বিভাসিত
-‘কেমন আছি? . . . . ভালা না।‘
-‘ ক্যান, কী হইছে?’
-‘ আমার ভিতরে আইজকাইল দুইটা মানুষ অনবরত কথা কয়। . .
. . এই যে, আপনারে এইসব কইতাছি, ভিতর থাইক্যা একজন বারণ করতাছে – ‘কইস না, এইসব কইস
না !’
কথা বলতে বলতে শিবিনেত্র হতে থাকেন সুভাষবাবু। সেই অবস্থায়ই
বলতে থাকেন – ‘ . . কণ্ঠস্বরটা কইতাছে , এইসব যে কইতাছস, লোকে তো তোরে পাগল মনে করব
! . . . অন্যজন কইতাছে ‘ . . .ক’ ক’, কইলে ভিতরটা আরাম পাইব।’
মাথার ভেতর দু’জন মানুষের দড়ি টানাটানিতে বিধ্বস্ত হয়ে
আছেন সুভাষবাবু। কুঞ্জবন এস.বি.আই-র বাইরে
চন্দন করের সাথে দেখা হলে এসব সমস্যার কথা বলেন সুভাষ দত্ত। চন্দন দেখেন - সুভাষ দত্তর কাঁচাপাকা চুলগুলো রুক্ষ-এলোমেলো,
চোখগুলো কেমন ঘোলাটে, পরনের পাঞ্জাবিটা আধময়লা, লাট।
-‘ব্যাঙ্কে কোনো কামে আইছিলেন?’
-‘পাসবইটা আপডেট করানোর আছল।‘
-‘করাইছেন?’
-‘না। . . প্রিন্টার নাকি খারাপ হইয়া রইছে।‘
-‘তাই নাকি? আমিও তো এর লাইগ্যাই আইছিলাম। . . . চলেন তাইলে,
ক্লাবে গিয়া কিছুক্ষণ বসি।‘
-‘চলেন।‘
শ্যামলীর বাজার মেনরোডের ওপর রিটায়ার্ড সরকারি কর্মচারিদের
ক্লাব। নিয়মিত সেখানে আড্ডা এবং তাস-ক্যারম খেলা হয়। অবসরপ্রাপ্ত মানুষগুলোর দিব্যি
সময় কাটে।
সুভাষবাবুকে নিয়ে ক্লাবঘরে ঢুকতেই তাসের টেবিল থেকে ঘাড়
ঘুরিয়ে সবাই তাকায়। একজন বলে – ‘আইয়েন!’ তারপর আবার খেলায় মন দেয় সকলে। চন্দন আর সুভাষ
একপাশে গিয়ে বসেন। খেলা দেখেন।
খেলা শেষ হলে ঘড়ি দেখে সকলে। একটা বাজতে চলেছে। বাড়ি যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ায় ওরা। কিছুক্ষণের মধ্যে ক্লাবঘর ফাঁকা হয়ে যায়। রবীন্দ্রবাবু কেবল থেকে যান। চন্দন রবীন্দ্রকে ইশারায় থাকতে বলেছিলেন। রবীন্দ্র বৈদ্য চেয়ার টেনে সুভাষ এবং চন্দনের কাছে বসতে বসতে বলেন ‘কন, কী কইবেন।‘
-‘আপনারে কইতে না করতাছে।‘
-‘কে না করতাছে?’
-‘আমার ভিতরের একটা মানুষ।‘
রবীন্দ্রবাবুকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতে দেখে চন্দন বলেন
– ‘ . . . না, মানে . . . ব্যাপার হইল, সুভাষবাবুর . . . ।‘
চন্দনের কথা শেষ হয়ার সুযোগ না দিয়ে সুভাষ সক্রোধে বলে
ওঠেন – ‘. . কইয়েন না কইলাম! . . . . . নোয়াখালির মানুষরে বিশ্বাস কইরেন না।‘
রবীন্দ্র বৈদ্যর চোখে কৌতুকের আলো ঝলমল করে। তিনি হেসে
বলেন – ‘ঠিক কথা। নোয়াখালির মানুষেরে বিশ্বাস নাই। অন্যের কিভাবে ক্ষতি করন যায়, সর্বক্ষণ
এই চিন্তা করে তারা!’
সুভাষ দত্ত এবার অপ্রভিত হন। বলেন – ‘তা কই নাই। আসলে খুব
মুস্কিলে পড়ছি . . . বুঝলেন!’
মস্তিষ্কের ভেতরে ভিন্নমুখী কণ্ঠস্বরের অনবরত টানাটানিতে
জেরবার হয়ে আছেন সুভাষ। সামান্য কাজ করতে গেলেই দুই দিক থেকে শুরু হয় খবরদারি। এইদিক
থেকে ‘না না’, ওইদিক থেকে ‘হ্যাঁ হ্যাঁ ‘। সুভাষ দত্তকে নিয়ে দড়ি টানাটানির খেলায় মেতে
ওঠে দুই প্রতিপক্ষ। দুই দিকের টানে সুভাষের হাড়-মাস, রগ-স্নায়ু ক্ষতবিক্ষত হয়। এইভাবেই
চলছে গত কিছুকাল যাবত। আজ যখন পাসবুক আপডেট করাতে যাচ্ছিলেন সুভাষ, তখনও ‘যাইস না’
এবং ‘যা যা’ – এই দুদিকের টান সহ্য করেই ব্যাঙ্কে
এসে পৌছেছিলেন তিনি। যখন শুনলেন, প্রিন্টার খারাপ হয়ে আছে এবং একটু আগেই খারাপ হয়েছে,
তখন সুভাষের বদ্ধমূল ধারণা হল – ‘এটা ওই ‘না না’ কণ্ঠস্বরের কীর্তি। যখন দেখেছে – তাঁকে
নিরস্ত করা গেল না, তখন কাজটা আটকে দেয়ার জন্য প্রিন্টার খারাপ করে দিয়েছে। তার মানে
কণ্ঠস্বর কেবল কণ্ঠস্বরেই সীমিত নয়, তার হাতও লম্বা।
সুভাষ যখন এসব বলছিলেন – তাঁর চোখেমুখে ভয় ঠিকরে বেরোচ্ছিল।
রবীন্দ্র বৈদ্য জিজ্ঞাসা করেন – ‘না না করইন্যা জন কি মহিলা?’
-‘হ ! . . . কথাটা তো খেয়াল করি নাই !. . . . হ, মহিলার
কণ্ঠই তো হক্কল কামে বাগড়া দেয়।‘
রবীন্দ্রবাবু কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকেন। আরো কিছুক্ষণ চন্দন করের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। চন্দন বোঝেন, রবীন্দ্র তাকিয়ে আছেন, কিন্তু দেখছেন না। অর্থাৎ তিনি ভাবছেন। চন্দন আশ্বস্ত বোধ করেন। রবীন্দ্র বৈদ্য বুদ্ধিমান মানুষ। এবং হৃদয়বানও। সুভাষের অভিভাবনায় যদি নিজেকে নিয়োজিত করেন – তাহলে তা আশার কথা।
রবীন্দ্রবাবু আরো কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকেন। সমস্ত ক্লাবঘরে
নিস্তব্ধতা জুড়ে বসে। এই অবসরে পেট জানান দেয় – দুপুরের খাওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।
চন্দন মোবাইল টিপে সময় দেখেন। বেলা আড়াইটা হয়েছে। খিদের জ্বালা সহ্য করে বসে থাকেন
চন্দন। এমন সময় সুভাষের মোবাইল বাজে। ওপাশ থেকে মহিলাকণ্ঠের ঝাঁঝ অস্পষ্ট কানে আসে।
কথা বলতে বলতে উঠে দাঁড়ান সুভাষ এবং প্রায় দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। তাঁর গমনপথের দিকে
তাকিয়ে রবীন্দ্রবাবু বলেন – ‘কিছু বুঝলেন?’
-‘বৌয়েরে অসম্ভব ডরায়। . . . বিশ টেকা দিয়া পেন্সনার্স
অ্যাসোসিয়েশনের মাসিক পত্রিকাটা কিনতে দেয় না। একবার ফোন কইরা গেছলাম পত্রিকা বেচতে,
হাতের মুঠায় টাকা লইয়া গেটের বাইরে দাঁড়াইয়া আছল, বউ যাতে না দেখে। না না করইন্যা মহিলা
কণ্ঠস্বরের মূলে হয়তো এইসব কারণ . . . ।‘
-‘কারণ যাই হোক, তাড়াতাড়ি ডাক্তার দেখানো দরকার। তাইনের
বাড়িতে কে কে আছে?’
-‘স্ত্রী আছেন কেবল। একমাত্র মাইয়া ব্যাঙ্গালোরে থাকে।‘
-‘বাড়িতে গিয়া কথা কওন দরকার।‘
-‘ ওরে বাপরে ! ওই মহিলার লগে!’
-‘কথা না কইয়া তো কোনো স্টেপ নেওন যাইব না। কাজেই যাইতেই
হইব। যাইতে হইব এমন সময়, যখন সুভাষবাবু বাড়িতে নাই।‘
-‘তাইলে তো একজন মহিলারে লগে লইতে হয়। এমন একজন, যার সঙ্গে
সুভাষবাবুর স্ত্রীর চিনাজানা আছে।‘
-‘কে আছে এমন?’
-‘ভাইব্যা দেখেন। আমিও ভাবি। আপাতত বাড়িত যাওন দরকার। বেলা
তিনিটাও উপরে হইছে। আইজ চন্দ্রিকা বৈদ্য বাড়িত ঢুকতে দিব না! ’
শুনে চন্দন কর মিটিমিটি হাসেন। তাঁর ওসব বালাই নেই। একা
মানুষ। স্বাধীন। স্ত্রীর শাসনের ভয়ে তটস্থ থাকতে হয় না। এসব কথা ভাবতে ভাবতে চন্দনও
বাড়ির পথ ধরেন। পথের ধারে লাবণ্য বিশ্বাসের বাড়ি। বাড়ির গেটের সামনে লাবণ্য দাঁড়িয়ে
আছেন। চন্দনকে আসতে দেখে মুখ ছড়িয়ে হাসেন। বলেন – ‘এই অবেলায় কই থাইক্যা?’
-‘ . . . . আপনে অবেলায় কার পথ দেখতাছেন?’
কথাটার ইঙ্গিত অগ্রাহ্য করে লাবণ্য বলেন – ‘ আর কইয়েন না।
ঝুলনরে এক জায়গায় পাঠাইছলাম। কো-ও-ও-ন সময় গেছে ! আওনের নাম নাই।‘
ঝুলন লাবণ্যর বোনঝি। মাসির সঙ্গে থাকে। মা-বাপ নেই।
চন্দন চলে যাচ্ছিলেন। লাবণ্য বলেন – ‘একটু আইবেন? . . দুইটা
কথা কওনের আছল।‘
চন্দন বলেন না, যে তাঁর এখনো স্নান-খাওয়া হয় নি। তিনি লাবণ্যর
পেছন পেছন গিয়ে ঘরে ঢোকেন। লাবণ্য বলেন – ‘দুপুরে খান নাই নিশ্চয়। . . . একটুখানি ভাত
আছে। খাইবেন?’
-‘দেন।‘
লাবণ্য ভাত বেড়ে দেন। পাতলা মুসুরির ডাল আর কাচকি মাছ ভাজা।
অমৃত !
-‘এইবার ক’ন . . . ।‘
-‘প্রমথেশবাবুর পোলার লাইগ্যা ঝুলনের বিয়ার আলাপ দিছে।‘
প্রমথেশবাবুর ছেলের বিয়ে হয়েছিল আগরতলারই একটি মেয়ের সাথে।
ডিভোর্স হয়ে গেছে। অন্য একজনের সাথে মেয়েটার অ্যাফেয়ার ছিল।
-‘ঝুলন কী কয়?’
-‘কোনো মতামত দেয় না, কয় তুমি যা ভাল বোঝ . . ।‘
-‘একটু ভাইব্যা দেখি। . . আমি, আমরাও আপনার সাহায্য পাইলে
উপকৃত হই।‘
আজকের অভিজ্ঞতা, সুভাষের আচার-আচরণ, কথাবার্তা সম্পর্কে
বিশদ বলেন চন্দন। লাবণ্য বলেন – ‘ হ। তাইনে
তো ভোর চাইরটার আগে মস্তবড় একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ লইয়া ফুল তুলতে বাইর হয়। আমার টগর
গাছের একটা ফুলও বাকি রাখে না। লোকে তাইনের নাম দিছে ‘ফুলচোরবাবু’ !’
লাবণ্য সুভাষকে বলেছিলেন – তিনি যে অন্ধকার থাকতে উঠে ফুল
তুলতে বেরোন, সাপ-বিছে-পোকা-মাকড় . . . । সুভাষ বলেছিলেন – শেষ রাতে মা-কালী নাকি ঘুম
থেকে তুলে দেন তাঁকে। বলেন – ‘উঠ, আমার ফুল তুলবি না?’
ফুল তুইল্যা কী করেন সুভাষবাবু?
-‘কবরখলার কালীমন্দিরে গিয়া দিয়া আসেন ‘
-‘অ। আমি তো এইসবের কিছু জানি না।‘
-‘এইসব জানতে হইলে ঘরে মেয়েলোক থাকতে হয়।‘
-‘হ। একজন মেয়েলোক থাকলে খুব ভালো হয়। এই জন্যই তো আপনারে
দরকার। ‘
-কী কইলেন !?’
-‘কথাটা অন্যভাবে নিয়েন না। . . . রবীন্দ্রবাবু আর আমি
যামু সুভাষবাবুর বৌয়ের লগে কথা কইতে। আপনে সঙ্গে থাকলে ভালো হয়।‘
-‘ঠিক আছে, যামু।‘
-‘যাইতে হইব এমন সময়, যখন সুভাষবাবু বাড়ি থাকেন না।‘
সেই সুযোগ পরের
দিন জুটে গেল। সন্ধ্যার সময় লাবণ্য ফোন করে জানালেন – সুভাষকে বেরিয়ে যেতে দেখেছেন
তিনি। গলির মাথা থেকে অটোরিক্সা নিয়েছেন। তার মানে দূরে কোথাও গেছেন।
খেলার মাঝখানে তাসগুলো অন্যের হাতে ধরিয়ে দিয়ে চটপট স্কুটার
নিয়ে বেরিয়ে পড়েন সুভাষ এবং চন্দন। অবিলম্বে পৌঁছে যান লাবণ্যর বাড়ির সামনে। লাবণ্য
তৈরি ছিলেন।
-‘স্কুটারের পিছনে বইতে পারবেন?’
-‘বই নাই কোনোদিন। . . . বেশি দূর তো না। আপনারা যান। আমি
হাঁইট্যা আইতাছি।‘
আগেভাগে গিয়ে সুভাষবাবুর বাড়ির সামিনে দাঁড়িয়ে থাকা অস্বস্তিকর।
আর সময়ও নেই বেশি। যেকোনো সময় সুভাষ এসে পড়লে সমস্যা হবে। রবীন্দ্রবাবু বলেন – ‘ব’ন,
অসুবিধা হইব না, আস্তে আস্তে চালামু। . . . এক কাজ করেন, আপনে বরঞ্চ চন্দনবাবুর পিছনে
ব’ন, তাইনের সিটটা নিচু আছে।‘
স্কুটার চালাতে চালাতে চন্দনের মনেই হয় না, পেছনে কেউ বসেছে,
ওজনের কোনো অনুভব নেই। লাবণ্যর শরীর কি পালক দিয়ে তৈরি ! মনে পড়ে – লাবণ্য যখন কলেজে
এসে ভর্তি হয়েছিলেন, চন্দনের তখন ফাইন্যাল ইয়ার। এমন বেঁটে, রোগা একটি মেয়ে, শরীরে
কিচ্ছু নেই, তার নাম লাবণ্য শুনে ছেলেরা হেসেছিল। একজন বলেছিল – ‘আয়রনি!’
সুভাষবাবুর বাড়ির দরজায় কড়া নাড়লে ভদ্রলোকের স্ত্রী দরজা খুলে জিজ্ঞাসু চোখে তাকান। লাবণ্য বলেন – ‘একটু কথা আছল . . . ।‘ এক মুহূর্ত সকলের দিকে চোখ ফিরিয়ে মহিলা ভুরুতে ভাঁজ ফেলে বলেন – ‘ তাইনে তো বাড়িত নাই।‘
-‘আপনার লগেই কথা।‘
ভদ্রমহিলার চোখেমুখে প্রবল অনীহা দেখেও সেটা গ্রাহ্য না
করে ঘরে ঢুকে বসেন তিনজনে।
আসার কারণ শুনে ভদ্রমহিলা ঝাঁঝিয়ে ওঠেন। বলেন – ‘আন্ধাইর
থাকতে ফুল তুলতে বাইর হয় . . . . এই সময় ভূত-পেরেত ঘুইরা বেড়ায় . . . খারাপ বাতাস লাগছে।‘
-‘তা হইলেও তো ডাক্তার দেখানো দরকার। মেয়েরে জানাইছেন?’
-জি.বি-র ডাক্তার দেখছে। ওষুদ দিছে। খাইতাছে।‘
-‘প্রেসক্রিপশনটা দেখাইবেন?’
মোবাইলে প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলে নেন রবীন্দ্রবাবু। দিল্লতে
তাঁর ভাইপোর বউ ডাক্তার। তার সাথে কথা বলে প্রেসক্রিপশনের ছবি ফরোয়ার্ড করে দেন রবীন্দ্রবাবু।
জানতে চান, সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে কি না। রাতে ফোন করে সে বলে – ওষুধগুলো সিজোফ্রেনিয়ার।
রোগীর পরিচয় জিজ্ঞেস করে সে, সিম্পটমগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে। তারপর বলে
– ‘কাকু, আমার তো মনে হয়, এই ওষুধগুলা সঠিক না। . . ভদ্রলোকেরে থেরাপিস্ট দেখানো উচিত।‘
সুভাষের মেয়ের ফোন নম্বর যোগাড় করে তার সাথে কথা বলেন রবীন্দ্রবাবু।
তার বাবার যে এরকম হচ্ছে – তা সে জানেই না। সে মিনতি করে বলে – ‘বাবারে কারুর সঙ্গে
পাঠাইতে পারবেন কাকু ! আমি আসা-যাওয়ার ভাড়া দিমু।‘
সুভাষকে নিয়ে রবীন্দ্রবাবু নিজে গেলান ব্যাঙ্গালোর। এদিকে
সুভাষবাবুর স্ত্রীর দেখাশোনার ভার পড়ে লাবণ্যর ওপর। ভদ্রমহিলা কেবল স্বামীর ওপর ছড়ি
ঘোরাতেই শিখেছেন। বাকি কোনো কাজ, সে গ্যাস বুক করানো হোক কিংবা ইলেক্ট্রিক বিল পেমেন্ট,
কিছুই পারেন না। লাবণ্য রোজ একবার গিয়ে খোঁজ নেন, কোনো দরকার আছে কি না।
চন্দ্রিকাও একা পড়ে গেছেন। তবে মহিলা খুব ডাকাবুকো, সুভাষবাবুর স্ত্রীর একেবারে উল্টো। তাঁকে নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। তবুও মাঝেমধ্যে লাবণ্যকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর খোঁজ নেন চন্দন। খুব আমুদে প্রকৃতির মহিলা। গেলে কত যে মজার মজার গল্প বলেন। একদিন বললেন -বিয়ের পর স্বামীর সাথে গেছেন বিলোনিয়া শ্বশুরবাড়িতে। নোয়াখালির ভাষা বুঝতে খুব অসুবিধে হচ্ছিল। ‘. . আঁই পাঁইত্তেন্ন . .মানে আমি পারুম না . . . . আঁই মানে আমি ! ভাবলাম, এরা বুঝি কোনওকালে ইংরেজ আছল, ইংরাজিতে আমি মানে আই, এরা কয় আঁই !’ চন্দন ভাবেন – রবীন্দ্রবাবু নিজের স্ত্রীর সম্পর্কে যেরকম ধারণা দিয়েছিলেন – দজ্জাল মহিলা, তা নেহাত অমূলক।
প্রতিদিন একটু বেশি রাতে রবীন্দ্রবাবুকে ফোন করেন চন্দন। সারাদিনের কথা আদ্যোপান্ত বলাবলি করেন দু’জনে। নিমহানস-এ চিকিৎসা হচ্ছে সুভাষের। রোজ যেতে হয় সেখানে। থেরাপিস্টের সাথে প্রায় এক ঘণ্টা করে সেশন হয় রোগীর। চিকিৎসায় কাজ হচ্ছে। সুভাষবাবুর মেয়ে-জামাই চাকরির ঝক্কি সামলে রোজ সুভাষকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে পারবে না। সত্যিই পারবে না। তাই রবীন্দ্রবাবু থেকে গেছেন। কিছুদিন একটানা চলবে চিকিৎসা। তারপর হয়তো চার-ছ’মাস অন্তর দেখাতে হবে . . . । তখন সুভাষকে নিয়ে রবীন্দ্র আগরতলা ফিরে আসবেন। আশা কয়রা যায়, পরে সুভাষবাবু একাই যেতে পারবেন ব্যাঙ্গালোর . . .।
লাবণ্য রবীন্দ্র সম্পর্কে বলেন – ‘এমন মানুষ এখনো আছে
!’
-‘ হ। আপনেও এমন মানুষের একজন।‘
-‘কী যে কন ! কোথায় রবীন্দ্রবাবু আর কোথায় আমি !’
চন্দন দেখে – লাবণ্যর চোখদুটি নিবিড়। মায়াময়। ফলত রবীন্দ্রবাবুর
স্ত্রীর কাছে যাতায়াত বাড়ে। এ যে তাঁর খোঁজখবর নেয়ার ছলে লাবণ্যর সাথে সময় কাটানোর
অছিলা – সেটা চন্দ্রিকার মতো চৌকস মহিলা ধরে ফেলেন। তিনি লক্ষ করেছেন, কথা বলতে বলতে
চোরাচোখে লাবণ্যকে বার বার দেখেন চন্দন। সেই দৃষ্টিতে অনুরাগের ঝিলিক।
দু’মাস পর, পুজোর
ঠিক আগে রবীন্দ্রবাবু ফিরে এলেন। স্ত্রীর জন্য নিয়ে এসেছেন সুন্দর একটি শাড়ি। শাড়িটি
পরে অষ্টমির অঞ্জলি দিয়ে এসে স্বামীর কাছে মোড়া টেনে বসতে বসতে চন্দ্রিকা বলেন –‘এইদিকের
সব খবর রাখ কি?’
-‘হ। চন্দনবাবুর লগে তো রোজ কথা হইত।‘
বৌয়ের মুখের দিকে তাকান রবীন্দ্র। সেখানে মধুর হাসির আভা।
কী ব্যাপার !
চন্দন আর লাবণ্যকে নিয়ে যে কথাটা মনে হয়েছে, স্বামীকে তা
বলেন চন্দ্রিকা।
লক্ষীপুজোর আগের দিন হরলালের দোকানে রবীন্দ্রবাবু গেছেন,
ফর্দ ধরে পুজোর নাড়ু-বাতাসা কিনছেন, এমন সময় লাবণ্য এসে ঢোকেন। রবীন্দ্রবাবুকে দেখে
লাবণ্য বলেন – ‘আপনেও এইখান থাইক্যা পূজার জিনিষ কিনেন?’
‘হ। . . আপনেও লক্ষীপুজা করেন ?’
-‘করি তো।‘
-‘প্রসাদ খাইতে আমু?’
-‘অবশ্যই।‘
চন্দনকে নিয়ে সন্ধ্যার খানিক পর লাবণ্যর বাড়িতে গিয়ে হাজির
হন রবীন্দ্র। প্রসাদ-টসাদ খাওয়া হয়ে গেলে হঠাৎ তিনি চন্দনের দিকে তাকিয়ে বলেন – ‘কথাটা
কইয়া লন।‘
-‘কী কথা?’
-‘কী কথা, তাও কইয়া দিতে হইব?’ বলে উঠে ঘরের বাইরে চলে
যান রবীন্দ্র। তারপর হাঁক পাড়েন – ‘ঝুলন, একটু এইদিকে আয় তো মা !’
বিমুঢ় চোখে লাবণ্যর দিকে তাকান চন্দন। লাবণ্যর দুটি চোখও
বিহ্বল। এই মুহূর্তটার জন্যই যেন পুষ্পধনু নিয়ে ঘাপটি মেরে বসে ছিলেন অনঙ্গদেব।
একটু পরই উঠানে নেমে আসেন চন্দন। পেছনে লাবণ্য। তখন উঠানের
কোনে টগরগাছে রাশি রাশি ফুল ফুটেছে। সেই ফুলে লক্ষীপূর্ণিমার জ্যোৎস্না যেন দ্বিগুণ
উজ্জ্বল হয়েছে। আজকাল সুভাষবাবু আর ফুল চুরি করেন না তো।