আরতি তালগাছ বিড়ি

 

                                

সাত সকালে আরতিকে আসতে দেখে মেজাজ চটকে যায় সুব্রত চক্রবর্তীর সুব্রত তো সাফ বলেই দিয়েছে - ওসব কাগজপত্র নেই তার কাছে তবু পিছু ছাড়ছে না মহিলা

এন. আর. সি-তে নাম ওঠাতে গেলে কাগজপত্র জমা দিতে হবে নাগরিকত্বর দাবির প্রমাণ দিতে হবে আরতির কাছে কোনোও প্রমাণ নেই যে সে এই রাজ্যে অন্তত: ছয় পুরুষের বাসিন্দা বাড়ি এবং জায়গাজমির দলিলে আরতির স্বামীর নাম আছে তাই দলিলের নকল চেয়ে একমাস ধরে হাঁটাহাটি করছে আরতি

আরতি সুব্রতর ছোট কাকিমা কাগজের জন্য বারবার এসে তাগাদা দিচ্ছে সুব্রত কী করে দেবে তা একবার কাগজ পেলে তো জমির আয়ের ভাগও চাইবে কাকিমা কাকিমা আর আগের  মতো নির্বোধ নয় এবং তাকে মন্ত্রণা দেয়ার লোকও জুটেছে কিছু আচ্ছা ফ্যাসাদে পড়েছে সুব্রত

এসব কিছুই হত না, যদি না সুব্রত রাগের মাথায় আরতিকে বাড়ির বার করে দিত রাগের কারণও ছিল নগন্য ফুস্কুড়ি চুলকে ঘা বানিয়েছিল অশোকা, সুব্রতর স্ত্রী কাকিমা তিন মুনিষের খাটনি একলা খাটত সকাল থেকে ঝঁটপাট, লেপাপোছো, বাসন মাজা, কাপড় কাচা, রান্নাবান্নাসব তাকে করতে দেখেছে সুব্রত সেই ছোটকাল থেকে এই সেদিন পর্যন্ত একই ভাবে সংসারের পেছনে খেটেছে কাকিমা একদিন একটু বাড়ির বাইরে বেশি সময় কাটিয়ে ফিরেছিল তাতেই আশোকার খুব অসুবিধে হয়েছিল ভর সন্ধ্যায় গৃহস্থবাড়িতে কিছু কাজ থাকে তুলসিতলায় বাতি দেয়া, ঘরে ঘরে ধুনার ধোঁয়া দেয়া, ঘরের চৌকাঠে জলের ছিটা দিয়ে শঙ্খ বাজানো.... তারপর ছেলেমেয়েগুলো খেলাধুলা সেরে বাড়ি ফিরে  হাউকাউ করে তাদের খিদা পেয়েছেগুড়মুড়ি খেতে দিতে তর সয় না তাদের এমন সময় কাকিমা বাড়ি নেই!

আরতি সেদিন জীবন দাসের সঙ্গে গিয়েছিল রামলাল সাহার কাছে সে বিড়ি বাঁধার কাজ করতে চায় শুনে গলায় তুলসির মালা, কপালে তিলক কাটা রামলাল সাহার চোখে কী যে মুহূর্তের তরে ঝলক দিয়েছিল! আরতি যখন রামলালের অনুকম্পা উদ্রেকের জন্য বলল- ‘আমি ব্রাহ্মণের বিধবা... রামলাল তাকে কাজ দিল ব্রাহ্মণদের দু-চোখে দেখতে পারে না রামলাল এদের ফুটা-কড়ির ভাগ নাই, ফুটানি ষোল আনা ‘রামলাল বিড়ি ফ্যাক্টরি’র মজুররা সকলেই নিম্ন বর্ণের কিছু মুসলমানও আছে তাদের সাথে  আরতিকে জুড়ে দিয়ে ব্রাহ্মণদের একহাত নিতে পেরে খুব চিত্তসুখ হয় রামলালের রামলালের হাসিতে এই জটিল হিসাবটা চিনতে পেরেছিল আরতি কিন্তু লোকটা ভিতরে ভিতরে কী ভাবছে, অত কথায় কাজ নেই আরতির সে ক’টা নগদ টাকা উপার্জন করবে, এটাই বড় কথা

বাড়ি ফিরতে দেরি হয়েছিল আরতির এসেই অশোকার ক্রোধের সামনে পড়ল সে –‘আপনার কাণ্ড-জ্ঞান নাই...!’

পরের দিন দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর অবসর সময়টুকুতে অশোকা দেখে, কাকিমা কী এক পুঁটুলি খুলে বসেছে তার কৌতূহল হয় এগিয়ে এসে ভালো করে দেখে অশোকা শুকনো পাতার ওপর টিনের ছোট একটা পাত বসিয়ে  পাতাটাকে সাইজমতো কাঁচি দিয়ে কাটল একটার পর  একটা পাতা কেটে পাশে কাগজের ওপর রাখল অনেকগুলো পাতা কাটা হয়ে গেলে পর ছোট্ট একটা ডিবে থেকে কী যেন কুচি একটা পাতায় রেখে  সেটি গুটিয়ে কাঠিতে প্যাঁচানো লাল সুতা দিয়ে বাঁধতেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হল মা! তো বিড়ি! অশোকা দৌড়ে ঘরে গিয়ে স্বামীকে বলে –‘দেখ গিয়া কাকিমার কাণ্ড!’

ভাতঘুম চটকে গিয়ে সুব্রত বিরক্ত হয় বারান্দায় এসে ব্যাপার দেখে সে চিৎকার করে ওঠে --ইটা কিতা শুরু করছ তুমি!’

--কেনে কাজটা কি দোষের!

--আমার মান-সম্মান.. তোমারে কিতা খাইতে দেই না নি?’

কথার সত্যি জবাব দিলে মহা অনর্থ হবে আরতি চুপ করে থকে কিন্তু বিড়ি বাঁধা থামায় না এই নিয়ে বাড়িতে কয়েক দিন মহা ক্যাচকেচি চলে আরতি মুখে কিছু বলে না বিড়ি বাঁধাও বন্ধ করে না তার সারা শরীরের নীরব বিদ্রোহ দেখে সুব্রত কী করবে, দিশা পায় না কাকিমা বড় বাধ্য ছিল হঠাৎ তার কী হল!

হঠাৎ করে কিছু হয় নি আরতির সংসারের অবিচার সে সহ্য করেছে আজীবন ভেবেছে --এ তার নিয়তি! যেদিন সে এই বাড়ির কনিষ্ঠ পুত্রবধু হয়ে এসেছিল, সেদিন থেকেই ভাগ্যকে সে মেনে নিয়েছিল অসম্ভব লম্বা, অসম্ভব কালো, রোগা, নারীসৌন্দর্যের সকল মাপকাঠিতে কুৎসিত আরতিকে দেখে শাশুড়ি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন বলে উঠেছিলেন ---‘তালগাছ একটা!’ বধুবরণের সঙ্গে সঙ্গেই এমন মন্তব্য শুনেছিল আরতি সলিলেরও বউ পছন্দ হয়নি সে মুখ গোমড়া করে থাকত সবাই সলিলের বাবা সোমেশ্বর চক্রবর্তীকে দোষারোপ করেছিল তি্নিই তো মেয়ে দেখতে গিয়ে বিয়ের কথা একেবারে পাকা করে এসেছিলেন

সোমেশ্বর সাফাই দিয়েছিলেন --- ‘.... যাওয়ার লগে লগে এই বড় বড় রাজভোগ খাইতে দিল, লালমোহন খাইতে দিল.... সিঙ্গাড়াগুলার কী স্বাদ! .... স্বচ্ছল পরিবার,বাড়ির চাইরদিকে আমগাছ, নাইরকোলগাছ রাইতে ঘুমাইতে দিল ফকফক্কা সাদা বিছানাত..... ভালা বংশ এর পরে আর না করা যায়!’

কী আর করা বিয়ে যখন হয়েই গেছে সলিল এক সময় মেনে নিয়েছিল শাশুড়িও ক্রমে সদয় হয়েছিল আরতি অসম্ভব খাটতে পারে তার রোগা শরীর পবনের আগে চলে মুহুর্তে ঝাঁটপাট, লেপাপোছা সেরে বাসনের কাড়ি পুকুরঘাটে নিয়ে গিয়ে মেজে আনে

বিয়ে যখন একবার হয়েই গেছে . .. . ভেবেছিল আরতিও শ্বশুরবাড়ির অবস্থা ভালো নয় জায়গাজমি সামান্যই বাপের বাড়ির তুলনায় অতি সামান্য তার ওপর আরতির চেহারা নিয়ে যে যা পারে মন্তব্য করে স্বামী পর্যন্ত একটি মধুর কথা বলে না আরতির যে মন বলে একটা বস্তু আছে, সেকথা কেউ ভাবে না।

ক্রমে সলিল নরম হয়েছিল আরতির অক্লান্ত সেবা, কখন সলিলের তৃষ্ণা পায়, না বলতেই বুঝে ফেলে আরতি, নিয়ে আসে গ্লাসভর্তি ঠাণ্ডা জল ধুতি-গেঞ্জি ধুয়ে ভাঁজ করে রাখে ছোট ছোট আরাম দিয়ে স্বামীর মন জয় করেছিল আরতি

হঠাৎই সলিল মরে গেল তার যে হার্টের অসুখ ছিল, সেকথা না জানিয়ে বিয়ে দিয়েছিল জামাইর মুত্যু সংবাদ পেয়ে মেয়েকে নিয়ে যেতে এসেছিলেন আরতির বাবা শাশুড়ি যেতে দিল না বাড়ির বউ, ... শ্বশুরের ভিটে-- এসব বলেছিল গর্বে বুক ভরেছিল আরতির তবে অচিরেই সব গৌরব মুছে যাচ্ছিল শাশুড়ি আরতিকে দিয়ে সারাদিন খাটায় বাড়িভর্তি লোক . . . তবু মাছের ঘরের রান্না আরতিকেই রাঁধতে হয় আর সব বাকি কাজগুলো তো আছেই অতগুলো লোকের রান্না সেরে স্নান করে এসে নিজের জন্য দু’টি ফুটিয়ে নেয় আরতি খেয়ে উঠতে না উঠতেই বেলা গড়িয়ে যায় উঠানের পড়ন্ত রোদের দিকে তাকায় আরতি বুকের তলায় কষ্ট নড়াচড়া করে মায়ের কথা মনে পড়ে মা বলত . . . . ‘মাটিরে দেখ, মাটিরে কত সহ্য করে..... মাটির দিকে চাইয়া কষ্ট সহ্য করা শিখ!’ রোদের দিক থেকে চোখ নামিয়ে মাটিতে দৃষ্টি নিবন্ধ করে আরতি মা কি জানত, আরতির জীবন কষ্টের হবে!

শ্বশুরের মৃত্যুর পর নিরামিষ ঘরে দুধ-ঘি এসেছিল শাশুড়ি সময়মতো খাবে . . . রান্না নামতে বেলা হলে চলে না তাই মাছের ঘরের রান্নার থেকে ছুটি পেয়েছিল আরতি এও তো ভাগ্যই ভাগ্য সব সময় অপ্রসন্ন থাকে না

শাশুড়ি বেশিদিন বাঁচেন নি সংসারে বড় জায়ের রাজত্ব শুরু হল রাজত্ব নিয়ে বড় জায়ের সাথে অশোকার চাপা সংঘর্ষ শুরু হল অশোকা খুব চালাক মেয়ে খুড়শাশুড়িকে ঘুঁটি বানিয়ে শাশুড়িকে ঘায়েল করল বলল – ‘কাকিমার বয়স হইছে, অখন থাকি উঠান-ঝাড়ু আর কেউ দেউক...। অশোকা চাইছিল, আরতি আবার আগের মতো মাছের ঘরের রান্নাটা করুক অশোকা নিজের কাজের সিংহভাগ আরতির ওপর চাপিয়ে দেয়ার জন্য অন্য দুএকটি কাজ, যা আরতি করত, লাঘব করে দিল চালটা ধরতে পেরেও অশোকার ওপর খুশি হল আরতি ‘কাকিমার বয়স হইছে . . . ‘এই দরদের কথা তো অন্তত বলেছে অশোকা। আর রোদে-বানে-জাড়ে অতবড় উঠান ঝাড়ু দেয়ার চাইতে মাছের ঘরের রান্না করা তুলনায় সহজ।

খুড়শাশুড়িকে দিয়ে বাজার থেকে এটা-ওটা আনায় অশোকা লুকিয়ে আনায় হালফ্যাশানের চুলের কাঁটা, ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি ক্রিম... আরতিকে হাটে পাঠানো শুরু করেছিল সুব্রত বুধবারে রানির বিলের পাড়ে হাট বসে হাটে আনাজপাতি সস্তা কাকিমাকে পাঠিয়ে সস্তার সওদা  করায় সুব্রত সংসারের সাশ্রয় হয় আরতিরও ভালো লাগে কাজটা বাড়ির গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে  মুক্তির স্বাদ পায় সে তাই বুধবারের জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করে আরতি হাটের পথে লোকজনের সাথে দুটো কথা হয় ভালো লাগে 

জীবন দাসের সাথে এভাবেই আলাপ হয়েছিল একদিন সওদা সেরে বাড়ি ফেরার পথে জীবন দাস জিজ্ঞাসা করেছিল‘আপনার কে কে আছে মাসি?

-‘কেউ নাই বাবা

-‘তাইলে এত সব আনাজপাতি?  আরতির দুই হাতে দুটি ভারি ব্যাগের দিকে তাকিয়ে জীবন প্রশ্ন করে

আরতি চুপ করে থাকে জীবন আরতির হাত থেকে বেশি ভারি ব্যাগটা প্রায় ছিনিয়ে নেয় ভার লাঘব করে দিয়ে বাকি রাস্তা সে সাথে হাঁটে আরেকটু এগিয়ে বাঁ দিকে জীবনের বাড়ির পথ বেঁকে গেছে জীবন বাড়ির পথ না ধরে এগোয় আরতির বাড়ির সামনে এসে ব্যাগ  নামিয়ে দিয়ে চলে যায়

এমন নির্ভেজাল দরদ কেউ দেখায় না আরতিকে আবেগে তার চোখগুলো জ্বালা করে শুকনো চোখ জলসঞ্চার করতে না পেরে পোড়ে আজকাল ভারি কিছু বইতে কষ্ট হয় কিন্তু কাকে বলবে সে কথা শরীর বেচাল করে বলে সরকারি ডাক্তারখানায় গিয়েছিল ডাক্তার ঔষধ লিখে দিয়েছে প্রেসারের ঔষধ সুব্রত ঔষধ কিনে আনছে না রোজই আজ না কাল করছে

জীবনের সাথে প্রত্যেক হাটবারে দেখা হত সুখ-দুখের কথা হত একদিন ফেরার পথে তার বাড়িতে গিয়েছিল আরতি জীবনের পরিবারের প্রত্যেকে বিড়ি বাঁধার কাজ করে ছোট মেয়েটা পর্যন্ত কী দক্ষতার সাথে পাতায় এক চিমটি তামাককুচি রেখে গুটিয়ে বিড়ির আকার দিল, আগার দিকটা নরুনকাঠির মতো শলা দিয়ে গুঁজে দিয়ে লাল সুতো দিয়ে বেঁধে দিল বিড়িটা এত দ্রুত তার হাত চলছিল – দেখে  তাক লাগে আরতির

-আমি পারমু নি বা কাম ?’

-‘কেনে পারতা নায়

জীবন দেখায়, কী করে লোহার পাতটি বসিয়ে সাইজমতো পাতাটি কাটতে হবে কী করে লম্বা করে তামাককুচি রেখে সেটি গোটাতে হবে, বাঁধতে হবে জীবনের থেকে কয়েক টুকরো পাতা চেয়ে নিল আরতি তামাক পাতার বদলে এমনি শুকনো পাতার কুচি রেখে বিড়ি বাঁধায় হাত পাকাল তারপর তাকে রামলাল সাহার কাছে নিয়ে গিয়েছিল জীবন

প্রথম মজুরির টাকা পেয়ে কী সে আনন্দ! আরতি নিজের ঔষধ কিনেছিল আর সুব্রতর পুয়া-পুড়ির জন্য নিয়ে এসেছিল ল্যাবেঞ্চুস তাতে সুব্রতর কেন যে এত রাগ হল, বুঝে উঠতে পারে না আরতি ল্যাবেঞ্চুসগুলো অশোকা অতসীগাছের ঝোপের দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিল

সুব্রত বলে দিল – এই  বাড়িতে থাকতে হলে বিড়িবাঁধা ছাড়তে হবে আরতি ভেবেছিল – সুব্রত  কথার কথা বলছে কিন্তু সত্যিই তাকে বাড়িছাড়া করল সুব্রত বাড়ির একেবারে সীমানায় পুরোনো একটি দোচালা ঘর ছিল সংসারের সব বাতিল জিনিস থাকত সেখানে পুরোনো ট্রাঙ্ক, ভাঙ্গা চেয়ার, দুমড়ানো হাঁড়ি-পাতিল সেগুলো একপাশে সরিয়ে, ঝাটপাট দিয়ে নিজের জন্য জায়গা করল আরতি ভাঙ্গা জিনিস ঘেঁটে  দুএকটা বাসনপত্র, ফুটো কড়াই একটা, তোবড়ানো অ্যালুমিনিয়মের সসপ্যান, আরো কিছু টুকিটাকি যোগাড় করল আরতি একদিকে একটি চুলা বানালো তারপর গিয়ে দাঁড়াল রামলাল সাহার কাছে সুব্রত ভেবেছিল- পেটের খিদা চাগাড় দিলেই কাকিমা কেঁদে-কেটে এসে দাঁড়াবে তার কাছে সুব্রতর হিসেবে ভুল ছিল

রামলাল সাহা দয়া দেখাল চাল-ডাল দিল নগদ কিছু টাকা দিল মজুরির অগ্রিম হিসেবে এই দয়ার পেছনে তারও হিসেব ছিল তার গুরুদেব আসবেন গুরুদেব এলে থাকেন কিছুদিন গুরুদেব এলে রান্না করত যে মহিলা, সে কিছুদিন আগে মারা গেছে আরতিকে দিয়ে এবার কাজটা করাবে রামলাল

আরতি না করতে পারে নি সে ব্রাহ্মণের শুদ্ধাচারি বিধবা সাহা-বাড়িতে রান্না করতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে বড় নিরুপায় বোধ করেছিল আরতি রামলালের ভরসায়ই তো জীবন কাটছে লোকটাকে চটালে বিপদ আছে

গুরুদেব চলে গেলে রামলাল আরতিকে নগদ টাকা এবং একখানা কাপড় দিয়েছিল কাপড়টার বাইন ভালো

দিন পর পথে মুক্তির সাথে দেখা মুক্তি জিজ্ঞাসা করে--কাকিমা ভালা নি ?’

এই মুক্তিই পুকুরঘাটে দেখা হলে কথা বলে না শুধু মুক্তি নয়, সকলেই এড়িয়ে চলে আরতিকে যেন সে ঘোর অপরাধী এখন মুক্তি সাহস করে কথা বলছে, কারণ আশেপাশে কেউ নেই, যে দেখে ফেলবে মুক্তি বলে – ‘নূতন কাপড় নি কাকিমা ?’

--অয় ... সাহাবাড়ি থাকি দিছে

মিহি সুতোর কাপড়খানি পরখ করে মুক্তি এরকম একটি কাপড় পেতে মনে মনে ইচ্ছে হয় তার মুক্তি অধীর চক্রবর্তীর বিধবা বোন দাদার বাড়িতে সারাদিন দাসীবৃত্তি করে আরতির মনে হয়, খুব বেঁচে গেছে সে তার অবস্থাও তো মুক্তির মতোই ছিল

 আজ আরতি গিয়েছিল মজুরির টাকা আনতে আজকাল সপ্তাহে একবারই যায় সে কেবল মজুরি আনার দিন বাকি দিনগুলোতে অতটা পথ ডিঙ্গিয়ে তাকে যেতে হয় না জীবন দাস এনে দেয় কাঁচামাল জমা দিয়ে আসে বাঁধা বিড়িগুলো জীবন খুব সাহায্য করে খুব নিঃস্বার্থ সাহায্য করে পৃথিবীতে এমন মানুষও আছে তবে আরতির মুখের রেখাগুলো কোমল হয়

সুব্রত কাগজ দিচ্ছে না জীবন বলেঅত হতাশ হওয়ার কারণ নেই অনেকের কাছেই কোনো কাগজ নেই কিছু একটা রাস্তা বার হবে কয়েকদিন পর জীবন বলেতহশিল অফিসে একজন   আছেসে অনেকের কাগজ বার করে দিচ্ছে জীবন আরতিকে নিয়ে বাবুটির কাছে গেল বাবুটি একটা দরখাস্ত লিখলআরতির  দিকে তাকিয়ে বলল – ‘সই  করতে পারবায় নি ?’

-অয়

বাবুটি আরতিকে কলম দেয় বহুদিন পর হাতে কলম ধরে কী যেন এক অনুভূতি হয় আরতির তার হাত কাঁপে সে যে এককালে লেখাপড়া করেছিল নিজেই  ভুলে গেছে সেই কথা হাত কাঁপলেও টানা আক্ষরে নিজের নাম স্পষ্ট সই করে আরতি এমন সুন্দর হস্তাক্ষর দেখে বাবুটি আরতির মুখের দিকে তাকায় আবার  তার সইটি দেখে কী যেন হিসেব মেলে না বাবুর দরখাস্ত ফাইলে রাখতে রাখতে বাবু বলে, দশদিন পর পাঁচশো টাকা নিয়ে আসতে সে কাগজ রেডি রাখবে

পথে নেমেই জীবন বলে – ‘আপনে  লেখাপড়া জানেন মাসি!’

নগদ পাঁচশো টাকা কীভাবে যোগাড় করবেভেবে কুল পায় না আরতি জীবন বলেঅত চিন্তা না করতে কিছু একটা ব্যবস্থা হবে

 দিন পর কাঁচামাল দিতে এসে জীবন বলে ‘মাসি, বুধবারে মিটিং আছে আমরা যারা বিড়ি বান্ধি, তারার মিটিং আপনে আইবা মিটিংঅ

-কিতা মিটিং ?’

-‘শিলচর থাকি প্রবোধ সিংহ আইবা ..

-কে প্রবোধ সিংহ ?’

-গেলেই দেখবা

রানীবাজারের একটি বাড়ির উঠানে মিটিং হয়েছিল এই প্রথম আরতি দেখল  কত  কত  স্ত্রীলোকেরা বিড়ি বাঁধার কাজ করে বিড়ি শ্রমিক ইউনিয়ন বলে যে কিছু আছে, এই প্রথম শুনল সে  প্রবোধ সিংহ বক্তৃতা দিলেন বললেন - শ্রমকদের ন্যায্য মজুরি না পাওয়ার কথা মালিক মজুরদের কিভাবে কিভাবে ঠকাচ্ছে, তার ব্যাখ্যা করে এই  বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা বললেন রাজ্য জুড়ে সংগ্রামের প্রস্তুতি চলছে, সেই খবর দিলেন প্রবোধ রানীবাজার কমিটিতে কোনও মহিলা নেই অথচ  বিড়িমজুরদের বেশির ভাগই মহিলা তাই আজ একজন মহিলা মজুরকে কমিটিতে নেয়া হোক, বললেন প্রবোধ

জীবন উঠে দাঁড়িয়ে বলে আরতি  চক্রবর্তীকে নেয়া হোক কমিটিতে তিনি একজন লেখাপড়া জানা মানুষ

সকলে সমস্বরে বলে ওঠে ‘কে  আরতি চক্রবর্তী ?’

আরতিকে উঠে দাঁড়াতে হয় ভিড়ের মধ্যে এক মহিলাকন্ঠ বলে ওঠে – ‘বাপ রে! অলা লম্বা বেটি!

সকলে হেসে ওঠে এমন অকস্মাৎ পরিস্থিতির জন্য অপ্রস্তুত আরতির মাথা ঝনঝন করে সে ধপ করে বসে পড়ে

মিটিং শেষে সবাই চলে গেলে জীবন আরতিকে নিয়ে প্রবোধ সিংহর মুখোমুখি বসে প্রবোধ আরতির দিকে স্পষ্ট চোখে তাকান – ‘জীবন কইছে আপনার কথা তহসিল অফিসে ঘুষ না দিতে বলেন প্রবোধ, তিনি দেখছেন, বিনা উৎকোচে কিভাবে কাজ হাসিল করা যায়  

-‘আমারে যে মেম্বার বানাইলেন, কাম কি করতে হইব, কিছুই তো জানি না

-কাম করতে করতেই কাম শিখবেন

প্রবোধ বলেনবিড়ি শ্রমিকদের বেশির ভাগই স্ত্রীলোক তারা সম্পূর্ণভাবে স্বামী এবং পরিবারের চাপে থাকে, মজুরির টাকায় পর্যন্ত অধিকার নেই তাদের ‘...... অধিকারের লড়াইটা ঘরে এবং বাইরে লড়তে হইব দিদি আপনে এই যুদ্ধে সবাইরে আউগগাইয়া আনবেন ...

-আমি পারমু নি কাম!’

জীবন বলে ওঠে – ‘পারবা  মাসি মনো আছে নি, বিড়ি বান্ধা শিখার আগেও কইছলা – ‘পারমু নি কাম ?’

দুদিন পর মজুরি আনতে গেলে রামলাল সাহা বলে ছিছি আপনে ব্রাহ্মণ হইয়া ওইসব অজাত কুজাতগুলার লগে গিয়া বইলেন!  প্রচ্ছন্ন ভয় দেখাল রামলাল আরতির প্রতি দয়া দেখিয়েছিল সে সাবধান না হলে কাজ দেবে না আর

জীবন দাস বলে –‘কইলেই হইলো? দেখি চাই কেমনে না দেয়? জীবন দাস অভয় দেয়। - আরতির  পেছনে ইউনিয়ন আছে, রামলালের সাহস হবে না ....  

এসব ভাষা আরতির কাছে নূতন সে বোঝার চেষ্টা করেজীবন  কী বলছে তার মনে পড়ে -  দশের  লাঠি, একের বোঝাইশকুলে পড়ার সময় গল্পটি ক্লাস টু- বাংলা বইয়ে ছিল  দশজনের সাথে আঁটি বেঁধে থাকলে রামলালের সাধ্য নেই তাকে ভাঙ্গে

আরতির গতিবিধির সব খবর রাখে সুব্রত যখন সে শুনল, কাকিমা তহসিল অফিসে গিয়েছিল, ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে আরতির ঘরের সামনে এসে গালাগালের ভূত ছোটার সে - চক্রবর্তীকুলের কলঙ্ক আরতি সুব্রত বলে – ‘দলিলো ছোট কাকার নাম থাকলেও প্রমাণ করতে পারবায়, তুমি তান স্ত্রী!’

- ইটা তুমি কিতা কইলায় সুবু!’ আরতির সারা শরীর ঝনঝনিয়ে ওঠে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে সে তার মস্তিকে কেবল চিৎকার চলেপ্রমাণ  করতে পারবায়!!  অসহ্য যন্ত্রণা হয় আরতির যেন মৃত্যুযন্ত্রণা

পাশেই অধীরের বাড়ি সেখানে গিয়ে আস্ফালন করে সুব্রত কী লইজ্জার কথা, কী অন্যায় ..অধীর চক্রবতী ধুয়া তোলে – গেল গেল.. সব গেল অজাত-কুজাতোর লগে উঠে -বয়, অফিস-কাছারিত গিয়া দরবার করে ... অভিভাবক নাই নি ?’  ঘরের ভেতর থেকে মুক্তি বিড়বিড় করে – ‘তোমরা কেমন অভিভাবক, জানা আছে!’

চক্রবর্তীরা একযোগে আরতির অভিভাবনা ভাবল তাকে তারা সমাজচ্যুত করল এরকম অনাচারি স্ত্রীলোককে তার যোগ্য শাস্তি আরো আগেই দেয়া উচিত ছিল বিশেষ করে, আরতির মতো বিধবা আরো কয়েকজন আছে চক্রবর্তীদের কারো কারো বাড়িতে তাদের শাসনে রাখতে হলে এই শাস্তিবিধান অবশ্য কর্তব্য

পর পর আঘাতগুলো আরতিকে স্তম্ভিত করে রাখে এরকম সময়ে একদিন যখন সমস্ত পাড়া ঝেঁটিয়ে গেছে সমর চৌধুরির ছেলের চতুর্থমঙ্গলের ভোজে, কেবল আরতি নিমন্ত্রণ পায়নি, ঘরের দাওয়ায় বসে শেষ ফাল্গুনের রোদের দিকে ঠাঁয় তাকিয়ে থাকে আরতি চারপাশের বাড়িঘরের দরজায় তালা, জনমানবহীন নিঝুম পু্রী, উঠানের এক কোনে অড়হর গাছগুলোর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে, আজ তাতে জল দেয়া হয় নি, আজ অনেক কাজই হয় নি আরতির, এমন কি বিড়ি বাঁধতেও ইচ্ছে করছে না বহুদূর  থেকে কাকের একটি কা ডাক এই অসহ্য শূন্যতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় সমস্ত অতীত হুমড়ি খেয়ে পড়ে আরতির সামনে আরতি শুনেছেতার   জন্মের সময় ঠাকুদা বাড়ি ছিলেন না জরিপের কাজে বনে-জঙ্গলে ছিলেন চারদিন পর ফিরে এসে জন্মসংবাদ শুনে বলেছিলেন – ‘আবার পুড়ি হইছে!..ইগুরে নিয়া কলাগাছোর তলে ফালাই দেওজ্ঞান হওয়া অবধি মা শিখিয়েছে, মাটির দিকে তাকিয়ে সহ্য করতে কুরূপা মেয়েকে অনেক সহ্য করতে হবে, বুঝেছিল মা তাই তাকে তৈরি করে দিচ্ছিল  

 স্কুলেও সেরকম কোনো বন্ধু জোটে নি আরতির, অসুন্দর বলেই বুঝিবা কেউ তার সাথে বন্ধুত্বে আগ্রহী হয় নি সর্বকালেই সে একা তবু আনন্দের অভাব ছিল না জীবনে পুকুরের দূর কোনে গায়ে গায়ে তিনটি তালগাছ ছিল খুব তাল ধরত ভাদ্রমাসে পাকা তাল বিলিয়ে শেষ করা যেত না পুকুরের জলে ধুপ করে পাকা তাল পড়ত আরতি স্নানের সময় সাঁতরে গিয়ে ভাসমান পাকা তাল তুলে আনত মা বলেছিল তালের ইতিকথা – ‘. . .  বাপে রোয়, পুতে চায়, নাতিয়ে খায় বা না খায়..তাল ফলের জন্য অন্তত: তিন পুরুষ অপেক্ষা করতে হয় আরতির ঠাকুর্দার ঠাকুর্দা নাকি এই তালের বীজ পুঁতেছিলেন

কোম্পানীর আমলে ভাগ্য ফেরাতে সেই আদিপুরুষ হোজাইর কপিলি নদী-বিধৌত উর্বর ভূখন্ডে চাষ দিয়েছিলেন এই রাজ্যে আরতির বাস ছয় পুরুষ ধরে তার প্রমান কোথায় পায় আরতি তালগাছ কথা বলে না যে !

বাবাকে মনে পড়ে আরতির বাবা স্নেহ করতেন তিনিও মেয়ে ক্লাস নাইনে উঠতেই বিয়ে দিয়ে দিলেন তাঁরও ভয় ছিল, দেরি করলে মেয়েকে পার করতে পারবেন না শ্বশুরবাড়িতে কী অনাদর, অবহেলা জুটেছিল, বাবা জানেন নি  সেই শুরুর সময়েই কাড়ি কাড়ি বাসন মাজতে মাজতে কিংবা কাপড় কাচতে কাচতে এখানকার তালগাছের দিকে তাকিয়ে হোজাইর বাড়ির তালগাছকে স্মরণ করত আরতি শাশুড়ি তাকে তালগাছের সাথে কেন তুলনা করেছিলেন, কে জানে তালগাছ তো অসুন্দর নয়! পুকুরঘাটে এলেই তালগাছের দিকে তাকাত আরতি মনে মনে কথা বলত তার সাথে  

আরতি জানে, এসব পাগলামি ধরা পড়লে বিপদ আছে, তাই খুব সাবধানে গোপন খেলাগুলো খেলে জীবনকে সহনীয় করেছিল সে ছোটবেলা থেকে একাচোরা স্বভাব তার একলা গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত কপিলি নদীর ধারে মনের চোখ দিয়ে দেখত, নদীর ঘোলাজল গিয়ে ব্রহ্মপুত্রে পড়ছে, তিলে তিলে তৈরি করছে দ্বীপ বরাইল  পাহাড়ের মাটি গিয়ে বানাচ্ছে মাজুলির চর ভাবনার খেলাগুলো জীবনটাকে মায়াবি করে দিত তখন মাটির দিকে তাকিয়ে সহ্য করার শিক্ষা ভুলে থাকত আরতি

কী হত, যদি বিয়ে না হত তার?  বাবা তাকে পার করে দিতে পেরে স্বস্তি পেয়েছিলেন কি? কিছুদিন পরই মেয়ে বিধবা হল দেখে প্রাণ কেঁদেছিল তাঁর? ঠাকুর্দার কথামতো সত্যিই যদি তাকে কলাগাছের তলে.... তাহলে কি কোনও জনক রাজা তুলে নিতেন আরতিকে?

সলিল চক্রবর্তী নামের লোকটা হার্টের অসুখের কথা গোপন রেখে বিয়ে করেছিল একদিনের তরেও ভালোবাসেনি স্ত্রীকে কিন্তু স্ত্রীর সেবা নিতে তার কোনো দ্বিধা ছিল না এমন মিথ্যাচারি, বিবেকহীন, ভালোবাসাহীন একটি মানুষের জন্য বৈধব্যের সমস্ত আচার পালন করেও আরতিকে শুনতে হলসেই  মানুষটা যে তার স্বামী ছিলতার  কোনও প্রমাণ আছে ?  

  হোজাইর বাড়ির তালগাছ সাক্ষী, আরতির জন্ম এই আসাম রাজ্যে এই বাড়ির পুকুরপাড়ের তালগাছ সাক্ষী -- সলিল চক্রবর্তীর সাথে তার বিবাহ হয়েছিল সুব্রত মিথ্যা বলে  তালগাছ কী মিথ্যা বলবে? কপিলি নদী? কপিলি কি জানে --ফল্গুর জল কেন শুকিয়ে ছিল? মিথ্যার শাস্তি হয় পবিত্র তুলসিগাছে কুকুর মোতে সুব্রতরও শাস্তি হবে

দূরে কোথায় পায়রা বকম-বকম করে নিশ্চল আরতির দিকে নিল্পলক তাকিয়ে তাকে একটি টিকটিকি হঠাৎ আরতি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে টিকটিকিটি নিশ্চিন্ত হয়ে বেড়ার ফাঁকে ঢোকে আরতি মায়ের সহ্যমন্ত্র স্মরণ করে মাটির দিকে তাকায় মাটি বলে--আমি সহ করি, একথা সত্য সহ্যের সীমানা ছাড়ালে ভূমিকম্পও তুলি...মাটির থেকে সমর্থন না পেয়ে রোদের দিকে তাকায় আরতি তাকিয়ে থাকতে থাকতে দুই চোখে আঁধার নামে তখন পেট জানান দেয় খিদের খবর আরতি উঠে দাঁড়ায় ধুচুনিতে চাল নিয়ে পুকুরঘাটে যায় স্বজাতিদের উৎসবে অনাহূত হওয়ার অপমান এবং নিষ্ঠাবতী বিধবার অস্তিত্ব-সঙ্কটের দিকে পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ তাকিয়ে থাকে ঘাটের পৈঠা বেয়ে নামতে থাকা আরতিকে সে বহু বছর ধরে জানে এই ঘাটেই তো এই নারী বছরের পর বছর কাড়ি কাড়ি বাসন মেজেছে, টাল টাল কাঁথাকানি ধুয়েছে, তার নিজের কোনো সন্তান নেই, তবু সে কত বাচ্চার গু-মুত কেচেছে এই ঘাটে সংসারের সব কাজ সে ভালোবেসে করত, তাই তো তার অসুন্দর মুখে অন্তরের লাবণ্য ঝলমল করত আজ তার মুখ বড় মলিন, বড় করুণ দেখে দুঃখ হয় তালগাছের  

 চাল ধুতে যাবে আরতি, এমন সময় চোখে পড়ে, ঘাটের কিনারে, যেখানে পাড়ের পাতা-ডোবা জল, সেখানে পড়ে থাকা সকড়া ভাতের ওপর একটি চ্যাংমাছ ভেসে আছে, ভাত খাচ্ছে নিমেষে ধুচুনি ডুবিয়ে চ্যাংমাছ তুলে আনে আরতি  ধুচুনির খানিকটা চাল জলে পড়ে যায় তার তোয়াক্কা না করে বাঁ হাতের মুঠিতে চ্যাংয়ের মাথা চেপে ধরে এক হাতে বাকি চালগুলো ধুয়ে ঘরে ফেরে আরতি তখন হঠাৎই তালগাছের পাতাগুলো ফড়ফড় করে ওঠে গাছের ওপর থেকে দুজন শাকচুন্নি ফিসফিস হাসে একজন অন্যজনকে বলে --দেখস নি রাঁড়ির কাণ্ড!’

 ঘরে এসে চুলা ধরায় আরতি ভাত বসিয়ে চ্যাংমাছের আঁশ ছাড়ায়, পেট কেটে ভড় বার করে, বাটিতে জল নিয়ে কাটা মাছ ধুয়ে জ্বলন্ত আগুনে চ্যাংমাছ পোড়ায় নুন-তেল-কাঁচামরিচ দিয়ে পোড়া মাছ মেখে গরম ভাত দিয়ে খায় আরতি মাছের স্বাদ বিস্মৃত অতীতকে চাগিয়ে দেয় হোজাইত পাকের ঘরের মেঝেতে পাঁচ-সেরি চিতল মাছ, খলুই ভর্তি কাচকি মাছ, বৃহৎ চিতল আর ক্ষুদ্র কাচকির মাঝখানে জেগে ওঠে রুই-কাতলা, ঘনিয়া-বাউস, হোগা-মকা, কই-মাগুর, পাবিয়া-ট্যাংরাঅসংখ্য   রকমের মাছ আরতির আশ্চর্য লাগে, কই বিধবার নিষ্ঠা ভঙ্গ করে কোনো অনুশোচনা তো হয় না!

আরতি থালাবাসন ধুতে আবার ঘাটে আসে তখন তালগাছের পাতাগুলো অসম্ভব ফড়ফড় করে আরতির আশ্চর্য লাগে, বাতাস নেই – তবু  তালের পাতা কাঁপছে!

আসলে শাকচুন্নির দলে অসম্ভব জটলা হচ্ছে আরতি এটা কী করল! বিধবার নিয়মনিষ্ঠা ত্যাগ করে .... কী অনাচার! সবাই একসাথে বলেঅনাচার!  তখন একজন শাকচুন্নি বলেআরতি ঠিকই করেছে এতদিনে নিজের জীবনের হাল নিজে ধরেছে নিষ্ঠা ধুয়ে জল খাবে! বয়োজ্যেষ্ঠ শাকচুন্নিটি এতক্ষণ চুপ করে ছিল এবার সে বলে – ‘তোরা  তো বিধবা হস নাই, শাঁখাসিন্দুরে মরছস, আরতির কষ্ট বুঝবি না

যাঃবলে শাকচুন্নির দল তখন উড়াল দেয় আরতি দেখেহঠাৎ পাতা কাঁপা থেমে গেল  

তালগাছ স্থির চোখে আরতিকে দেখে তার প্রাচীন প্রাণ আশীর্বাদ করে – ‘তোমার জীবনের নূতন পর্থ নির্বিঘ্ন হোক নারীহাওয়ায় এই আশীর্বাণী তরঙ্গিত হয় এই তরঙ্গ ভূমিস্পর্শ করে তখন আগামি ভাদ্রে যে ফলগুলো পাকবে তার ভ্রূণ তৈরি হয়, গোড়ার থেকে কাণ্ডের দিকে সঞ্চারিত হয় সেই ভ্রণরস পাতার শিরায় শিরায় পুলক জাগে

 

    গভীর রাতে আরতির দরজায় এসে কেউ ডাকেকাকিমা, দরজা খুলইনআরতি ভয় পায় স্খলিত স্বরে বলে--কে ?’

- আমি মুক্তি . . . ডরাইন না 

- তুই ? এত রাইতে ?’

- রাইত ছাড়া কেমনে আইতাম ?’ 

কোঁচড় থেকে কিছু চাল-ডাল-সবজিপাতি নামিয়ে দেয় মুক্তি বলে, আজ সমর চৌধুরির বাড়িতে নিরামিষ ঘরে রান্নাবান্না করতে করতে বিধবারা আলোচনা করছিল আরতির প্রতি অবিচারের কথা তারাই এই চাল-ডালগুলো বাঁচিয়ে লুকিয়ে পাঠিয়েছে

-- আবার আইমু ...’ বলে মুক্তি চলে যায় ত্রস্তপদ সেই যাওয়ার দিকে থতমত তাকিয়ে থাকে আরতি

 

 

 

Comments

Popular posts from this blog

স্ত্রীর পত্র

কচুয়া শাড়ি দারাসিং লাফ