অনন্যা


গেট খুলে ঢুকতেই টুনু বলে – ‘বৌদি, অনুদি আইছে মাইয়ারারে লইয়া …..তিনডা মাইয়াই ল্যাংডা!’ শুনে জিভে কামড় দেয় কবিতা। অনুকে নিয়ে আর পারা যাচ্ছে না। এবার কোন ঝগড়া পাকিয়ে এসেছে কে জানে।

ভেতরের উঠানে অনু শুভশ্রীর সাথে এক্কা-দোক্কা খেলছিল। বাঁ হাতে শাড়িটা প্রায় হঁটুর ওপর তুলে এক ঠ্যাঙে অনায়াসে লাফ মেরে মেরে মাটিতে আঁক কাটা ঘরগুলো পেরিয়া যাচ্ছিল। দিদিকে আসতে দেখে শাড়ি নামিয়ে সে দৌড়ে এগিয়ে আসে। দিদি চোখ পাকিয়ে তাকায়। বোনের সাথে একটি কথাও না বলে ঘরে গিয়ে ঢোকে। কবিতাকে দেখে শাশুড়ি বলেন – ‘তোমরা অরে অত তাড়াতাড়ি বিয়া না দিলে পারতা …..!’

এই অভিযোগে অভ্যস্ত হয়ে গেছে কবিতা। উনিশ বছর বয়সেই সে বোনের বিয়ে কেন দিয়েছিল, এখন এসে সেই তর্কে লাভ নেই কোনো।  

গল্পটি লম্বা। কবিতারা ছোটবেলা বাংলাদেশে কাটিয়েছে। ভালো অবস্থা ছিল তাদের। কিন্তু পরপর মা-বাবা মারা গেলেন। কাকামণি খবর পেয়ে তাদের দু’বোনকে আগরতলা নিয়ে এলেন। কবিতার বয়স তখন সতর। সবে ম্যাট্রিক পাশ করেছে। অনিতার পাঁচ। অনু তার চাইতে বারো বছরের ছোট।

কাকামণির কাছে আদরে ছিল তারা। কবিতাকে ইশকুলে ভর্তি করে দিলেন। আবার করে মাধ্যমিক পাশ করল সে। তারপর উচ্চ-মাধ্যমিক। কাকামণি প্রভাবশালী মানুষ। তাই সহজে স্কুলে ভর্তি হতে পেরেছিল কবিতা। তাও শহরের সেরা স্কুলে।

কবিতা লেখাপড়ায় ভালো ছিল। তার ওপর পড়ায় দুই বছর পিছিয়ে গিয়েছিল। সহপাঠিদের থেকে বয়সে বড় হওয়ার ফলে পাঠ্যক্রম অনায়াসে অধিগত করতে পেরেছিল। কাজেই বোর্ডের পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেল। তারপর কলেজ পাশ করে চাকরি পেল। তারপর তার বিয়ে হল। বিয়ের কিছুদিন পর শাশুড়ি বললেন – ‘এইবার বইনটারে নিজের কাছে নিয়া আস।‘

অনুর তখন ক্লাস এইট। লেখাপড়ায় প্রচণ্ড অমনোযোগ। কবিতা ভেবেছিল – অনুশাসনে রাখলে বোনের লেখাপড়া হবে। কাকার বাড়িতে দেখাশোনার কেউ নেই। তাই অনু পড়াশোনা করে না।

দিদির বাড়ির টাইট অবস্থায় অনুর হাঁফ ধরে। তবে চাপে থাকার ফলে এই প্রথম সব বিষয়ে পাশ করে সে ক্লাস নাইনে ওঠে সে ।

ছাত্রী সে খারাপ, কিন্তু অন্য গুণ আছে তার। ভালো নাচে-গায়। দেখতে লম্বা ছিপছিপে, শার্প নাক, বড় বড় চোখ, চাপা ওষ্ঠাধরে কী যেন লুকিয়ে আছে। বার্ষিক নাট্য উৎসবে সেবার ঠিক হল – ‘নটীর পূজা’ হবে এবার। অনিতাকে শ্রীমতীর ভূমিকায় ট্রায়াল দিতে গিয়ে দেখা গেল – এই মেয়ের অসাধারণ অভিনয়-প্রথিভা।

 শ্রীমতীর ভূমিকায় দুর্ধর্ষ অভিনয় করেছিল অনিতা। বিশেষ করে শেষ দৃশ্যে প্রাণ ঢেলে সে নেচেছিল। কী এক ঘোর লেগেছিল তার মনে। নাচের মধ্য দিয়ে গয়নাগুলো – ভারি কানের দুল, গলার হার, হাতের বালা-চুড়ি, সব খুলে ফেলে দিতে দিতে নৃত্যরসে তার চিত্ত সেদিন সত্যই বেজেছিল। সব শেষে সে যখন চিনাংশুকের তলায় তার গেরুয়া বাস উন্মোচন করে দিয়েছিল – রাজশাসনের অস্ত্রাঘাতে বুদ্ধের বেদীতলে তার লুণ্ঠিত নিথর দেহ দর্শকদের কাঁদিয়েছিল সেদিন। সব চাইতে বেশি কেঁদেছিল অনু নিজে। তার কান্না কেউ থামাতে পারছিল না সেদিন।

দিদি বলে – ওসব নাচ-টাচ দিয়ে ভবিষ্যৎ তৈরি হয় না। আসল হল লেখাপড়া। কিন্তু ওই আসল ব্যাপারে অনীহা অনিতার। যখন মনে হবে খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু লিখছে সে, পেছন থেকে উঁকি মেরে দেখা যাবে, মহা অভিনিবেশে সে লেখার খাতায় ছবি আঁকছে। ফুল-লতাপাতা-পাখি-প্রজাপতি আঁকছে। পেছনে দিদি এসে দাঁড়িয়েছে, সেই হুঁশ নেই। তখন পট পট গালে চড় খায় অনু। তবু তাকে দিয়ে লেখাপড়া করানো যায় না। নাইনের বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করে অনু। দিদির থাপ্পড় খায় সে। শাশুড়ি বলেন – ‘অত শাসন সহ্য হইব না কবিতা। মাইরা-ধইরা লেখাপড়া হয় না!’

অত শাসন সহ্য করতে না পেরে অনু ভাবে – পালাবে। নটীর পূজার পর ছেলেদের লাইন লেগেছিল তার পেছনে। তাদেরই একজনের সাথে সে পালিয়ে যাচ্ছিল। পারল না। দিদি আগেই জেনে গিয়েছিল।

অনুকে নিয়ে সমস্যা লেগেই থাকে। কোনোও না কোনোও ঝামেলা সে পাকাবেই। আজ যে বাড়িতে কী কাণ্ড করে এসেছে কে জানে!

বোনের মেয়েগুলোকে ঘুনসি পরিয়ে পুরনো কাপড় লেংটির মতো করে পরিয়ে ঘুনসিতে গুঁজে দেয় কবিতা। প্রথম দু’টি মেয়ে, রিমি-ঝিমি,যমজ। তিন বছর বয়স। ছোটটা মিমি, এক বছরও হয় নি। ফুলের মতো মেয়েগুলি। তবু অনুর সংসারে মন নেই। মেয়েদের কেন প্যান্ট পরায় নি, তার জবাবে বলেছে – জামার তলায় প্যান্ট আছে কি নেই – দেখার মতো মানের অবস্থা ছিল না তার।

সন্ধে গড়িয়ে যাওয়ার বেশ পরে ভাস্কর আসে। জিজ্ঞাসা করে – ‘দিদি, অনু আইছে?’

-‘হ।‘

কবিতা হাঁক পাড়ে – ‘অনু-উ-উ।‘

এসে স্বামীকে দেখে ঘাড় শক্ত করে অনু।

-‘কাউরে কিছু না কইয়া এইভাবে চইল্যা আইছ!’

-‘কারে কমু?’ অনু ঝাঁঝিয়ে ওঠে।

সত্যিই। কাকে বলে আসবে সে। যাকে বলে আসার কথা, তার সাথেই তো ঝগড়া। ভাস্কর তো তখন অফিসে।

নগন্য কারণে ঝগড়া। দুপুরের রান্না রেঁধেছে অনিতা। রাতে আবার তাকে রাঁধতে বলছেন তিনি। এমনিতেই রাঁধতে ভালো লাগে না অনুর। কতদিন বলেছে – একজন রান্নার লোক রেখে দিতে। পয়সা তো আছে ভাস্করের। কিন্তু ওই বেটি মানলে তো!

-‘অনু!’ জোরে ধমক দেয় কবিতা।

ধমক অনু গ্রাহ্য করে না। বলে – ‘রান্ধুম, মাইপ্যা মাইপ্যা তেল দিব। আবার ওই তেলে ভাজা-বড়াও রানতে হইব। কিপটা বাটি!’

বোনের বেয়াদবি সহ্য করতে না পেরে উঠে চলে যায় কবিতা।

কবিতার শাশুড়ি ভাস্করকে বলেন – ‘অরে একটু অর মতো থাকতে দাও বাবা। দেখবা, সব ঠিক হইয়া যাইব।‘ শুনে কবিতা সক্রোধে বলে – ‘পঁচিশ বছর বয়স হইছে, আর কবে ঠিক হইব? …. তিন তিনটা মাইয়ারে লইয়া আইছে – ল্যাংটা!’

যেন কিছুই হয়নি, এমনভাবে শান্তস্বরে স্বামীর দিকে তাকিয়ে অনু বলে – ‘ওদের কয়েকজোড়া জামাপ্যান্ট আইন্যা দিয়া যাইও। আমার সায়া-ব্লাউজও। শাড়ি লাগব না। দিদির শাড়ি আছে।‘

-‘কয়দিন থাকবা তুমি?’

-‘থাকি কয়দিন। ভিতরটা ঠাণ্ডা হউক।‘

অনিতার ভেতরে কী যে অশান্তি, নিজেই তা জানে না সে। সর্বক্ষণ অস্থির লাগে তার। ফলত অনেক অত্যাচার সহ্য করতে হয় ভাস্করকে। কবিতার শাশুড়ি বলেন – ‘সব ঠিক হইয়া যাইব। মেয়েটার মনটা নরম, স্নেহমমতায় ভরা।‘

কথাটা সত্য। ভাস্করের মা অসুস্থ হয়েছিলেন। মাস ছয়েক আগে। প্রায় একমাস কী সেবাটাই না করেছিল অনু। ভাস্কর ভেবেছিল – এবার থেকে মা অনুর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবেন। তা হয়নি। মায়ের মনের ক্ষুদ্রতার জন্য ক্লেশ হয় ভাস্করের। এই মাসিমার সাথে মায়ের তুলনা করে ক্লেশ বাড়ে।

বউকে ভালোবাসে ভাস্কর। মায়ের এটা পছন্দ নয়। এমন বেয়াড়া বউকে শাসনে রাখে না ছেলে, মাথায় তুলে রেখেছে, এটাই তাঁর আক্ষেপ। আর এই মাসিমা বলেন – ‘অনুর যা প্রকৃতি, শাসন সেখানে খাটে না। সে নিজেই নিজেকে শাসন করবে – ‘দেইখ্যা নিও তোমরা।‘

কয়েকদিন দিদির বাড়িতে দিব্যি হেসে-খেলে কাটায় অনিতা। তারপর একদিন নিজেই বলে –‘যাই, বাড়ি যাই।‘

-‘সুমতি হইছে তাইলে!’

দিদির মন্তব্য শুনে পিট-পিট করে তাকায় অনিতা। দিদি পারে না, শাসন না করে একটু পোষণ করতে! ওর মেয়েদের তো কত আদর করল। কত সোনা-মনা করল, সেই আদরের এক কণাও কি অনুর প্রাপ্য নয়? অভিমান হয় অনিতার। মনে মনে স্থির করে – আর আসবে না দিদির বাড়ি।

টুনু রিক্সা দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। রিমি-ঝিমিকে পাশে বসিয়ে, মিমিকে কোলে নিয়ে রিক্সায় বসে অনিতা। আসার আগে মাসিমা ছাড়া কেউ তাকে আবার আসতে বলে নি। তার কোনো দাম নেই দিদির কাছে।

ভাস্কর বলে – ‘তুমি এত বিমর্ষ ক্যান? কী হইছে তোমার?’

-‘কিচ্ছু হইছে না।‘

কী যে হয়েছে তার, নিজেই বুঝে উঠতে পারে না অনিতা। দিদি তো সব সময়ই তার প্রতি কঠোর। এই কঠোরতা তার সহ্য হয়ে গিয়েছিল। আজ কেন তবে মন এত গুমরায়! পাঁচ বছর বয়সে মা-বাবাকে হারিয়ে দিদিকেই তো একান্ত নিকটজন ভেবে এসেছে অনিতা। তার শাসন অসহ্য লাগলেও একদিনও মনে হয় নি – দিদি আপন নয়।

ক”দিন ধরে স্ত্রীকে লক্ষ করছে ভাস্কর। এ কোন নতুন রূপ অনুর? মুখরা, কাজকর্মে বিমুখ, অবাধ্য অনুকে সে চেনে। কিন্তু এখন সে এসবের কিছুই নয়। এত মিইয়ে গেছে কেন সে? কী হয়েছে তার?

-‘কী হইছে তোমার, আমারে কইতেই হইব!’

-‘জানি না’ – বলে ভ্যাক করে কেঁদে ফেলে অনিতা।

সকালে ছাদে উঠে আকাশ-আলোর সাথে কিছুক্ষণ কাটানোর অভ্যাস অনিতার। আজ আকাশ-আলো ছাড়া অন্যকিছুও দেখে সে। সামনের বাড়িটা ভেঙ্গে যে ফ্ল্যাটগুলো তৈরি হচ্ছিল, তার নির্মাণ প্রায় শেষ। একতলায় বেশ ক’টি দোকানঘর করেছে। দু’টি দোকান বেশ বড় বড়। শো-রুম হবে মনে হয়। অনিতা ভাবে – এখানে একটা দোকান দিলে বেশ হয়। বাড়ির একেবারে সামনে। খুব সুবিধে হবে।

ভাস্কর শুনে বলে – ‘কী দোকান দিবা তুমি?’

-‘শাড়ির দোকান।‘

-‘এইখানে শাড়ির দোকান চলব না অনু। শাড়িটাড়ি কিনতে সবাই হরিগঙ্গা বসাক রোডে যায়।‘

-‘আমি চালামু। …..দেখবা।‘

-‘টাকার যোগাড় হইব কেমনে? দোকান সাজাইতে তো টাকা লাগব।‘

-‘তোমার নাই টাকা?’

-‘লক্ষ লক্ষ টাকার ব্যাপার অনু। এইসব পাগলামি ছাড়।‘

পাগল তার পাগলামি ছাড়তে পারে না। অনিতা খবর নিয়ে জেনেছে, দু’টি শো-রুমের একটি বুক হয়ে গেছে। অন্যটি এখনো আছে। না না। ভাড়া হবে না। কিনতে হবে।

অসম্ভব ব্যাপার। তবু ভাবনাটা মাথাটাকে কুটকুট করে কামড়ায়। সর্বক্ষণ। সে শুনেছে, নারায়াণগঞ্জে তার বাবার শাড়ির আড়ত ছিল। টাঙ্গাইল শাড়ি, ঢাকাই শাড়ি, রাজশাহী সিল্ক, আরো নানারকম শাড়ি, সকল রকম শাড়ির হোলসেল ব্যবসা ছিল বাবার। নানা কথার ফাকফোকর দিয়ে এসব জেনেছে অনিতা।

কাকামণির কাছে গিয়ে অনিতা বলে – ‘টাকা দেন।‘

-‘কিসের টাকা?’

-‘শাড়ির দোকান দিমু। তার টাকা।‘  

শুনে ঘোর কাঁপিয়ে হাসেন কাকামণি। বলেন – ‘এইটা নূতন ভূত চাপছে তোর মাথায়।‘

অনিতা অটল। কয়েকদিন হাঁটাহাঁটি করে সে বোঝে – সিধে আঙ্গুলে ঘি উঠবে না। তখন সে বলে, ‘নারায়াণগঞ্জের সম্পত্তি বেচছেন কম কইরা হইলেও দুই-তিন কোটি টাকায়। সেই টাকার ভাগ চাইতাছি।‘

স্থির দৃষ্টিতে ভাইঝির চোখের দিকে তাকিয়ে থাকেন কাকামণি। বলেন – ‘তোরে এই কথা কে কইছে?’

আমি খবর লইয়া জানছি। . . . . বাংলাদেশোর লগে আমার যোগাযোগ আছে।‘

কাকামণি কবিতাকে ডেকে পাঠান। কবিতা সব শুনে স্তম্ভিত হয়। এত অধঃপতন হয়েছে অনুর !

কাকামণি জামাইকে ডেকে পাঠান। ভাস্কর বলে – ‘দাবিটা তো অন্যায় না কাকামণি।‘

-‘ও, . . . তাইলে তোমার বুদ্ধিতেই অনু এইসব করতাছে !’

 একথার জবাব দেয় নে ভাস্কর। সত্যি কথা ইনি বিশ্বাস করবেন না। অনুর নিজের বুদ্ধি আছে – একথা ওরা কেউ জানেন না।

অনিতা ভেবেছিল – স্বামী তাকে তিরস্কার করবে। নিজের কাকার সঙ্গে এভাবে ঝগড়াঝাঁটি করা, যে কাকা নাকি অনাথ অবস্থায় আশ্রয় দিয়েছিলেন . . . . । ভাস্কর এসব কিছুই বলে না। খুব অবাক লাগে অনিতার।

কাকার কাছে আবার গিয়ে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে অনিতা। বলে – সে সারা রাজ্যে ফাঁস করে দেবে, কিভাবে তিনি দুই নাবালিকার সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছেন।

কাকামণি এখানকার মানী লোক। তাঁর সততা সম্পর্কে কারো কোনো সন্দেহ নেই। এই রাজ্যের একজন ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তিনি। বদনাম হলে সব যাবে। তিনি স্থির করেন – টাকা দেবেন। টাকা প্রাপ্তির, এবং আর টাকা পাওনা নেই – এই মর্মে দলিলে সই করিয়ে টাকা দেন কাকামণি।

টাকার সমস্যার সমাধান হল।  শো-রুম কেনা হল। এবার কলিকাতা গিয়ে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজের কাপড়, এসব কিনে ট্র্যান্সপর্টে মাল বুক করে দেয় অনিতা। কাজে নেমেই ব্যবসার ঘাঁৎঘোঁৎ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয় অনিতা। প্রথমবার ভাস্কর তার সঙ্গে গিয়েছিল। এখন সে একাই কলিকাতা-আগরতলা যাতায়াত করে। কলিকাতার কিছু ব্যবসায়ী তাকে সৎ পরামর্শ দিয়ে সাহায্যও করে। 

কলিকাতার নামি বুটিকগুলোতে ঘুরে ঘুরে আধুনিক জামাকাপড়ের ডিজাইন দেখে অনিতা। আজকাল ছাপার ডিজাইন সে নিজেই তৈরি করে, কাঠের ব্লক করিয়ে, বড়বাজার থেকে ভয়েল কাপড়ের থান কিনে শ্রীরামপুরে গিয়ে ছাপিয়ে আনে কাপড়।

দোকানের নাম দিয়েছে ‘অনন্যা’। অনন্যার সব কিছুই ‘এক্সক্লুসিভ’ ! জামাকাপড়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কস্টিউম জুয়েলারিও রেখেছে দোকানে। একধারে দু’জন টেইলারও বসিয়েছে। তারা ব্লাউজ, সালোয়ার-কামিজ সেলাই করে।  

অনেক চেনা লোক আসে দোকানে। পুরোনো সহপাঠিনীরা আসে। একদিন বউ নিয়ে এসেছিল রজত – যার সাথে পালিয়ে যাওয়ার প্ল্যান করেছিল অনিতা। একদিন এক অল্পবয়সি মেয়ে আসে। কাপড় পছন্দ করার ফাঁকে বলে – ‘আপনে শুভশ্রীর মাসি না?’ তার কাছে অনিতা খবর পায়, শুভু ব্যাঙ্গালোরে ইঞ্জিনীয়ারিং পড়তে গেছে। অনিতার বুকের ভেতর কী যেন নড়ে ওঠে – ‘শুভুটাও কত বড় হয়ে গেছে !

দিন দিন অনন্যার শ্রীবৃদ্ধির সংবাদ  কবিতাও পায়। সে ভাবে – বোনকে নিয়ে এত দুশ্চিন্তার কোনো কারণ ছিল না তবে? জোর জবরদস্তি করে তাকে দিয়ে যদি বি.এ. পাশ করাতও, কোনোও চাকরি-বাকরি পাওয়ার আশা তো ছিল না। চাকরির মহা আকাল এখন। আর অনু পাশ করলেও টায়েটুয়ে করত। তার চাকরি হওয়ার কোনোই আশা ছিল না। এখন নাকি অনু কয়েকটি মেয়েকে নিজেই চাকরি দিয়েছে।

পাঁচ বছর হয়ে গেল – একবারও এল না অনু ! অবশ্য সেই তো বলেছিল – বোনের মুখদর্শন করতে চায় না। কাকামণির সঙ্গে এভাবে বেয়াদবি করেছে বলে খুব রাগ হয়েছিল কবিতার। এখন আর নেই রাগটা। অনু যে সম্পত্তি বিক্রির টাকার ভাগ চেয়াছিল, তা তো অযৌক্তিক ছিল না। কিন্তু অবাক লাগে – সে তো তখন খুব ছোট ছিল। জানল কি করে সম্পত্তির খবর !

ভাস্করও অনুকে জিজ্ঞাসা করেছিল – ‘তুমি কী কইরা জানলা এইসব?’

-‘আমি আন্দাজে ঢিল মারছিলাম। . . . লাইগ্যা গেল। নারায়ণঞ্জের আড়তের কথা দিদির মুখে শুনছিলাম . . . ।‘ অনিতার মনে হয়েছিল – এত সব সম্পত্তি কাকামণি ছেড়ে দিয়েছেন, এ অসম্ভব ! কাকামণি নিজে উকিল। ভিন্ন রাষ্ট্রেও সম্পত্তি বিক্রি করার অইনী প্যাচ বার করেছিলেন নির্ঘাৎ।

অনুও অজকাল দিদির কথা খুব ভাবে। দিদি বলেছিল – মুখদর্শন করবে না। এখনো সেই মনোভাবই রেখেছে দিদি? একদিন গিয়ে সে যদি দাঁড়ায়, দূর দূর করে তাড়িয়ে দেবে? কাকামণির কাছেও যেতে ইচ্ছে করে। কাকামণিও কি তাড়িয়ে দেবেন? কাকামণি দিদির মতো ভাবপ্রবণ নন। পাঁচ বছর ধরে অন্যায্য রাগ পোষণ করে রাখার মানুষ নন তিনি। তিনি এই জগতের মানুষ। অনিতার দাবি ন্যায্য ছিল, বাইরে স্বীকার না করলেও মনে মনে একথা মানতে বাধ্য তিনি।  

পুজোর আগে একদিন সকালবেলা কাকিমণির জন্য একখানা নক্সাদার লালপাড় শাড়ি নিয়ে গিয়ে উপস্থিত হয় অনিতা। কাকিমণি তাকে আদর করে বসতে বলেন।

-‘পূজায় কাপড়টা পরবা কাকিমণি।‘

-‘আবার কাপড় আনছস !’

-‘তোমাদের আশীর্বাদে দোকানটা ভালো চলছে কাকিমণি।‘

-‘হ। . . . শুনছি।‘

-‘কাকামণি কই?’

-‘ওই ঘরে। যা, দেখা কইরা আয়।‘

গিয়ে প্রণাম করে উঠে দাঁড়ায় অনিতা। চশমার আড়াল থেকে মিটিমিটি তাকান কাকামণি। বলেন – ‘এতদিন পরে কী মনে কইরা?’

-‘আপনে কি অখনো আমার উপরে রাগ কাকামণি !’

তর্জনী দিয়ে সামনের চেয়ার দেখিয়ে কাকামণি বলেন – ‘বয়।‘  অনিতা বসে।

-‘কেমন আছস? জামাই?’

-‘ভালো। সবাই ভালো।‘

-‘শুনলাম ব্যবসা ভালো চালাইতাছস?’

অনিতা চুপ করে থাকে।

কাকামণি বলেন – ‘বাপ-ঠাকুর্দার ব্যবসাবুদ্ধি তুইই পাইছস। . . . . রাগ আমার হইছল ঠিকই। কিন্তু তোর বুদ্ধি দেইখ্যা মনে মনে খুশিও লাগছিল।‘

গাল ভরে হাসে অনু।

আগের কথার খেই ধরে কাকামণি বলেন – ‘কবুটাই আহম্মক। কইল – এক পয়সাও লাগব না তার !’

যাবার পথে রান্নাঘরে উঁকি মারে অনিতা। কাকিমণি বলেন – ‘আমার চিনা একটা মাইয়া, বাবা মারা গেছেন কয়দিন আগে, তারে তোর দোকানে একটা কাজ দিতে পারবি?’

-‘পাঠাইয়া দিও। . . . যাই।‘

-যাওন নাই।‘

রাস্তায় বেরিয়ে অনিতা বোঝে – তার অন্তরে কী এক কাঁটা যেন বিঁধে আছে। যদি সে ব্যবসায় সফল না হত, কাকামণি কি এই কদর দেখাতেন আজ? তার মানে তো তার নিজের কোনো আলাদা দাম নেই কারো কাছে। শাশুড়ি পর্যন্ত তোয়াজ করেন আজকাল। কাপড়ে কাঁথা-কাজের জন্য শাশুড়ির ঘরের লাগোয়া ঘরখানিতে তিনজন মহিলাকে বসিয়েছে অনু। সে ভেবেছিল, শাশুড়ি আপত্তি করবেন। রাগারাগি করবেন। তা নয়, বললেন – ‘ভালোই তো।‘

ভারাক্রান্ত মন নিয়েই ক’দিন পর দিদির বাড়ি গেল অনু। গেট খোলার শব্দ শুনে বেরিয়ে আসে টুনু। তারপর দৌড়ে ভেতরে গিয়ে খবর দেয় – ‘অনুদি আইছে !’

মাসিমা বলেন – ‘তুই আর আইলিই না অনু !’

-‘ডরের চোটে আই নাই মাসিমা। . . . দিদি যদি মারে !’

শুনে হাসে কবিতা। বিষনন্ন হাসি।

অনেকক্ষণ বসে অনিতা। মাসিমা জিজ্ঞাসা করেন – ‘শাশুড়ি কী কয়?’

-‘আইজিকাল কিছু কয় না।‘

দিদি জিজ্ঞাসা করে মেয়েদের খবর। তিনজনেই ইশকুলে যায় শুনে ভাবে – ওরাও বড় হয়ে যাচ্ছে। কতদিন দেখে না তাদের। দিদির মনের কথা বুঝে ফেলে অনু। বলে – ‘একদিন রবিবারে তারারে লইয়া আমু।‘

-‘ভাস্কররেও আনবি।‘

আসার আগে দিদি বলে – ‘আসিস কিন্তু।‘

ঘাড় হেলিয়ে ‘হ্যাঁ’ বলে রাস্তায় নামে অনিতা। হঠাৎ তার মন বড়ো ফাঁকা লাগে। তার ইচ্ছে করে, সব আভূষণ, আভরণ খুলে ফেলে দিতে দিতে আবার সে নাচে।

বিহ্বল অনিতার চোখের দিকে তাকায় রিক্সাওলা। চেনা রিক্সাওলা। বলে – ‘নামেন।‘ ‘সম্বিত ফেরে অনিতার। বাড়ির গেটে এসে দাঁড়িয়েছে রিক্সা।

ভাগ্যিস এই সময় কেউ বাড়ি নেই। শাশুড়ি নিজের ঘরে। একান্তে বসে কছুক্ষণের জন্য ‘শ্রীমতী’ হবে অনিতা। চিরতরে হতে পারবে না, জানে সে। জীবনের সাথে জড়িয়ে নিয়েছে অনেককে – কাঁথা সেলাইয়ের তিনজন মাসী, দোকানের কাজ করে মেয়েগুলো, টেইলর দু’জন। তাদের প্রতি অবিচার হবে তা হলে।

নিঝুম হয়ে বসে থাকে অনিতা। ‘নটী শ্রীমতী’ থাকুক তার জীবনের প্রাণায়াম হয়ে।

 

 

Comments

Popular posts from this blog

স্ত্রীর পত্র

কচুয়া শাড়ি দারাসিং লাফ