা দু’টো উল্টে-পাল্টে দেখে সে বলে – ‘বাঃ, বেশ সুন্দর।‘

‘মভ কালার আমাকে একদম মানাচ্ছে না জয়দা।‘

‘আর এই নেভি ব্লু -টা ?’       

ইঃ, একদম বাজে। কেমন ঝিলমিলি ঝিলমিলি, ঝটকি।‘

‘কেনার সময় মনে ছিল না?’

একথার জবাব দেয় না পিউ। মেসো বলেন – ‘চা করি? ….খাবি?’

মেসোর পেছন পেছন রান্নাঘরে আসে জয়। তাকের ওপর কৌটোতে সাজানো রয়েছে কুকিজ। জয় জানে, এগুলো ছোটমাসির নিজের বানানো। একটা কুকি বার করে নেয় সে। মেসো বলেন – ‘কৌটোটা টাইট করে বন্ধ কর, নইলে বুঝিস তো ……।‘ জয় বোঝে – ছোটমাসির কড়া স্বভাব আরো কড়া হয়েছে।    

চা খেয়ে সে মাসির ঘরের দিকে পা বাড়ায়। দেখা না করে চলে যাওয়া ঠিক হবে না। মেসো বলেন – ‘এখন যাস না, যেচে বকুনি খাওয়ার দরকার কি!’

‘আমাকে কেন বকবে, আমি তো কিছু করি নি।‘

‘এখন করিস নি তো কী, আঁতুড়ঘরে কালো পায়খানা করেছিলি, তার জন্য বকুনি খেতে পারিস!’

জয় উচ্চস্বরে হেসে ওঠে। হাসির শব্দে ঘরের দরজা একটু ফাঁক করে ছোটমাসি বিরসমুখে একবার জয়কে দেখে আবার দরজা বন্ধ করে দেন। মা-মেয়ে দুটো বেডরুমকে গোঁসাঘর বানিয়ে রেখেছে। জয় আর ছোটমেসো ডাইনিং স্পেসে বসে পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। নিজের বিমুঢ় অসহায় অবস্থাকে ঢেকে রাখার চেষ্টায় মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে জয়ের দিকে তাকাচ্ছেন ছোটমেসো। তাতে তাঁকে কেমন বোকা বোকা লাগছে। অথচ মোটেই বোকা নন তিনি। স্কুল পরীক্ষায় বোর্ডের স্ট্যান্ড করা, আই.আই.টি. খড়গপুর থেকে পাশ করা ইঞ্জিনিয়র তিনি। ই.আই.এল-এ বড় চাকুরে। কিন্তু বাড়িতে বড়মাসির দাপটে কেন্নোটি হয়ে থাকেন।

ছোটমাসি লা-মার্টিনিয়ার প্রোডাক্ট। সায়েবদের মতো ইংরাজি ঝাড়েন। মেসো গভঃ স্কুল থেকে পাশ করেছেন। ভেতো বাঙালি। ইংরাজি-হিন্দীতে যথেষ্ট স্বচ্ছন্দ নন। বেশ আনস্মার্ট। এই মুহূর্তে ছোটমেসোর জন্য মায়া না হয়ে বিরাগ হয় জয়ের। নর্ঘাৎ বিয়ের রাতে বেড়াল মারার ব্যাপারটি জানতেন না। অথবা মানতেন না। যেমন মানে না আরোও দশটি ভদ্র সজ্জন। নয়তো সুন্দরী আধুনিকা বউ পেয়ে একেবারে গদগদ হয়ে গিয়েছিলেন। নিজের ভবিষ্যৎ বুঝতে পারেন নি।

‘আমি যাচ্ছি।‘

‘বোস না আরেকটু।‘

‘নয়ডাতে কাজ আছে একটা।‘

‘পারিস তো বোস আরেকটু।‘

জয় বসে। নয়ডার কাজটি পরে করলেও চলবে। ছোটমেসো বলেন – ‘কফি খাবি?’

মেসোর পেছন পেছন আবার গিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে ঢোকে জয়। এমন সময় সশব্দে দরজা খুলে

বেরিয়ে আসেন ছোটমাসি। স্বভাবসিদ্ধ দৃঢ়স্বরে বলেন – ‘সকাল থেকে চা-কফি খেয়েই দুপুর হয়ে গেল। …..বলি – জয়পুর যাওয়া হবে কি না ?’

মেসোর বদলে জয় জবাব দেয় – ‘….তুমিই তো ঘরে খিল দিয়ে বসে আছ!’

‘তুই থাম! …..তুই সব জানিস?’

‘যতটুকু জানি, তাই যথেষ্ট।‘

‘মেয়েকে আদর দিয়ে দিয়ে বাঁদর বানাচ্ছে।‘

‘যেমন বানিয়েছে তোমাকেও! ……ইউ টেক অ্যাডভান্টেজ অফ হিজ গুডনেস। …আমি যাচ্ছি মেসো।‘

‘কফিটা খেয়ে যা।‘

মেসোর কথার জবাব না দিয়ে টেবিল থেকে চাবি আর হেলমেট উঠিয়ে বেরিয়ে যায় জয়। নিচে নেমে বাইকে স্টার্ট দিতে দিতে বলে – ‘বুলশিট!’ চারতলার ব্যালকনি থেকে ঝুঁকে ছোটমেস বলেন – ‘জয়, আরেকটু থেকে যা!’

আবার লিফটের বোতাম টেপে জয়।

‘কেন ডাকছ!’

‘এমনি। . . . কফিটা খা।‘

‘তুমি কখনো কাউকে কিছু বল না কেন?’

‘ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়েছে বড়দের সাথে মুখে মুখে তর্ক না করতে।‘

‘ছোটমাসি তোমার বড়? পিউ তোমার বড়?’

‘প্রায় সবাইকেই আমার বড় মনে হয়।‘

এবার ছোটমেসোর হাসিকে আর বোকা বোকা লাগে না জয়ের। দেবদুর্লভ লাগে ওই হাসি। খুব অসহায় লাগে তার।

‘কফিটা খা। . . . ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। বিস্কুট খাবি?’

‘খাব। . . . জয়পুর যাওয়া তাহলে ক্যান্সেল?’

‘তুই-ই তো নষ্ট করলি সব। তোর মাসি বেরিয়ে এসেছিল। আবার ঘরে ঢুকে দরজা দিয়েছে।‘

‘তুমি যেতে চাও?’

‘হ্যাঁ।‘

জয় গিয়ে ছোটমাসির দরজায় ধাক্কা দেয়। দু-তিনবার ধাক্কা দেওয়ার পর দরজা খোলার আওয়াজ হয়। ছোটমাসির মুখ লাল। রাগের গলা যথাসম্ভব অনুচ্চ রেখে বলেন – ‘কেন বিরক্ত করছ?’

‘ন্যাকামো করো না। . . . তৈরি হও।‘ জবাবের অপেক্ষা না করে পিউ-র ঘরেও উঁকি মারে জয়। বলে – ‘যেতে চাস তো এক ঘণ্টার মধ্যে তৈরি হয়ে নে। . . . নইলে থাক দু-দিন একলা। আমরা যাচ্ছি।‘

‘তুমিও যাচ্ছ নাকি?’

‘হ্যাঁ।‘

জয় যাচ্ছে শুনে ছোটমেসোর মুখে খুশি প্রকট হয়। চটপট তৈরি হয়ে সবাই গিয়ে গাড়িতে বসে। মেসো গাড়ি চালাচ্ছেন। জয় সামনের সিটে মেসোর পাশে বসেছে। পেছনে ছোটমাসি আর পিউ। সকালের গরম মেজাজ আর নেই। বেশ হাসিখুসি তারা। গাড়ি রেওয়াড়ি পৌঁছোতে না পৌঁছোতেই জয়ের মোবাইল বাজে। নয়ডা অফিস থেকে ফোন করছে – কোথায় সে, কখন পৌঁছোচ্ছে . . . । অবলীলায় মিথ্যে কথা বলে জয় – তার নাকি ধুম জ্বর।

ধুম জ্বর শুনলেই আজকাল কেঁপে উঠছে দিল্লির লোকজন। খুব সোয়াইন ফ্লু  হচ্ছে। কাজেই ধুম জ্বর হলেই ডাক্তার দেখানো, প্যাথোলজিকেল টেস্টগুলো করানো অবশ্যম্ভাবী। জয় তাই ডাক্তারের কাছে যাচ্ছে।

মোবাইল বন্ধ করতেই খিলখিল করে হাসে পিউ। মাসিও হাসেন। এমন নিখুঁত মিথ্যে!

মিথ্যে আমাকে রোজ বলতে হয়। আর আজকাল সত্যিকথা কেউ বিশ্বাসও করে না।  

‘তুই বলছিস, সত্যি কথা কিংবা সত্য আচরণ বিশ্বাসিযোগ্যতা হারিয়েছে?’

‘হ্যাঁ মেসো।‘

তপন চুপ করে গাড়ি চালান। অনেকক্ষণ কোনোও কথা বলেন না। বেলা প্রায় দু-টো বাজে। হরিয়াণা ছাড়িয়ে গাড়ি রাজস্থানে ঢুকেছে কিছুক্ষণ আগে। বেশ বড়সড় ভালো দেখতে একটা ধাবার সামনে গাড়ি দাঁড় করান মেসো। সবারই খিদে পেয়েছে খুব।

মাসি মেসোকে কিছুতেই দালবাটি আর চুরমা খেতে দেবেন না। মেসোর কোলোস্টেরল এবং প্রেসার আছে।

‘একদিন খাই রীতু!’

‘না।‘

ছোটমাসির কমান্ডারিতে মনে মনে অত্যন্ত বিরক্ত বোধ করে জয়। কিন্তু চুপ করে থাকে। সকালেই একবার মাসিকে কড়া কথা বলেছে। আবার বললে হয়তো অবস্থা একেবারে আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে। এতদূর বেড়াতে এসে বেড়ানোটাই পণ্ড হবে। কিন্তু জয় যে রাগ করেছে, রীতু সেটা বোঝেন। তাই সুর নরম করে বলেন – ‘ডাক্তারের মানা আছে, ঘি এবিং ভাজাভুজি খাওয়া একেবারে চলবে না।‘ জয় জবাব দেয় না। তখন রীতু জয়কে আরেকটু চুরমা খেতে সাধাসাধি করেন। তপনের দিকে তাকিয়ে, যেন গুঢ় কথা বলছেন, এমনভাবে বলেন – ‘ব্লাড ইজ থিকার দ্যান ওয়াটার।‘

‘তাই?‘ হেসে জবাব দেন তপন।

জয় বলে – ‘ব্লাড রিলেশন বলে কিছু হয় না। সব বানানো গপ্পো। যদি হত, শিশু জন্মানোর পর মা তাকে কিছুতেই আস্তাকুঁড়ে ফেলে যেতে পারত না। অথবা একদা পরিত্যাক্ত শিশুকে বহু বছর পর দেখেই চিনে নিত। কুন্তী কর্ণকে চিনেছিলেন তাঁর কবচ-কুণ্ডলের জন্য, রক্তের জন্য নয়।‘

‘কী বলছ, বুঝতে পারছি না। তুমি সব সময় খালি সিরিয়াস কথা বল কেন জয়দা?’

‘যাতে তোর ন্যাকামো রোগ সারে, তার জন্য।‘

সকলে হেসে ওঠে বলে পরিবেশ হালকা হয়ে যায়। আবার গিয়ে গাড়িতে বসে ওরা।

জয়পুর পৌঁছোতে পৌঁছোতে রাত হয়ে যায়।ছোটমাসির খুব চিন্তা হচ্ছে, কাল দোকানপাট সব বুঝি বন্ধ থাকবে। আগে ভেবেছিলেন – সকাল সকাল রওয়ানা হয়ে বিকেলের আগেই পৌঁছে যাবেন। তাতে বাজার-হাট করার সময় পাওয়া যাবে। এখন তো মনে হচ্ছে – কাল হোলির ছুটি, পরশু-তরশু উইক এন্ড। তখনও যদি বন্ধ থাকে? বিশেষ করে গভর্নমেন্ট এম্পরিয়মগুলো?

‘দিল্লিতে বাজারের ছড়াছড়ি। . . . জয়পুরে এমন কী পাওয়া যাবে, যা দিল্লিতে পাবে না ?’

জয় আরোও কিছু বলতে যাচ্ছিল। তাকে থামিয়ে দিয়ে ছোটমাসি বলেন – ‘তুই সব জানিস? . . সেমি প্রেসাশ স্টোন দিয়ে কস্টিউম জুয়েলারি এখানে যেরকম মেলে – তেমন আর কোথাও না।‘

‘হতেই পারে না। খড়ক সিং মার্গের রাজস্থান এম্পোরিয়ম এক্সপ্লোর করে দেখেছ?’

‘তুই দেখেছিস? না আন্দাজে বলছিস?’

‘দেখিও নি। আন্দাজেও বলছি না। জাস্ট রিজনিং। . . . বুদ্ধি খাটিয়ে বলছি।‘

‘বুদ্ধির ঢেঁকি!’

‘দিব্যি বাংলা জানো তো! কথাটা বলেই অনুশোচনা হয় জয়ের। মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেছে। ওভাবে খোঁচা দিয়ে বলা ঠিক হয় নি। ব্যাপারটা রুচির দিক থেকেও খুব আপত্তিকর লাগে তার।

‘সরি ছোটমাসি।‘

‘সরির কী আছে। কথাবার্তায় খুব চৌকস হয়েছিস!‘

আয়্যাম রিয়্যালি সরি।‘

জয়ের এখন মনে হয় – না এলেই বুঝি ভালো ছিল। নেহাত ঝোঁকের মাথায় চলে এসেছে। এবার থেকে নিজের মুখকে সামলে রাখবে, মনে মনে ঠিক করে নেয় সে।

রাত হয়ে গেছে। হোটেলের দু-টো ঘর বুক করা ছিল।তার মধ্যে একটা সিঙ্গল রুম। শোয়ার ব্যবস্থা ঠিক কী হবে, বুঝে উঠতে পারছে না জয়। তার ঘুম পাচ্ছে। হোটেলের বাড়িটা চারতলা। মেসোদের রুমগুলো চারতলায়। করিডোরের প্রান্তে দেখা যাচ্ছে ছাদে যাওয়ার সিঁড়ি। সেদিকে তাকিয়ে মেসো বলেন – ‘চল, ছাদে যাবি?’

জয়ের খুব একটা ইচ্ছে ছিল না। মেসো বলছেন, তাই সে মানা করে না। তপনের পেছন পেছন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে যায় সে। জলের ট্যাঙ্কের পাশে খাটিয়া পাতা ছিল। দুটো খাটিয়ায় মুখোমুখি বসে ওরা।

‘ওপরে তাকা।‘

আকাশ ভর্তি অজস্র তারা জ্বলজ্বল করছে। এত তারা আকাশে আছে, জানা ছিল না জয়ের। পরিষ্কার আকাশ যেন তারার ভারে অনেক নিচে নেমে এসেছে।

‘এখন জ্যোৎস্না বলে তাও অনেক কম দেখছিস। কৃষ্ণপক্ষ হলে আরোও বেশি দেখতে পেতি। . . . . . ওই দেখ ষপ্তর্ষিমণ্ডল, . . . আর ওই তো কালপুরুষ। . . . . সিগারেট খাবি?’

মেসোর সাথে সিগারেট খায় জয়। তার মনে পড়ে, ছোটমাসির বিয়ের পরে কলকাতায় তাকে আর জিৎকে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন মেসো। কোয়ালিটি আইসক্রিম খাইয়েছিলেন। ফ্লুরিজ থেকে পেস্ট্রি কিনে দিয়েছিলেন। ছেলেবয়সের একবেলার ওই বেড়ানো আর ভালো ভালো খাবারের আনন্দ আজ যেন আরেকভাবে ফিরে এসেছে। মেসো খুব আস্তে আস্তে গাইছেন – ‘আকাশভরা’।গান মাঝে মাঝে ভাঙছে। খুব সাধারণ আনাড়ি গলায় গাওয়া গান পরিবেশের কল্যাণে অন্য এক মাত্রা পাচ্ছে। গান শেষ হলে মেসো বলেন – ‘ছোটবেলায় আমরা সচ্ছল ছিলাম না। কিন্তু খুব সুখে ছিলাম। আমার বাবা রেলের কেরানি ছিলেন। খড়্গপুরের রেলকোয়ার্টারের ছাদে আমরা বাবার সঙ্গে গিয়ে বসতাম, বিশেষ করে এইরকম চৈত্রের রাতে। বাবা আমাদের নক্ষত্র এবং তারাদের চেনাতেন।‘

‘তোমরা ক’ ভাইবোন মেসো?’

‘চার।‘

‘দেখিনি তাদের কাউকে।‘

তপন এ কথার কোনোও জবাব দেন না। জয়ের গাট ফিলিং বলে – ছোটমাসি যেরকম পদার্থ দিয়ে গড়া, হতেই পারে, মেসোর পরিজনদের কাছে ঘেঁষতে দেন না। মেসো চুপ করে কী যেন ভাবছেন। ভাইবোন, মা-বাবা, ছোটবেলার কথা ভাবছেন কি? তাঁদের প্রতি ভালোবাসায়ই কি মেসোর চোখদুটো সংহত আবেগে ঘিয়ের প্রদীপের মতো জ্বলছে? জয় আর তপন, অসমবয়সী দুটি পুরুষ চুপচাপ বসে নির্বাক সংলাপে ডুবে থাকেন অনেকক্ষণ।

জয়ের খেয়াল হয়, এত বছরে এই প্রথম মেসো নিজের সম্পর্কে, কীভাবে তাঁর শৈশব কেটেছে, সে সম্পর্কে কিছু বললেন। জয় তাঁকে সব সময় দেখেছে – অন্যের কথা খুব মন দিয়ে শুনতে। মেসোকে ভালো করে জানতে ইচ্ছে হয় জয়ের। তাঁর একান্ত আপন মানুষ হতে ইচ্ছে করে। জয় জানে – এই ইচ্ছে তার স্বভাববিরিদ্ধ। ইন্টিমেসি সে এড়িয়ে চলে। আজকাল আরেকটা জিনিস সে স্পষ্টভাবে বুঝছে। মেয়েদের সান্নিধ্য তার ভালো লাগে না। বেশির ভাগ মেয়েদেরই তার সহ্য হয় না। যে দু-এক জনকে ভালো লাগে, তাদের মধ্যে পুরুষালি ভাব খুব প্রকট। নিজের মা-মাসিদের বেশ স্পাইডারের মতো মনে হয় তার। মায়েরা চার বোন। চারজনেই ভালো রোজগেরে, একটু টিমিড প্রকৃতির স্বামী খুঁজে নিয়েছেন। ভেরি ক্যালকুলেটিভ উইমেন।

জয়ের এই মুহূর্তের মনের কথাগুলো মেসো জানতে পারলে নির্ঘাৎ স্তম্ভিত হতেন। এমন ঝাঁঝালো ভাবনা মেসোর মনে কখনোই স্থান পাবে না – একথা হলফ করে বলতে পারে সে। কুটকচালি ভাবনা মেসোর ধাতে নেই। সবাই তাঁকে একটু সোজা প্রকৃতির মানুষ বলে জানে।

রাত যে অনেক বেড়েছে, বোঝাই যাচ্ছে। তারাগুলো অনেকটা পশ্চিমে সরে এসেছে। ওরা নিচে নেমে আসে। একটা ঘরে ছোটমাসি আর পিউ ঘুমিয়ে পড়েছেন। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। অন্য ঘরে একটাই সিঙ্গল খাট। দু’জনে গাদাগাদি করে শোয় তাতে। মেসো বলেন – ‘আগে বললে ওরা একটা ফোল্ডিং খাট লাগিয়ে দিত। তোর অসুবিধে হবে।‘

‘অসুবিধে হবে না।  . . . আর হলে তোমারও তো হবে!’

ছোট খাট বলে ঘেঁষাঘেঁষি করে শুয়েছে তারা। এই নৈকট্য ভালো লাগে জয়ের। তার খটকা লাগে – তার মধ্যে কি গে টেন্ডেনসি রয়েছে? জয়ের অফিসে তিনজন ডিক্লেয়ার্ড গে রয়েছেন। জয় নিজেও কি সেরকম কিছু হয়ে যাচ্ছে? এসব উদ্ভট সব ভাবনার মাঝখানে ঘুমিয়ে পড়ে জয়। বেলা অব্দি অকাতরে ঘুমোয় ওরা। ঘুমের মধ্যেই জয় টের পায়, মেসোর সেলফোনে একটু পরপরই  মেসেজ আসছে। প্রত্যেকবার মেসো চোখ খুলে মেসেজ পড়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ছেন।

‘তোমরা ওঠ। . . . ন’টা বাজে।‘

ছোটমাসির কথা শেষ না হতেই আবার এসএমএস আসে মেসোর ফোনে। হাই তুলতে তুলতে মেসেজ পড়েন মেসো। তাঁর মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ে। মাসী বলেন – ‘কার মেসেজ?’

‘লিলির।‘

‘ওঃ, দ্যাট আগলি ওল্ড স্পিনসস্টার!’

দপ করে মেসোর মুখের হাসিটি নিভে যায়। তার বদলে বেদনায় তাঁর চোখের চারপাশ কালচে হয়ে ওঠে। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই মাসির। জয় খুব ক্যাজুয়াল গলায় মাসিকে বলে – ‘ইউ আর জেলাস!’

ছোটমাসি খুব তাচ্ছিল্যভরে বলেন – ‘হাঃ!’ তারপর ঘর ছেড়ে চলে যান। মেসোর দিকে তাকিয়ে, যেন এক রহস্যের সমাধান চাইছে, এমন গলায় জয় জিগ্যেস করে –‘হু ইজ লিলি?’

‘অফিসে, . . . জি.এম. ফাইনান্স। আগে দেখা-সাক্ষাত হাই-হ্যালোতে সীমাবদ্ধ ছিল। ইদানিং একটা ডিপার্টমেন্টাল কমিটিতে একসাথে কাজ করতে গিয়ে পরিচয় বেড়েছে।‘

মাসি যে কখন আবার এসে ঢুকেছেন, জয় দেখে নি। তাঁর সরু তীক্ষ্ণ গলা শুনে সে চকিত হয় – মহিলা তোমার সম্পর্কে কীবলেছেন, সেটাও বল!’

তপন চুপ করে আছেন দেখে রীতুই পুরো গল্পটি বলেন। একটা সেক্সুয়াল হেরাসমেন্ট কমপ্লেন ইনভেস্টিগেট করার জন্য তিনজনের একটি কমিটির একজন মেম্বার তপন। অন্য দু’জনের মধ্যে একজন লিলি টমাস, আরেকজন মহিলা হচ্ছেন একটি এন.জি.ও.-র নমিনি। একদিন মিটিং-এ বসে কমপ্লেনের নানা দিক আলোচনা করতে করতে যখন কিছু অস্বস্তিকর ব্যাপারের চর্চা হচ্ছিল – তখন নাকি লিলি মেসোকে বলেছে – ‘উই ডোন্ট ফিল আনকমফর্টেবল টু টক সাচ থিংস ইন ফ্রন্ট অফ ইউ। ইউ আর সো মাচ লাইক ওয়ান অফ আস!’ ওই এন.জি.ও. মহিলাও নাকি ঘাড় নেড়ে লিলির কথাকে সমর্থন করেছে। ‘ভাবতে পারিস, অপমানটা তোর মেসো বুঝতেই পারে নি। বাড়ি এসে হেসে আমাকে শোনাচ্ছে। মহিলারা ওকে পুরুষ বলে গন্য করে না, সেটা ওর মুখের ওপর বলেছে এবং শুনে ও নাকি খুব হেসেছে। ইডিয়ট!’

ছোটমাসির কথার মাঝখানে পিউ এসে দাঁড়িয়েছে। মায়ের কথার খেই ধরে সে বলে – ‘বাবা যে কী করে না জয়দা! . . . একদিন সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করব বলে বেরোচ্ছি, ফিরতে রাত হবে জেনে বাবা বারবার এমন করে বলছিল . . . .যেন সাবধানে রাস্তায় চলি, বিশেষ করে ফেরার সময় রাত হবে . . .।আমি খুব রেগে গিয়েছিলাম বলে বাবা কী বলল জান? বলল – ‘মা হলে বুঝতি!’ হিঃ হিঃ হিঃ।

পিউর হাসি ছাপিয়ে ইন্টারকম বেজে ওঠে। জয় ফোন ওঠায়। ওপাশে এক মহিলার মিষ্টি গলা। মনে করিয়ে দিচ্ছেন – ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টরি, তবে সাড়ে দশটার মধ্যে সারতে হবে। আর হোলি উপলক্ষে ট্যুরিস্টদের শহর ঘোরানোর জন্য হোটেল থেকে বিশেষ ব্যবস্থা আছে। সাড়ে এগারোটায় বাস ছাড়বে। সন্ধ্যায় ফিরবে। লাঞ্চের ব্যবস্থা ওরাই করবে . . . কেউ যদি যেতে চায়।

ব্রেকফাস্টের জন্য নিচে যায় ওরা চারজন। তপন বলেন – ‘জয়, ওদের তুই ঘুরিয়ে আন। . . .

আমি ঘুমোব।‘

রীতু বলেন, ঘুরিয়ে আনার কী আছে। কনডাকটেড ট্যুর, ওরাই দেখভাল করবে। . . . .আমাকে আরোও কিছুটা টাকা দাও।‘

তপন ওয়ালেট বৌয়ের দিকে বাড়িয়ে ধরেন। রীতু টাকা বার করে নেন। তপন বলেন – ‘ডেবিট কার্ডটাও নিয়ে যাও।‘

হোটেলের সামনে ঝকঝকে মিনিবাস দাঁড়িয়ে ছিল। রীতু এবং পিউ গিয়ে বাসে বসেন আর তপন আর জয় রুমে ফিরে যান। তপন গিয়ে ডবল-বেডেড রুমটাতে ঢোকেন। বিছানার ওপর মাসির ছাড়া শাড়ি-জামা পড়ে ছিল। জয় দেখে – মেসো অনায়াস দক্ষতায় শাড়িটা ভাঁজ করে নিলেন। জয় হাসে। এবার তারও মেসোকে খুব মেয়েলি মনে হয়। মেসো টান টান হয়ে এবার শুয়ে পড়তে পড়তে বলেন – ‘ধুত্তোর বেড়ানো!’ সঙ্গে সঙ্গে আবার এসএমএস।

‘সকাল থেকে এত এসএমএস আসে তোমার?’

‘সব হ্যাপি হোলি। তুই এক কাজ করে দে। সকাল থেকে যতগুলো ‘হ্যাপি হোলি’ মেসেজ এসেছে, সবগুলোর জবাব দিয়ে দে – ‘থ্যাঙ্ক য়্যু, সেম টু য়্যু।‘

‘লিলি ট্মাসকেও? লিলি টমাসের মেসেজটা পড়ি?’

‘পওড়! . . . . আই রিয়্যালি অ্যাডোমায়ার হার।‘

‘মাসি সেটা বোঝে। . . . . তাই অমন ভেনোমাস কমেন্ট . . . ।‘

‘লিলি যদি পুরুষ হত, তা হলেও কি রীতু অমন করত?’

‘না।‘

‘কিন্তু কেন?’

‘তুমি বোঝ না?’

‘না।‘

জয় মেসোর মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁকে বোঝার চেষ্টা করে। নাইভ? তপন ততক্ষণে হাই তুলতে শুরু করেছেন। বলেন – ‘আমি ঘুমোলাম। বিকেলের আগে উঠব না। হেবি ব্রেকফাস্ট খেয়েছি। . . . . তুই গিয়ে লাঞ্চ খেয়ে নিস।‘

‘বেড়াতে এসে ঘুমিয়ে কাটাবে?’

‘ঘুমোনের মতো আনন্দ আর কিছুতে নেই।‘

সন্ধ্যার পর রীতু আর পিউ ফিরে এসে অনর্গল কলকল করে কথা বলেন। কুলকুল করে হাসেন। খুব আনন্দে কেটেছে সারাটা দিন। শহরময় হোলির রঙ উড়েছে, লাল-সবুজ-হলুদ-কমলা আবিরে হাওয়া-মাটি ধুন্দুমার ছিল। ছেলেরা মেয়ে সেজে লম্বা বেণী অসম্ভব উঁচু ব্রেস্টের ওপর দুলিয়ে দিয়ে কোমর নাচিয়ে সে কী নাচ! বলতে গিয়ে হেসে অস্থির হয় পিউ। চকিধানির বিশাল এলাকায় জায়গায় জায়গায় নাচ-গান-ঢোলোক-মৃদঙ্গ বাদ্য-বাজনার ব্যবস্থা ছিল। ঠাণ্ডাইতে ভাঙ ছিল। খেয়ে বুঝতে পেরেছে ওরা। তবে মাইল্ড ডোজ। খুব আমেজ আসছিল। খুব নেচেছে ওরা দু’জনেও। এখন দু’জনেরই পা ব্যথা করছে। দু’জনেই ভীষণ টায়ার্ড। স্নান করে শুয়ে পড়বে তারা। রাতে খিদে পেলে খাবে, নয়তো নয়।

‘আমি তো ভাবছিলাম – সবাই মিলে গান শুনতে যাব।‘

রীতু বলেন – ‘অসম্ভব।‘

পিউ বলে – ‘ইমপসিবল!’

রীতু বলেন –‘তোমরা যাও।‘

হোলি মিলন উপলক্ষে এক জায়গায় ধামার উৎসব ছিল। হোটেল থেকেই টিকিটের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। তপন জয়কে নিয়ে গান শুনতে বেরিয়ে যান। ক্লাসিক্যাল গানে জয়ের অভিরুচি নেই। তবু যায় সে। ঋত্তিক সান্যালের ধামার শুনতে প্রথম দিকে ভালোই লাগছিল তার। কিছুক্ষণ কাটলে কেমন একঘেয়ে লাগে। মেসোর দিকে তাকায় জয়। তন্ময় হয়ে গান শুনছেন। অনুরাগে তাঁর চোখদুটো নরম হয়ে আছে। ছোটমেসোর প্রতি তার অনুরাগ বাড়তেই থাকে। মেসোকে ছুঁতে ইচ্ছে করে তার। জয় নামকরা এক পাবলিশিং হাউসে এডিটরের কাজ করে। আজকাল লিটরারি ক্রিটিসিসমের বইগুলোতে সাহিত্যকে হোমোসেক্সুয়ালিটির দৃষ্টিকোন থেকে দেখার এক প্রবণতা খুব প্রবল হয়ে উঠেছে। গোরা উপন্যাসে গোরা আর বিনয়ের সম্পর্কতেও হোমোসেক্সুয়াল লেবেল সেঁটে দিচ্ছেন কিছু কিছু সমালোচক। এসব চমকপ্রদ নতুন নতুন কথা লোকে খুব খাচ্ছে। জয় ভাবে, মেসোর প্রতি তার অনুরাগও কি সেরকম কিছু? কেমন হবে – মেসো যদি তার মনের এইসব ভাবনাবৃত্তান্তের খবর পান? লিলি টমাসের প্রসঙ্গে বীতরাগ হয়ে দুপুরে তিনি বলেছিলেন – প্রকৃতির রাজ্যের বৃহদাংশই যৌনতার বাইরে। তবু মানুষ কেন যে সর্বত্র যৌনতা দেখে, সেটা কিছুতেই তাঁর বোধগম্য হয় না। তাঁর কাছে লিলি টমাস পুরুষ না নারী, সেই ভাবনাই আসে না। ঋত্তিক সান্যালের সুরের বিস্তার জয়ের কানে পৌঁছোবার আগেই মাঝপথে বিচিত্র সব ভাবনার জালে আটকা পড়ে থাকে। ছোটমেসোর প্রেক্ষিতে নিজেকে দেখে জয়। রসগ্রহণের গোপন মন্ত্র মেসোকে নিমগ্ন করে রেখেছে। সেই মন্ত্রের দীক্ষা জয়ের নেই। সাহিত্যের ছাত্র ছিল সে। সাহিত্যরস তার অধিগত ছিল। এখন পাবলিশিং হাউসে চাকরির দৌলতে সেই রসবোধও নানা থিওরির আক্রমণে বিকৃত হয়ে গেছে। মন নেই। হৃদয় নেই। কেবল মাথা কাজ করে। সে এক যন্ত্রণাময় মেটামরফসিস। প্রথম প্রথম ওজর তুলত সে। বিগবস বলতেন – ‘ইউ মাস্ট কিপ ইওর মাইন্ড ওপেন টু অল কাইন্ডস অফ ভিউপয়েন্টস . . .।‘ বিগবসকে অসম্ভব ভক্তি করত জয়।

অসম্ভব শার্প ব্রেন।

হোটেলে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়। আজও ঘুমোতে অনেক দেরি হয়। কিন্তু বেলা করে ঘুম থেকে ওঠা আর সম্ভব হয় না। ব্রেকফাস্ট খেয়ে সকলে মিলে বেরিয়ে পড়ে ওরা। প্রথমে যায় জয়গড় ফোর্টে। ফোর্টের ভেতরেই বেশ কয়েকটা হ্যান্ডিক্রাফটের দোকান রয়েছে। ছোটমাসি আর পিউর ফোর্ট ঘুরে দেখার চাইতে দোকানে ঢোকার আগ্রহ বেশি। কস্টিউম জুয়েলারির দোকানে ঢুকে মা-মেয়ের প্রায় পাগল হওয়ার অবস্থা। সেমি-প্রেশাস স্টোনের কত যে দুল আর মালা কেনেন দু’জনে। লাল-সবুজ-হলুদ-নীল – কোনোও রঙ আর বাকি নেই। মেসোও খুব খুশি মনে ক্রেডিট কার্ড সোয়াইপ করেন।

কেনাকাটার উত্তেজনা থিতিয়ে গেলে পর খুব অবসন্ন বোধ করেন ছোটমাসি। অন্য সব দর্শনীয় জায়গায় যেতে একটুও আগ্রহ থাকে না আর। সব কিছুই তো একাধিকবার দেখা হয়েছে। জয়পুরে তো আর এই প্রথম আসা হয় নি।

‘তাহলে চল, আজই ফিরে যাই?’

‘হ্যাঁ।‘

জয় বলে – আজ সে লাঞ্চ খাওয়াবে। পছন্দমতো একটি রেস্তোঁরায় ঢোকে ওরা। মেনুকার্ড হাতে নিয়ে যে যার পছন্দের খাবার খোঁজে। মেসো কেবল হাসিমুখে বসে আছেন। তিনি কী খাবেন, সেটা মাসি ঠিক করবেন। জয় বলে, আজ মেসো দালবাটি আর চুরমা খাবেন। মাসি আপত্তি করার আগেই সে বলে, ‘একদিন খেলে কিছু হবে না। বিশেষ করে ফোর্টে মেসোর যে পরিমাণ ক্যালরি বার্ন হয়েছে . . . !

জয় কী বলছে, সেটা কেবল তপন বোঝেন। এবং খুব হাসেন। রীতু বলেন – ‘ইঃ, খেতে পেয়ে কী খুশি। পেটুক কোথাকার!’ তবু তপন জয়ের দিকে তাকিয়ে হাসতেই থাকেন। জয়ের সেন্স অফ হিউমার তাতে খুব তৃপ্ত হয়।

লাঞ্চ সেরেই হোটেলে গিয়ে চেক আউট করেন মেসো। বেলা আড়াইটে নাগাদই রওয়ানা হয়ে পড়েন তারা। সারা রাস্তা খুব নির্ঝঞ্ঝাট পেরিয়ে গুড়গাঁও ছাড়িয়ে দিল্লি ঢোকার খানিক পরই দূর থেকে দেখা যায়, রাস্তায় ভিড় জমে আছে। কিছু লোক হাত দেখিয়ে চলন্ত গাড়ি থামানোর চেষ্টা করছে। কোনোও গাড়িই থামছে না। বরঞ্চ স্পীড বাড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। নির্ঘাৎ অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে।

সত্যি তাই। একটি মোটরবাইক উল্টে পড়ে আছে। একটু দূরেই একটি কম বয়সি ছেলে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। একটু দূরে পড়ে আছে তার হেলমেট। মেসো গাড়ি স্লো ডাউন করতেই ছোটমাসি চেঁচিয়ে ওঠেন – ‘ করছ কী! পুলিশের ঝামেলায় পড়লে জেরবার করে ছাড়বে।‘ জয়ও বলে, ‘ইউ আর ইন ফর ট্রাবল মেসো!’ এসব কথা যেন তপনের কানেও যায় নি। গাড়ি সাইড করে থামিয়ে নেমে যান তিনি। অগত্যা জয়ও যায় পেছন পেছন।

বছর বাইশ-পঁচিশের একটি ছেলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তার মাথা ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। মেসো ভিড়ের দিকে তাকিয়ে বলেন – ‘আপ মেঁ সে কোই যায়েঙ্গে মেরে সাথ?’ দু’জন লোক এগিয়ে আসে। জয়ের দিকে তাকিয়ে তপন বলেন, ‘তুই একটা ট্যাক্সি যোগাড় করে মাসিদের বাড়ি নিয়ে যা।‘

‘তোমার সঙ্গে যাই।‘

‘না। যা বলছি শোন।‘

মেসোর গলার স্বরে কিছু একটা ছিল। জয় আর কথা বাড়ানোর সাহস পায় না। ছেলেটিকে ধরাধরি করে পেছনের সিটে শুইয়ে দেয় ওরা। একটি লোক তার কাছে বসে। অন্য লোকটা সামনের সিটে বসে। মেসো গাড়ি স্টার্ট করে দেন।

ছোটমাসি বিস্ফারিত চোখে দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। জয় কাছে যেতেই কেঁদে ফেলেন। মেসোর যেচে বিপদে পড়ার স্টুপিডিটি নিয়ে মাথা চাপড়ান। বাড়ি পৌঁছেই রাগে ধৈর্যহারা হয়ে বেডরুমে ঢুকে দরজার ছিটকিনি তুলে দেন। জয়ের খুব হাসি পায়। তার মনে হয়, রাগের এই অভিব্যক্তি মহিলাদের যেন আবহমানকালের এক মুদ্রা। পিউরও খুব ঘুম পাচ্ছে। সেও গিয়ে শুয়ে পড়ে। জয় মেসোকে ফোন করে। ফোন স্যুইচড অফ। সে ডাইনিং স্পেসে বসে থাকে।

রাত এগারোটার পর টেকনোলজি অ্যাপার্টমেন্টের গেট দিয়ে তপনের গাড়ি ঢোকে। ঘরে এসে পা রাখতেই জয়ের চোখে পড়ে মেসোর বাঁ হাতের কনুইয়ের ভেততের দিকে গজ-ব্যান্ডেজ সাঁটা রয়েছে। জয় বোঝে, মেসো রক্ত দিয়ে এসেছেন।

‘কোন হাসপাতালে?’

‘সফদরজং। . . . বেঁচে যাবে।‘

‘আমি যাই।‘

‘একটু বোস। . . . কফি খাবি?’

‘আমি করছি।‘

জয় কফি করে নিয়ে এলে মেসো বলেন, ‘রাগ করেছিস? . . . ওই ছেলেটা তো তুইও হতে পারতি।‘

জয় চুপ করে থাকে। মেসোর কথার জবাবে কী করে সে বলবে – তার সারা শরীরে কেমন যেন হচ্ছে। মনে হচ্ছে, নিংড়াচ্ছে সমস্ত জীর্ণ বসন। তবু একফোঁটা রস বের হচ্ছে না। জয়ের চোখ জ্বালা করছে। চুপচাপ কফি শেষ করে টেবিল থেকে চাবি আর হেলমেট উঠিয়ে দরজার দিকে এগোয় সে। তপন বলেন – ‘সাবধানে যাস।‘  যেন বহু দূর থেকে কথাগুলো এসে খুব স্তিমিতভাবে জয়ের কানে ঢোকে।


Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

স্ত্রীর পত্র

কচুয়া শাড়ি দারাসিং লাফ