বাঁধনি
কালু
কুকুরটা সমানে ডেকে চলেছে। আকাশের দিকে মাথাটা তুলে ধরে
একটানা কু-উ-উ-উ শব্দে বাতাসকে চিরে দিচ্ছে, প্রবল আর্তস্বরে, আজ তিনদিন ধরে, থেকে
থেকে। যেন ঈশ্বরের কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছে। ঈশ্বর এবং আল্লা – দু’জনার দরবারই নাকি আকাশপানে।
উমাবেনের বুক ধড়ফড় করে। উমাবেন শুনেছেন – কুকুরের কান্না
খুব অলুক্ষুণে। আর কত সর্বনাশের আগাম সংবাদ দিচ্ছে কালু ! গত তিনদিন ধরে উমাবেনের সমস্ত
সত্তা আলোড়িত করে যে ভুমিকম্প হচ্ছে, হাড়ে-মজ্জায় যেভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ হচ্ছেন তিনি
– এই যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণ অসম্ভব জেনেও উমাবেন উঠে গিয়ে রুটির ডাব্বা খোলেন। এক
টুকরো বাসি বাখরি পড়ে আছে। সেটি হাতে করে ওটলা পেরিয়ে কাঠের ভারি দরজা ঠেলে রাস্তায়
নেমে আসেন উমা। কালুর কান্না লক্ষ করে পায়ে পায়ে এগিয়ে যান। তিন-রাস্তার ঠিক মাঝখানে
বসে আছে কুকুরটা। চারদিকে ছড়িয়ে আছে অজস্র ইঁট-পাটকেল, ভাঙ্গা কাচের টুকরো, লোহার রড,
সাইকেলের চেন। বাঁ-পাশে একটু দূরে জাফরভাইর বান্ধেজের দোকান থেকে অল্প অল্প ধোঁয়া উঠছে।
ফুটপাতের গা ঘেঁষে দু’তিনটে রেড়ি উল্টে পড়ে আছে। আপেল, চিকু, কলা, মুলো, টমেটো, খিরা,
আলু গড়াগড়ি খাচ্ছে। তবরেজের ভাজিয়ার রেড়ি কাত হয়ে পড়ে আছে। বেসন-মাখা লঙ্কা আর কুচো
পেঁয়াজের ওপর মাছি ভনভন করছে। তেলের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে রাস্তা। চারপাশ থেকে পোড়া গন্ধ
এবং পচা গন্ধ হাওয়ায় উঠে এসে আপনা আপনি প্যাঁচ খেতে খেতে যেন অসংখ্য দড়ি তৈরি করছে।
সেইসব দড়িকে মজবুত করছে মানুষের বাসি রক্তের দুর্গন্ধ। সেইসব দড়ি দিয়ে তৈরি হবে নরকের
পথের ঝোলাপুল। দুর্গন্ধে উমাবেনের বমি পায়। তিনদিন ধরে অভুক্ত পাকস্থলি গুলিয়ে ওঠে।
তিনদিন পর বাড়ির বাইরে পা রেখেছেন উমাবেন। ইঁট-পাথর-ভাঙ্গা
কাচ আর লোহার রডের ফাঁকে ফাঁকে খুব সাবধানে পা রাখেন তিনি। তেমাথার ঠিক মাঝখানে বসে
আছে কুকুরটা। উমাবেন ডাকেন – ‘কালু- উ-উ !’ তারপর জিভ দিয়ে চুকচুক শব্দ করে হাতের বাখরির
দিকে কুকুরটার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে প্রথমে বাখরির দিকে, তারপর উমাবেনের
আপাদমস্তকে দৃষ্টি ফিরিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে নেয় কুকুরটা। নিজের জায়গা থেকে এক চুলও নড়ে না।
অগত্যা উমাবেন আরো কাছাকাছি এসে চুকুচুক করেন। বলেন – ‘রোটি জম লে বাপ !’ বাখরির টুকরোটা
কালুর মুখের সামনে ফেলে দেন উমাবেন। আরো খানকয়েক রুটির টুকরো ইতঃস্তত পড়ে আছে। অর্থাৎ
আগেও কেউ কেউ রুটি দিয়ে কালুকে শান্ত করার নিষ্ফল চেষ্টা করেছে। মাথাটা লম্বা করে মাটিতে
রেখে কালু উমাবেনের উপস্থিতিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে। উমাবেন মুখ হাঁ করে শ্বাস ছাড়েন।
তাঁর গলা দিয়ে হাহাকারের মতো বেরিয়ে আসে – ‘হা ভগবান !’
উমাবেন বাঁ দিকে মুখ ফেরান – কারা যেন মৃদুস্বরে কথা বলছে। পুলিশ কয়েকজন। তারা উমাবেনের দিকে তাকিয়ে আছে। একজন হাত নেড়ে তাকে চলে যেতে বলে। এমন সময় কালু আবার কেঁদে ওঠে – ‘কু-উ-উ-উ।‘ উমাবেনের বুক ধড়াস ধড়াস করে। পরশু ঠিক এরকম সময়েই ফকিরভাইয়ের গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল ওরা। পুরো মহল্লায় একটি লোক ছিল না, সাহস করে এগিয়ে এসে বাধা দেয়।
ফকিরভাই বলতেন – ‘বেন, নাঙ্গা সে খুদা ভী ডরতে হ্যায়।‘
নিজের দারিদ্রের জন্য ফকিরভাই নির্ভয় ছিলেন। ফকিরভাই জানতেন না, খুদা জাকে ভয় পান,
তিনি শয়তানের লক্ষ হয়ে ওঠেন !
তেমাথা থেকে যন্ত্রচালিতের মতো সরে এসে উমাবেন ঘুপচি দোকানটার
সামনে দাঁড়ান। এক চিলতে ঘর। সামনে কোনও সাইনবোর্ড নেই। হাত দিয়ে একটু ঠেলতেই দরজা খুলে
যায়। অমনি দৌড়ে ছুটে আসে কালু। এসে দরজায় থমকে দাঁড়ায়। কী যেন ভাবে কুকুরটা। কী যেন
মনে পড়তেই আবার ফিরে যায় আগের জায়গায়। মাটিতে মাথা পেতে শুয়ে পড়ে।
উমাবেন গুটি গুটি পায়ে ঘরে ঢোকেন। মেঝেতে চাটাই পাতা রয়েছে।
তার ওপর রাখা আছে সিল্কের কাপড় একখানা। তাতে সুতোর অজস্র বাঁধুনি। যেদিকটায় বাঁধুনি
দেয়া হয় নি, সেখানে পেন্সিলের আঁকিবুকি দাগ। দেয়ালের পাশে বড় বড় অ্যালুমেনেয়মের গামলায়
কালচে জল।
উমাবেন টের পান, পেছনে কে এসে দাঁড়াল যেন। ফিরে দেখেন
– পুলিশ একজন। উমাবেনের চোখের দিকে তাকিয়ে সে জিজ্ঞাসা করে – ‘সু করোছো বেন !’ উমাবেন
অস্ফুট স্বরে বলেন – ‘কসু নথি।‘ কিছু না। পুলিশটি উমাবেনকে বাড়ি ফিরে যেতে বলে। এখানে
এভাবে আসার ‘খতরা’ সম্পর্কে সাবধান করে। পরিস্থতি খুব নাজুক। গোখোর মিয়াগুলো কখন সসস্ত্র
ঝাঁপিয়ে পড়ে বলা যায় না। বিশ্বাস নেই এদের। পরিস্থিতি খুব নাজুক।
নাজুক পরিস্থিতি
সেবা করার অর্থ যে প্রকৃতপক্ষে উৎখাত করে দেয়া, তা বোঝার
উপায় ছিল না জুবেদা খাতুনের। জুবেদার মতো আরও সকলের – যারা মীরাবেনকে ভোট দিয়েছিল।
মীরাবেন নিজেই জানত না, কাউন্সিলর হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই নিজেকে এই বিশেষ ভূমিকায়
দেখবে সে। তলে তলে মুসলমান-বিদ্বেষী হলেও পার্টি সামনা সামনি হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির
কথাই বলত। তবে মীরাবেন বুঝতে পেরেছিল – কাউন্সিলার থেকে এম.এল.এ., এম.এল.এ. থেকে মন্ত্রী
হতে হলে নিজেকে প্রতিপন্ন করতে হবে। পার্টির ভেতরে অসম্ভব কম্পিটিশন। নিজেকে অন্য সকলের
চাইতে দড় প্রমাণ করতে না পারলে টিঁকে থাকা যাবে না।
ঠিক এরকম সময়েই ঘটনাটা ঘটল। খবর কানে আসতেই ভয়ঙ্কর ক্রোধে
অন্ধ হল আবালবৃদ্ধ বনিতা হিন্দুরা। কি ! পুড়িয়ে
মেরেছে হিন্দুদের ! এত বড় সাহস ! মার শালাদের ! শেষ করে দাও সবগুলোকে। জ্বালিয়ে দাও
ঘরবাড়ি, দোকানপাট। লুটে নাও টাকা-পয়সা, সোনাদানা, টি.ভি. ওয়াশিং-মেশিন – যা কিছু মূল্যবান
– সব। এমন শিক্ষা দাও, যাতে জীবনে আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারে। জয় শ্রীরাম !
গভীর রাতে মিটিং হয়েছিল – পরের দিনই মহল্লায় মহল্লায় অ্যাকশনে
নামবে হনুমানের বীর পুত্ররা। স্বয়ংসেবকরা।তাদের অমিত-বিক্রমকে উসকে দিতে সাথে রইল শক্তিরূপিনী
মীরাবেন। মীরাবেন একা নয়, অন্যান্য মহল্লায়, শহরে শহরে কত কত হীরাবেন, নীরাবেন, কুসুমবেন
যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে দিতে আকাশ চিরে রণধ্বনি দিয়েছে – ‘জয় শ্রীরাম’ !
এই আক্রমণের প্রস্তুতি অনেক আগেই নির্ভুল করা ছিল। বাড়িগুলো সনাক্ত করা ছিল। উন্মত্ত খুনিরা সদর দরজা দিয়ে ঢুকছিল যখন, কেউ কেউ প্রাণ-হাতে খিড়কি দরজা দিয়ে পালাতে পেরেছিল, কেউ কেউ পারে নি, ধরা পড়ে মুহূর্তে লাশ হয়ে গিয়েছিল। যারা পালাতে পেরেছিল, তাদের না পেয়ে খুনিগুলো প্রচণ্ড আক্রোশে আক্রমণ করেছিল বাড়ির স্ত্রীলোকদের, বৃদ্ধদের। ধর্ষণ আর অশ্রাব্য গালাগালে বাতাসকে পুঁজের মতো ভারি আর আঠালো করে চলে গিয়েছিল তারা। তারপরে গভীর রাতে এল পুলিশ। শুরু হল কোম্বিং অপারেশন। কেবল মুসলমানদের বাড়িতে ঢুকেই তল্লাসি চালালো তারা। ধরে নিয়ে গেল বাড়ির পুরষদের, যারা দাঙ্গাবাজদের হাত এড়াতে পেরেছিল এবং রাত নামলে বাড়ি ফিরে এসেছিল। উঠতি বয়সি ছেলেদের টেনে নিয়ে যেতে যেতে দু’চার ঘা লাঠির বাড়িও মেরেছিল পুলিশ। নওজোওয়ানগুলোর রক্ত গরম হয়। তাই শুরুতেই কয়েক ঘা বসিয়ে তাদের বশে রাখছিল তারা। পরিস্থিতি খুব নাজুক। যেকোনো সময় হিংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে এই গোখোরগুলো। পুলিশের কাছে খবর আছে, বদলা নেয়ার জন্য জোর প্রস্তুত হচ্ছে এগুলো। তাই আগেভাগে সকল ক’টিকে হাজতে পুরে রাখার নির্দেশ এসেছে উপর থেকে। উপর বলতে কে বা কারা, তা অবশ্য কেউ জানে না। জানার দরকারও নেই। উপরওলার অর্ডার এলে তা মানতে হয়, অর্ডারের উচিত-অনুচিত নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না। আর এক্ষেত্রে তো অর্ডার নিয়ে কারো মনে কোনো দ্বিধা নেই। কথায় বলে - যেমন কর্ম তেমন ফল। উনষাট জন হিন্দু, তার মধ্যে আটত্রিশ জন করসেবক – তাদের সবাইকে রেলগাড়ির বন্ধ ডাব্বায় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছে। এত বড় সাহস লোন্ডিয়াগুলোর ! এখন বোঝ মাজা। মরতে তোমাদের হবেই। কোনো পুলিশের বাপ তোমাদের বাঁচাতে আসবে না। বাঁচাতে যাতে কিছুতেই না আসে, সেই অর্ডার এসেছে উপর থেকে। এস.আই. সত্যবান জাডেজার মারফত উপরওলার অর্ডার পেয়েছে তারা। দরকার হলে মিয়াগুলোর ঘরবাড়ি দেখিয়েও দিতে হবে। তার অবশ্য প্রয়োজন পড়ছে না। রামসেনারা ভালোভাবেই জানে, ঠিক কোন কোন বাড়িগুলো ওদের। পুলিশগুলো তাই কর্মহীন অবসর ভোগ করছে। একটাই কেবল উপদ্রব। এক বুড়িমতন স্ত্রীলোক রোজ এসে একটি কুকুরকে রুটি খাওয়ানোর চেষ্টা করে। কুকুরটা জেদি। কিছুতেই রুটিতে কামড় দেয় না। আর মাঝে মাঝেই ‘কু-উ-উ-উ’ করে কেঁদে চারিপাশের পরিবেশকে ভূতগ্রস্ত করে দেয়। আজ লাঠি নিয়ে তাড়া করে কুকুরটাকে ভাগিয়েছে পুলিশ।
তাড়া খেয়ে কালুর বাস্তবজ্ঞান ফিরে আসে। তাই আজ যখন উমাবেন
রুটি নিয়ে এসে কালুকে দেখতে না পেয়ে এদিক-ওদিক তাকান, তারপর সরু গলায় হাঁক পাড়েন –
‘কালু-উ-উ-উ’ – কোথা থেকে ছুটে আসে কুকুরটা। ল্যাজ নাড়তে নাড়তে উমার হাত থেকে রুটি
নিয়ে গিয়ে বসে পড়ে তিন রাস্তার মাঝখানে। কালুর এই পরিবর্তন উমাবেনের পুড়তে থাকা অন্তঃকরণে
যেন জলের ছিটা মারে। তাঁর বুকে ছাঁৎ ছাঁৎ অনুভূতি হয়।
পুলিশগুলো উমাবেনকে নিয়ে আর মাথা ঘামায় না। জানা কথা, দুপুরে
যখন সমস্ত মহল্লা নিঝুম হয়ে থাকে, স্ত্রীলোকটি আসবে, কুকুরটাকে রুটি দেবে, তারপর পায়ে
পায়ে এগিয়ে যাবে , রংরেজের ঘুপচি দোকানের ভেজানো দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে কিছুক্ষণ চাটাইর
ওপর বসবে। তারপর চলে যাবে। এই মহল্লায়ই তার বাড়ি। তার জোয়ান ছেলেটা বজরঙ্গী। বজরঙ্গীর
মায়ের থেকে কোনোও প্রকার ঝামেলার আশঙ্কা করে না তারা।
বেনপানি
মাদ্রাসার পেছনের দরজা পুরু কাঠের তৈরি। উমাবেন আস্তে আস্তে টোকা মারেন দরজায়। বিরাট দরজার বাঁ দিকে আরেকটি ছোট দরজা খুলে মুখ বাড়ায় একটি জোয়ান ছেলে। উমাবেনকে দেখে হকচকিয়ে যায় ছেলেটা। রুক্ষস্বরে জিজ্ঞাসা করে – ‘এখানে কেন এসেছ !’ পেছন থেকে এগিয়ে আসেন আরেকজন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক। উমা মিনতি করে বলেন – ‘জুবেদাবেনের সাথে দেখা করতে এসেছি . . .।‘ আবদাল্লাভাই উমাকে চেনেন। এক মুহূর্ত মাথা চুলকে কী যেন ভাবেন তিনি, তারপর যুবকটিকে রাস্তা ছেড়ে দিতে বলেন। ছেলেটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটু সরে গিয়ে রাস্তা ছাড়ে। আবদাল্লাভাই উমাকে নিয়ে দু’তলায় উঠে আসেন। স্কুলবাড়ির প্রতিটি ঘর থেকে মেয়ে-বৌরা উঁকিঝুঁকি মারে। অতবড় স্কুলবাড়ির প্রতিটি ঘরে লোকজন। তবু কেমন চুপচাপ চারদিক। বাচ্চাগুলি পর্যন্ত খেলা করছে না। কয়েকটা দুধের বাচ্চা মাঝে মাঝে কেঁদে উঠতেই তাদের থামিয়ে দিচ্ছে। কী জানি কী বলে বাচ্চাগুলোকে চুপ করাচ্ছে ওরা – গায়ে পেট্রোল কিংবা কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেবে – এই ভয় দেখাচ্ছে হয়তো ! উমাবেনের পাগুলো কেমন ঝিনঝিন করে।
জাফারভাইর ঘর দেখিয়ে দেন আবদাল্লাভাই। জুবেদা উমাকে দেখে
চিরপরিচিত আপ্যায়নের হাসিটি হাসেন না। উমাও কেমন কাঠকাঠ বোধ করেন। বড় মেয়ে মাহরুনিশার
বিয়ের দিন ছিল আজ। ঘরের এককোনে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে সে। ছোটছেলে কৌসর ঘ্যানঘ্যান করছে
– ‘আম্মা ভুখ লাইগু . . ।‘ বিরক্ত হয়ে কৌসরকে ধমক মারেন জুবেদা। উমাবেন কোনও কথা খুঁজে
পান না। জুবেদা তাঁর বহুদিনের বেনপানি। দিনে চারবার দেখা হলেও দু’জনের কথা ফুরোতো না।
আজ যে কথাই বলতে যান উমা, বলার আগেই মনে হয় – কতই না বেমানান হবে সেকথা। কেমন আছ, জিজ্ঞাসা
করা যাবে না। কোনও আশ্বাসের কথা প্রহসনের মতো মনে হবে। একবার মনে হয়, কৌসরকে সাথে করে
নিয়ে নিজের কাছে রাখেন। কিন্তু সাহস হয় না। বাড়ির লোকেরা, পাড়াপড়শিরা এটা বরদাস্ত করবে
না। মুসলমানদের বিশ্বাস নেই – এই কথা শুনে শুনে কান পচে গেল ! সাত বছরের কৌসরকেও বিশ্বাস
করতে দেবে না ওরা। বলা যায় না, উমার হাত থেকে ওকে কেড়ে নিয়ে যাবে ওরা, হয়তো পেট্রোল
ঢেলে . . . । উমার চোখগুলো ঘোলাটে দেখায়।
জুবেদার চোখদুটোও ঘোলাটে হয়ে আছে। জাফারভাই আর আশরাফকে
পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। আশরফের বয়স তো মাত্র বাইশ। ছেলে আর স্বামীর কোনও সংবাদ জানে না
জুবেদা। ভয়ে আর দুশ্চিন্তায় তার রক্ত হিম হয়ে আছে। এই অবস্থায় প্রিয়সখির কোনো অস্তিত্বই
অনুভব করছে না জুবেদা।
বার কয়েক ঘরের সামনে এসে উঁকি মেরে গেছে কয়েকটি জোয়ান ছেলে।
আবদাল্লাভাই এসে উমাকে চলে যেতে অনুরোধ করেন। উমাবেন ওঠেন। পা দুটো এমন ভারি হয়ে আছে।
জুবেদার মুখে কথা নেই। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। যেন এক জিন্দা লাশ ! উমার ইচ্ছে করে,
জুবেদা বলুক – ‘বস, বস। এই তো এলি, এখনি যাচ্ছিস ! . . . এত উতাওট করিস সব সময়। এত
তাড়া করিস, . . বস, বস তো !’ কোথায় গেল সেই বাঙময়ী জুবেদা। উমার প্রিয়সখি। বেনপানি।
উমা আর জুবেদা পরস্পরের বেনপানি। এই বন্ধুত্ব আজকের নয়।
প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় থেকে এই বন্ধুত্ব। ভিরমগামে একই স্কুলে পড়েছেন দু’জনে। বাড়িও
কাছাকাছি ছিল বলে স্কুলের বাইরেও জুবেদা আর উমা একসাথে খেলেছেন, গলাগলি করে ঘুরেছেন
মহল্লার গলিতে। জুবেদাদের অবস্থা ভালো ছিল। উমার মা যথেষ্ট কায়ক্লেশে সংসার চালাতেন।
শীতের শেষে কার্পাস তুলোর ফসল উঠলে গুটি থেকে চিমটে চিমটে তুলো আলগা করে রোজগার করতেন।
উমা আর তার বোন কৃষ্ণাও মায়ের সাথে কাজ করত। জুবেদাও এসে যোগ দিত কাজে। বীজের গুটি
থেকে তুলো ছাড়িয়ে আনতে আনতে অকারণে হেসে অস্থির হত তারা। তখন ছিল কথায় কথায় হেসে লুটিয়ে
পড়ার দিন।
শীত চলে গেছে তখন। ঘরের কোনে সার বেঁধে পিঁপড়েরা যাচ্ছিল।
দেখা গেল, রুটির ডাব্বার ঢাকনাটা ভালো করে বন্ধ করা হয় নি, পিঁপড়েরা রুটি খুঁটে খুঁটে
ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। সকালে চায়ের সাথে বাসি রুটি খেয়ে উমাদের দিন শুরু হত। রাতে রান্নাঘর
গুছিয়ে রাখে উমা। রুটির ডাব্বা ভালো করে বন্ধ করে নি বলে থাপ্পড় খেয়েছিল উমা। গালে
হাত দিয়ে ব্যথা সামলাতে সামলাতে চোখ ফেটে জল এসেছিল তার। তাই দেখে কৃষ্ণার খুব কষ্ট
হচ্ছিল। পিঁপড়েগুলোর ওপর রাগ হচ্ছিল তার। লাল লাল পিঁপড়েগুলো ! সে রেগে বলেছিল – ‘লাল
চিটি . . . মুসলমাননু ছে।‘
লাল পিঁপড়ে মুসলমানদের। কারণ তারা কামড়ায়। কালো পিঁপড়ে
হিন্দুদের। তারা অহিংস। গা বেয়ে উঠলেও কামড়ায় না কক্ষনো। এসব তত্বকথা উমা-কৃষ্ণারা
জ্ঞান হওয়া অবধি শুনে আসছে। আজ কিন্তু ব্যথা ভুলে উমা বোনকে তিরষ্কার করে – ‘এউ না
কেওয়ায় . . !’ এরকম বলে না। ছিঃ !
একটু পরই জুবেদা এসেছিল। ঘরে পা দিয়েই সে বুঝেছিল – আজ
যেন কেমন থমথমে হয়ে আছে সব। সে জিজ্ঞাসা করেছিল কী হয়েছে।
- ‘কসু
নথি।‘
- ‘বল
না কি হয়েছে। বল !’
- ‘কসু
নথি।
কৃষ্ণা বলে – ‘মা দিদিকে মেরেছে।‘
মারের কারণ শুনে জুবেদা বড় অসহায় বোধ করে। তার ঘরে রুটি
আছে। অনেক অনেক রুটি। কিন্তু সেই রুটি তো উমারা খাবে না। কঠিন সে নিয়ম। ভাঙ্গা যাবে
না। কিছুতেই না। অসহায় বিহ্বল চোখে বন্ধুর মুখের পানে চেয়ে থাকে জুবেদা। এই সস্নেহ
দৃষ্টিপাত সব দুঃখ ভুলিয়ে দেয়। অভাব-অনটনের সব কাঁটার মাঝে নিটোল ফুটে থাকে বন্ধুত্বের
পূর্ণ-কুসুম।
ক্লাস নাইনে পড়ার সময় জুবেদার বিয়ে হল। বিচ্ছেদের দুঃখে ব্যাকুল হয়ে কাঁদল দুজনে। বছর দুয়েকের মধ্যে উমারও বিয়ে হল। ওই একই শহরে। কাজিনগরে। যেখানে জুবেদার বিয়ে হয়েছে। আর কী আসশ্চর্যের কথা, জুবেদার বাড়ি আর উমার শ্বশুরবাড়ি একই মহল্লায়। কাছাকাছি বাড়ি। যেমনটি ছিল ভিরগামে। ঠিক যন গল্পকথা।
বাঁধনি কাপড়ের জন্য কাজিনিগরের খুব নাম। জুবেদার স্বামী
জাফরভাইর বাঁধনি কাপড়ের ব্যবসা। বিশাল দোকানের মালিক। উমার স্বামী হরিশভাই চালের আড়তে
চাকরি করে। কাজিনগর ভিরমগামের চাইতে অনেক বড় শহর। ব্যস্ত শহর। তাই প্রতিটি মানুষের
দৈনন্দিনতার ওপর কড়া নজর রাখার সময় সময় নেই
মানুষের। ভিরমগামের মতো প্রতিবেশিরা মুখিয়ে থাকে না তোমার প্রতিটি আচরণকে শাসন করতে।
বন্ধুত্ব তাই মুক্তি খুঁজে পায় এখানে। জুবেদার বাড়িতে বসে চা কিংবা ফালুদা আইসক্রিম
খাওয়া যায়। তবে যখন ওরা মাংস রান্না করে, গন্ধ সহ্য হয় না উমার। জুবেদা সেটা জানে।
তাই যখন উমা আসে, রান্না-বান্না স্থগিত রাখে সে।
উমার শ্বশুরবাড়িটা কেমন যেন। হরিশরা পাঁচ ভাই। পৈতৃক বাড়ি
ভাগ করে প্রত্যেকের ভাগে এক একটি ‘রুম-রসোড়া’ – একটি কামরা, সাথে রান্নাঘর। যে যার
মতো থাক, করে খাও। কেউ কারোর সাতে-পাঁচে নেই। প্রথম প্রথম উমাবেনের কেমন যেন লাগত।
এ কেমন ধারার পরিবার। সকলে বড় আলগা আলগা ! ক্রমে এতেই অভ্যস্ত হয়ে গেলেন। স্বামীর রোজগার
সাংঘাতিক না হলেও দিব্যি হেসে-খেলে চলে যেত। খাওয়া-পরার কষ্ট কী জিনিস, সেটা জানেন
উমা। তাই এইটুকু স্বাচ্ছন্দ্যই তার কাছে অনেক। আর হিতেশ জন্মাবার পর তো সুখের আর সীমা
রইল না। তার ওপর জুবেদার সাহচর্য জীবনকে মনোরম করেছিল।
কিন্তু সইল না। হিতেশের যখন এগারো বছর বয়স, তখন এক অজানা
জ্বরে এক মাসের মধ্যে স্বামীর মৃত্যু হল। আকাশ ভেঙ্গে পড়ল উমার মাথায়। আবার শুরু হল
গ্রাসাচ্ছাদনের লড়াই। হিতেশের স্কুলের পড়া চালিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম। দুর্দিনে পথ দেখাল
জুবেদা।
ফকিরভাই
কাজে ফকিরিভাইকে খুশি করা সহজ ছিল না। বাঁধনগুলো কিছুতেই
মনমতো হত না তাঁর। কিন্তু ধীরে ধীরে কাজ শিখে নিচ্ছিলেন উমা। কাপড়ে সর্ষের দানা রেখে
তার চারদিকে সুতোর শক্ত বাঁধন দেয়ার কায়দাও রপ্ত করে নিয়েছিলেন। এমন ‘বারিক কাম’ সবাই
পারে না। ফকিরভাই যখন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাঁধনগুলো পরখ করেতেন, তর্জনী আর বুড়ো আঙ্গুল
চেপে চেপে দেখতেন, বাঁধনগুলো মজবুত কি না, তখন তাঁর মুখের দিকে ব্যাকুল হয়ে তাকিয়ে
থাকতেন উমা। ফকিরভাইর মুখ যদি প্রসন্ন হয়ে উঠত, হালে পানি পেতেন উমা।
ফকিরভাই একটু রগচটা ধরনের লোক। এবং খুব কম কথা বলেন। এমন
রসকষহীন মানুষের বান্ধেজ কাপড়ের কোয়ালিটি কিন্তু আলাদা। বারিক ডিজাইনের জন্য, রঙের
আসম্ভব অন্যরকম এবং অসম্ভব সুন্দর কম্বিনেশনের জন্য, সর্বোপরি ভেষজ রঙের অনবদ্য দ্যুতি-চমকের
জন্য এবং কাপড় ছিঁড়ে যাওয়ার সময় হয়ে গেলেও একটুও ফিকে হয় না সেই রঙ – এসব কারণে তাঁর
ভাঙ্গাচোরা দোকানে ক্রেতাদের লাইন লেগে থাকত। এয়ার ফোর্স এবং নেভি অফিসারের বৌয়েরা
শাড়ি কিংবা সালোয়ার-কামিজের কাপড় কেনার জন্য এসে লাইন দিত। কেউ কেউ কোরা কাপড় নিয়ে
আসত – শিফন-চিনন-সিল্ক-সুতি। ওদের ফরমাশমতো কাপড় সাজিয়ে দিতেন ফকিরভাই। তবে কতদিনে
কাজ করে দেবেন, তার কোনো ঠিক ছিল না। তাড়া দেয়া যেত না ফকিরভাইকে। তাই ওই শৌখিন মহিলারা
ধৈর্য ধরতেন। কিছুদিন পর পর এসে খোঁজ নিয়ে যেতেন, কাপড়টা রেডি হল কি না।
ফ্যামিনা অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন ফকিরভাই। ইচ্ছে করলেই ব্যাবসা
অনেক বাড়াতে পারতেন। কিন্তু কোনো উদ্যম ছিল না। খুব তাঁর অহংকার – ‘নাঙ্গে সে খুদা
ভি ডরতে হ্যায়।‘ ঈশ্বরকে ভয় পাইয়ে দিয়ে ন্যাংটো ফকিরভাইর অহংকারের শেষ ছিল না।
স্বামীর মৃত্যুর পর উমাকে ফকিরভাইর কাছে নিয়ে গিয়েছিল জুবেদা।
ফকিরিভাই তখন কাঠিতে প্যাঁচানো সুতো দিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে ধবধবে সাদা শিফন কাপড়ে গিঁট
দিচ্ছিলেন। জুবেদা আর উমার পায়ের শব্দে মাথা তুলে একবার তাকিয়েই আবার কাজে মন দিলেন।
মেঝেতে বিছানো চাটাইর ওপর আরো কিছু কাপড় ইতঃস্তত ছড়ানো ছিল। সেগুলো একপাশে সরিয়ে জুবেদা
বসে পড়লেন। ইশারায় উমাকেও বসতে বললেন। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর কাজের থেকে মুখ
তুলে ফকিরিভাই জিজ্ঞাসা করেছিলেন – ‘শু কাম ছে?’ কী কাজ?
উমাকে কাজ শেখানোর প্রস্তাব পত্রপাঠ নাকচ করে দিয়েছিলেন
ফকির। জুবেদাও নাছোড়বান্দা। সদ্য স্বামীহারা একজন নারী, তার সাথে এমন ‘না ইনসাফি’ কেমন
করে করছেন ফকির ! শেষমেষ ফকিরিভাই হ্যাঁ বলতে বাধ্য হয়েছিলেন। উমাবেন কাজ শিখে নিয়ে
নিজের এবং ছেলের গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করবেন।
মন ঢেলে কাজ শিখেছিলেন উমা। রাত জেগে ষাট পাওয়ারের বাল্বের স্তিমিত আলোর নিচে বসে কাপড়ে বাঁধন দিতেন। বিয়ের আগে গুটি থেকে আঙ্গুল দিয়ে চিমটে চিমটে কার্পাস তুলো বার করে আনতে যে আঙ্গুলগুলো পরিশ্রমী হয়ে উঠেছিল – সেই আঙ্গুলগুলো আবার পুরোনো অভ্যাসে অনায়াসে ফিরে যেতে পেরেছিল। ভাগ্যকে দোষ দেন নি উমা। তাঁর বিবাহ সুখের হয়েছিল। স্বামী সৎ এবং পরিশ্রমী ছিলেন। কোনোও রকমের বদ অভ্যাস ছিল না। নিশ্চিন্ত জীবন পেয়েছিলেন উমা। আটা-চাল-চোখার অভাব ছিল না। গরম গরম রুটিতে ঘিয়ের প্রলেপ দিয়ে টপাটপ স্বামী আর ছেলের পাতে দিতে দিতে উমার চুলের ডগা অব্দি সুখে চিকচিক করত। সেসব সুখের দিন ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেল। তবু তো এই ‘রুম-রসোড়া’-র নিশ্চিন্তি পেছনে রেখে গেছে মানুষটা। মাথার ওপর ছাদ আছে। ট্রাঙ্কে বেশ ক’টি কাপড়ও আছে। লাল-পিলাগুলো বাদ দিয়েও আরো গোটা ছয়েক শাড়ি আছে, যেগুলো পরতে বাধা নেই বিধবা উমাবেনের। সেগুলো দিয়ে দু’তিন বছর অনায়াসে চালিয়ে দেবেন তিনি। বাকি রইল গ্রাসের ব্যবস্থা। দিনরাত কাপড়ে গিঁট দিতে দিতে আর একদানা শষ্যও ফেলাছড়া না করে দিন কাটাচ্ছিলেন উমা। এর মধ্যেই কখনো খিচড়ি কিংবা শীতে বিশেষ করে হিতেশের কথা ভেবে অন্ততঃ বার দুই-তিন উঁদিয়া বানাতেন উমা। তার থেকে খানিকটা ফকিরভাইকে দিয়ে আসতেন তিনি। মানুষটা দিনমানে বাজরার রোটলা আর আচার, এবং বেশি হলে কয়েক টুকরো মুলো কিংবা গাজর খায়। রান্না করতে করতে ফকিরভাইর জন্য মমতায় চোখগুলো ব্যথা করত উমাবেনের। যাকে দেখে প্রথমে মনে হয়েছিল রষকষহীন রুক্ষ এক মানুষ, তার ভেতরের বিন্যাসের কিছুটা আভাস দেখেছেন উমা। আশ্বিনের সকালের তাজা রোদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একদিন ফকির বলে উঠেছিলেন – ‘বেন, এই রোদের রঙ যেদিন কাপড়ে ধরতে পারব, সেদিন আমার রংরেজ জীবন পূর্ণ হবে।‘ ফকিরভাইর আসল নাম নঈমউদ্দীন রংরেজ। রংকারক ফকিরভাইর স্বপ্নগুলো এরকমভাবে ক্বচিৎ কখনো প্রকাশ পেত। সেই স্বপ্নের বীজ অলক্ষে উমাবেনের ভেতরেও যে ছড়িয়ে গিয়েছিল, বহুকাল ঘুণাক্ষরেওতা টের পান নি উমা।
আজকাল অফিসার দিদিমণিরা
উমাবেনকে এসে ধরেন – তিন মাস হয়ে গেল, শিফন শাড়িটা এখনো তৈরি হল না . . . উমাবেন যেন
একটু চেষ্টা করে দেখেন। . . . ছোটবনকে বিয়েতে উপহার দেবেন বলে করতে দিয়েছিলেন, পনর
দিন পরই বিয়ে . . . দিল্লিতে. . . । এই ধরনের উপরোধের ঠ্যালা যতটা পারেন সামলে দেন
উমা। কাপড় রঙ করা তিনিও শিখে গেছেন। তবে কাজ যদি পছন্দ না হয় ফকিরভাইর, এই ভয়টা সব
সময় থাকে। কাজ মনমতো না হলে মুখটা এমন বিরস করে থাকেন ফকির, তখন তিনদিন ধরে উমার মন
দমে থাকে। একদিন নিজেকে সামলাতে না পেরে উমা বলেছিলেন – ‘আমার কাজ যদি এতই অপছন্দ আপনার,
তাহলে না হয় অন্য কোথাও কাজ নিয়ে নিই !’
- হ্যাঁ।
এখন তুমি কাজ শিখে গেছ, এখন তো যাবেই !’
- ‘যাক,
বললেন তবে !’
- ‘কী
বললাম?’
- ‘আমি
কাজ শিখেছি, এই কথা বললেন।‘ বলতে বলতে চোখ জলে ভরে উঠেছিল উমার। যেন পরীক্ষায় ফেল করতে
করতে অভ্যস্ত ছাত্র হঠাৎ পাশ করেছে জেনে আনন্দে অধীর হয়ে উঠেছে।
উমাবেনের মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ঘর কাঁপিয়ে হাসতে শুরু করেছিলেন ফকিরভাই নঈমউদ্দীন রংরেজ। এভাবে তাঁকে হাসতে দেখে নি কেউ কোনোদিন। অপ্রস্তুত হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন উমাবেন। হাসি থামিয়ে ফকির উঠে চলে গেলেন। একটু পর গ্লাসভর্তি ফালুদা এনে উমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ফকির বলেছিলেন – ‘বেন তুমি এখনো বাচ্চা মেয়েটি আছ !’
এ যাবতকাল যা ছিল সুখস্মৃতি, আজ সেটাই উমাবেনের হৃদয়কে
চুরমার করে। কালু এই বেদনাকে বোঝে। সে এগিয়ে এসে উমাকে সান্ত্বনা দিতে চায়। আনমনে কালুর
গলা চুলকে দেন উমা। দুটি প্রাণী পরস্পরের সমব্যথী হয়ে এই অসহ দিনগুলো পেরিয়ে যেতে চায়।
বড় কঠিন এ পরীক্ষা। উমা দৃষ্টিকে মেলে দেয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু তা আটকে যায় জাফরভাইর
অগ্নিদগ্ধ দোকানে। আজ আর ধোঁয়া উঠছে না সেখান থেকে। অতবড় বিশাল দুই তলা দোকানের আধপোড়া
কাঠামো যেন কোনোও এক অতিকায় দানবের বিশাল হাঁ। উমা চোখ ফিরিয়ে নেন। বাড়িমুখো হন তিনি।
কালু তার পিছু নেয়।
পরে দেখে নেব
জাফরভাইর দোকান এই শহরের সব চাইতে বড় বান্ধেজের দোকান ছিল।
রকমারি বাঁধনি শাড়ি, সালোয়ার-কামিজের কাপড়, চুননি, পাগড়ির বিশাল স্টক ছিল জাফরভাইর।
তিনশ টাকা থেকে শুরু করে তিন হাজার, পাঁচ হাজার টাকার শাড়ি ছিল তাঁর দোকানে। সুতি-শিফন-সিল্ক
কিংবা সিন্থেটিক – যা চাও তাই পাবে জাফরভাইর কাছে। তেমাথার ওপর বিশাল দোকান ক্রেতার
ভিড়ে গমগম করত। আশেপাশের শহর-গ্রাম-গঞ্জ থেকে আসত ক্রেতারা। ঠিক যেমনটি চাই তেমনটিই
– সে শাড়িই বল কিংবা সালোয়ার-স্যুটের কাপড়, জাফরভাইর দোকানে পাবেই পাবে। সর্ষের দানা
বেঁধে শিফন শাড়ি, ছোট্ট ছোট্ট বাঁধনি নক্সা - কী তার রঙের বাহার ! লাল-সবুজ-হলুদ-নীল – সব রঙেরই আমাদা চমক। সেই সূক্ষ্ম
বাঁধনি ডিজাইনের চারপাশে জরির সুতোর ফোঁড় তুলে ঘিরে দিত কারিগররা। চড়া দামে বিক্রি
হত সেইসব শাড়ি।
এমন রমরমা ব্যবসা বিধর্মীর হাতে কতদিন ছেড়ে রাখা যায়। থাবা
বসানোর ছক অনেকদিন ধরেই কাটছিল তারা। সুযোগ আসতেই হামলে পড়ল। প্রথমে দামি জিনিষিগুলো
নিজেরা লুট করল। কমদামিগুলো দ্বিতীয়শ্রেণীর লুটেরেরা নিল। তারপর দোকানে আগুন লাগাল।
গ্যাস সিলিন্ডার আর সাদা ক্যামিক্যাল পাউডার নিয়ে তৈরি ছিল দলের মধ্যে বিশেষ ট্রেনিং
নেয়া কিছু রামভক্ত। হাত খুব পরিষ্কার তাদের। তাই জাফরভাইর দোকানই কেবল পুড়ল। পাশের
শ্রী অম্বাজি বান্ধেজ ভাণ্ডারে তার আঁচ অবধি লাগল না। এই রহস্যের সমাধান পান না উমা।
আগুন যখন প্রায় নিবে গেল, তখন বস্তির গরিব লোকগুলো এসে কাক-চিলের মতো হামলে পড়ল আধপোড়া কাপড়ের গাঁঠরির ওপর – যেন ভাগাড়ে নতুন মড়া পড়েছে। পুড়তে থাকা কাপড়ের মাঝখান থেকে তারা টেনে বার করে আনল সামান্য পুড়ে যাওয়া অথবা অক্ষত কিছু কাপড়-চোপড়। সেসব মাথায় করে নিয়ে যেতে যেতে বজরঙ্গবলীর জয়গান তারাও গেয়েছিল। তাদের অনেকেই উমাবেনের চেনা লোক। ভালো লোক বলেই তো তাদের জানতেন উমা। শয়তান তাদের মধ্যে ঘাপটি মেরে ছিল – এটা তো ঘুণাক্ষরেও জানা ছিল না। ছাদে দাঁড়িয়ে লোকগুলোর উল্লাসধ্বনি শুনতে শুনতে কান চাপা দিয়ে নিচে নেমে এসেছিলেন উমা। এসেই হিতেশের রোষের মুখোমুখি হলেন – ‘কোথায় ছিলে এতক্ষণ !’
-‘আগাসি মা।‘
-‘আগাসি মা শু কাম ছে তমারি !’
সত্যিই তো, ছাদে
কী কাজ আছে উমার ! এখনো তো আচার-পাপড়-ছুন্দার সময় আসে নি। কেন গিয়েছিলেন উমা ছাদে?
মাকে নিয়ে সমস্যায় পড়েছে হিতেশ। প্রফুলকাকা খুব কড়া গলায় তাকে বলেছেন – ‘তোর মাকে সামলা !’ হিতেশ মায়ের দিকে তাকিয়ে
বলে – ‘তুমি নাকি রোজ মাদ্রাসায় যাচ্ছ ?’
-‘যাচ্ছি তো। কৌসরের
জন্য দুধ নিয়ে যাই।‘
-‘আর যাবে না বলে
দিলাম !’
উমাবেন চুপ করে থাকেন।
নিজের সন্তানের ভেতরেও যে শয়তানের বাসা আছে, এই আবিষ্কার তাঁকে অবশ করে। হিতেশ বলে
– ‘শুনলে আমার কথা ?’
জাফরভাই আর আশরফকে
পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। মাহরুর জরায়ু থেকে অনবরত রক্তক্ষরণ হচ্ছে। জুবেদার এই দুঃসময়ে
একটু তার পাশে গিয়ে বসা যাবে না, দুধ দিয়ে আসা যাবে না কৌসরের জন্য, হিতেশ যেতে দেবে
না। উমার পেটের ছেলে হিতেশ। কিন্তু তাকে তিনি চিনতে পারছেন না। উমার রাগ-দুঃক্ষ-অভিমান
– কিছুই হয় না। শরীরটাকে কেবল বড় বেশি ভারি মনে হয়। অতি কষ্টে পাথরের মতো ভারি শরীরকে
টেনে নিয়ে চৌকির ওপর ধড়াম করে বসে পড়েন উমা।
হিতেশ কাজে বেরিয়ে
গেছে। সারাদিন বিছানায় পড়ে থাকেন উমাবেন। মনের মধ্যে নানা ভাবনা ঘুরপাক খায়। হিতেশ
যে এতবড় অমানুষ – এটা মানতে চায় না মন। এরকম না হয়ে সে তো রামানুজভাইর মতোও হতে পারত।
প্রফুলভাইর সাকরেদ না হয়ে রামানুজভাইর সাথি হতে পারত !
রামানুজভাই আর সুধাবেন সেদিন খুব দ্রুত এলাকার মুসলমানদের নিজের বাড়িতে এনে জড়ো করেছিলেন। রামানুজের ভাইও খুব দৌড়াদৌড়ি করেছিল। শেষ রাতের দিকে হল্লা থামলে পর ওরা বেরিয়ে গিয়ে পরিস্থিতি যাচাই করে ঠিক করল – রাতারাতি সবাইকে স্থানান্তরিত না করলে সকাল হলেই এরা এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে। ইতিমধ্যেই কানে কানে রটে গেছে, রামানুজ পিল্লাই লান্ডিয়াদের নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছে। এদিক-ওদিক ফোন করে দুটো কমান্ডার জীপ যোগাড় করেছিলেন রামানুজ। জীপের সামনে উড়িয়ে দিয়েছিলেন বজ্রঙ্গবলীর গেরুয়া পতাকা। ড্রাইভারের মাথায় বেঁধে দিয়েছিলেন ‘জয়-শ্রীরাম’ ছাপ মারা গৈরিক ফেটি। তারপর অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় সকলকে এনে ঢুকিয়েছিলেন আফজল মাদ্রাসায়। সেখানে তখন আরো অনেক মুসলমান পরিবার এসে আশ্রয় নিয়েছে।
হিন্দু হয়েও রামানুজ
পিল্লাই মিয়াগুলোকে বাঁচিয়েছে। এই গদ্দারিকে এক হাত দেখে নেবে বলে শাসায় বজরঙ্গবলীরা
– ‘পাছি জইস !’ পরে দেখে নেব।
রামানুজ পিল্লাই আদতে
কেরালার লোক। যদিও তাঁর জন্ম এখানে। এমনকি বাপের জন্মও এখানে। রামানুজের স্ত্রী এই
রাজ্যেরই মেয়ে – তবু তিনি নাকি বাইরের লোক। এটা এখন হয়েছে। বেশি হলে বছর তিন-চার হবে।
যবে থেকে এরা ত্রিশূল-দীক্ষা সমারোহ শুরু করল এবং রামানুজ পিল্লাইরা দীক্ষিত হতে রাজি
হলেন না, তবে থেকে হিন্দু সেনাপতিরা তাঁদের ওপর হাড়ে চটা। রামানুজের মতো লোকেরা হিন্দু
হয়েও হিন্দুর শত্রু। এইসব ঘরের শত্রুগুলোকে এক্ষুণি শিক্ষা দেয়া যাবে না। দেশ জুড়ে
বড় বেশি হল্লা শুরু হয়েছে। এখন কিছুদিন নিষ্ক্রিয় থাকতে হবে।
তবে পার্লামেন্টে
জর্জ ফার্নান্ডেজ জবরদস্ত ভাষন দিয়েছে – ‘. . . . গণধর্ষণ , গর্ভবতীর পেট চিরে ভ্রূণ
বার করে আগুনে ফেলে দেয়া, জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা নিয়ে যেরকম শোরগোল শুরু হয়েছে – যেন
এসব এই প্রথম হল ! . . . চুরাশিতে শিখদের সাথে কী হয়েছিল দিল্লিতে? কারা করেছিল সেসব
? . . . . ?’ ফার্নান্ডেজ হিন্দু নয়। তবু হিন্দুদের পক্ষ নিয়ে কেমন দুর্দান্ত ভাষণ
দিল। আর এই হিন্দুগুলোকে দেখ, গদ্দারের পয়দা সব। এদের শায়েস্তা না করলে রামরাজ্য স্থাপন
সম্ভব হবে না। জর্জ ফার্নান্ডেজ ইশাই হয়েও যদি হিন্দুদের রামরাজ্য স্থাপনের এই প্রবল
প্রয়াসকে সমর্থন করতে পারে, তবে মুসলমানগুলো কেন পারবে না নিজেদের সম্পূর্ণরূপে শ্রীরামের
চরণে সমর্পণ করতে, কেন পারবে না জোড় হাতে ‘জয় শ্রীরাম’ বলে মুসলমানধর্ম ত্যাগ করে হিন্দু
হতে ? হিন্দুস্তান মানেই হিন্দুদের ভুমি। কাজেই এই দেশের আপামর জনতাকে হিন্দু বানানোর
জন্যই না এই ধর্মযুদ্ধ।
বলে কিনা, সংবিধানমতে এই দেশ ধর্মনিরপেক্ষ। যত সব মধ্যপন্থী নপুংসকের দল ! এদের ঠাণ্ডা না করতে পারলে রামরাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন কোনোদিন পূর্ণ হবে না। স্বপ্নপূরণের পথের কাঁটা এরকম রামানুজ পিল্লাই আরো আছে। এদের শেষ করে ফেলার জন্য ত্রিশূল-দীক্ষিত রামসেনাদের হাত নিশপিশ করে। কিন্তু এই মুহূর্তে কিছু করা যাবে না। নবকিশোরভাইর কড়া হুকুম – এখন কিছুদিন চুপচাপ থাকতে হবে। দিল্লি থেকে খবরের কাগজ আর টি.ভি. রিপোর্টাররা এসে হামলে পড়েছে। খুঁজে খুঁজে বার করছে, কোথায় কোনদিন, ঠিক ক’টার সময় আগুন লাগানো হয়েছিল, তলোয়ার দিয়ে মিয়াদের মাথা কেটে আগুনে ফেলা হয়েছিল অথবা বন্দুকের গুলি ছুঁড়ে শেষ করে দেয়া হয়েছিল পলায়নপর প্রাণভীত বিধর্মীগুলোকে। এদের সাহায্য করছে এই শহরেরই কিছু লোক। এদেরও পরে দেখে নিতে হবে। সঞ্জনা ভাট, ছাঁটাচুল মেয়েলোকটা, শহরময় বনবন করে ঘুরছে ওই দিল্লিওয়ালাদের সাথে নিয়ে। বড় বেশি বাড় বেড়েছে সঞ্জনা। ওকেও শায়েস্তা করতে হবে। রামসেনারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে আক্রোশ চাপতে চাপতে বলে – ‘পাছি জই লেইস !’ আক্রোশ দমন করতে গিয়ে তাদের চক্ষু রক্তবর্ণ হয়, মুখ থেকে লালা বেরিয়ে পড়ে, কপালের শিরা সাপের মতো লকলকিয়ে ওঠে। এই ক্রোধ চেপে রেখে চারদিকে কী হচ্ছে, সেসবের পুঙ্খানুপঙ্খ খবর রাখতে বলে দিয়েছেন নবকিশোরভাই। খবর অবশ্য নিজে নিজেই আসছে। প্রতিটি থানার এস.আই. বিস্তারিত খবর দিচ্ছে রোজ।
যুদ্ধের নিয়ম
-‘ঠিকই বলছি। রেপের
জন্য আলাদা এফ.আই.আর. হবে না।‘
-‘কেন ?’
-‘মোটি ট্যাঙ্কির
ঘটনার এফ.আই.আর. অলরেডি হয়ে গেছে। রেপস আর ওনলি অ্যা স্মল পার্ট অফ ইট . . . ‘ বলতে
বলতে হামিদাদের দিকে এমনভাবে তাকায় সত্যবান জাডেজা – যেন ঘেন্নায় পেট গুলোচ্ছে তার।
-‘স্মল পার্ট ! .
. . . আপনার মেয়ে হলে . . ।‘
সঞ্জনাকে কথা শেষ
করতে না দিয়ে সত্যবান বলে ওঠে – ‘দেখুন ম্যাডাম, ভাবপ্রবণ হলে আমাদের চলে না। আপনারা
বেশি ইনসিস্ট করলে মূল এফ.আই.আর-এর সাথে অ্যানক্লোসর হিসেবে ঘটনাগুলো জুড়ে দেব। তবে
সংক্ষেপে লিখবেন। আপনাদের তো আবার একজাজারেশনের ট্যানডেনসি থাকে।‘
হামিদা, আফরোজা, রহিমা
আর মাহরুনিসার জবানবন্দি সঞ্জনারা লিখেই এনেছিল। সেগুলোর দিকে চোখ বুলিয়ে সত্যবান জাডেজা
জোরে জোরে মাথা নাড়ে – ‘না না, এসব হবে না। এসব নামধাম লেখা চলবে না। কারা রেপ করেছে,
এসব নাম লেখা চলবে না। যদি লিখে দেন, অচেনা লোকেরা রেপ করেছে, তবেই আমি এগুলো নেব।‘
-‘পরিচিত লোকেরা রেপ
করেছে, সেখানে অচেনা লোক বলবে কেন ?’
-‘না বললে আমি হেলপলেস।
. . . আপনারা এবার যেতে পারেন।‘
-‘আমরা আপনার নামে কমপ্লেন করব।‘
-করুন না।‘ বলে মাছি তাড়ানোর মতো হাত নাড়ে সত্যবান জাডেজা। সত্যবান
নির্ভয়। যারা তাকে অভয়বাণী দিয়েছে, তারা অমিতশক্তিধর। খুন-রেপ-অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলোকে
যত বেশি জনরোষের চেহারা দিয়ে রাখতে পারবে সত্যবান, আক্রমণকারিরা যত বেশি নির্দিষ্ট
মুখাবয়বহীন হবে, উন্নতির আশা ততই বেশি। এই মহিলা সংগঠনগুলোর পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, সত্যবানকেও
কঠিন প্রতিযোগিতার মোকাবেলা করতে হচ্ছে। রিপোর্টে অভিযুক্তর নাম থাকা মানেই প্রতিযোগিতায়
পিছিয়ে পড়া। সাধারণ কনস্টেবল থেকে এস.আই. হওয়া সত্যবান জানে, কোন কোন ভুল কক্ষনো করতে
নেই।
-‘নামধাম না নিলে
আপনারা অ্যাকশন নেবেন কী করে ?’
-‘অভিযুক্তকে খুঁজে
বার করার দায়িত্ব পুলিশের।‘
-‘পুলিশ কি নিজের
দায়িত্ব পালন করছে !’
-‘আবার ওই একই কথা।
. . . . আপনারা . . . ‘ – কথা শেষ করার আগেই
টেবিলের টেলিফোনটি এমন ঝনঝনিয়ে বেজে ওঠে, রিসিভার উঠিয়ে সত্যবান এমন ‘ইয়েস স্যর, ইয়েস
স্যর’ করতে থাকে, তারপর বার্তালাপ শেষ হলেই উঠে দাঁড়ায়, কোথাও যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়,
সঞ্জনা ভাট আর্তনাদ করে ওঠে – ‘রিপোর্টগুলো . . ।‘
-‘জমা দিয়ে যান। তবে
নামধাম বাদ দিয়ে নূতন করে লিখে দিন।‘ একজন খাকি ইউনিফর্মধারির দিকে তাকিয়ে সত্যবান
বলে যায় রিপোর্টগুলো রিসিভ করতে।
-‘রিসিভ কপি দেবেন
তো ?’
-‘ঠিক আছে।‘ পুলিশটির
দিকে তাকিয়ে জাডেজা ইশারায় বলে দেয় রিসিভকপি দিয়ে দিতে।
প্রকৃতপক্ষে সত্যবানের অকুস্থল ত্যাগ করার দরকারই ছিল না। আসলে সে পালাল। টেলিফোনটা খুব জুতসই সময়ে এসেছিল। মামুলি লোকের মামুলি টেলিফোন। পুলিশের খোঁচড় একটা। খবর দিচ্ছিল। খোঁচড়কে ‘ইয়েস স্যর’ করল সত্যবান। তাতে নাটকটা নিখুঁত হল। সঞ্জনা ভাটকে টুপি পরিয়ে স্থানত্যাগ কয়রা গেল। এইসব এন.জি.ও. মহিলাগুলো মহা হারামি। এদের যথাসাধ্য এড়িয়ে চলা দরকার। সঞ্জনা তো ইতিমধ্যেই জমিয়ে নিয়েছে। রোজই খবরের কাগজে দাঙ্গার নানা ঘটনা নিয়ে জমিয়ে লিখছে। মোটেও নাকি দাঙ্গা নয় এটা। স্টেট স্পনসরড পোগ্রম। এই মহিলাগুলোই নষ্টের গোড়া হয়ে উঠেছে। আরে, তোর কী ! তুই হিন্দু। ব্রাহ্মণ। মুসলমানরা দেশের যে পরিমাণ সম্পত্তি ভোগ করছে, তা কেড়ে নিতে পারলে তোর পরিবারও সেই সম্পত্তির ভাগ পাবে। এই মোটা হিসেবটাও বুঝিস না। লেখাপড়া শিখেও বুদ্ধির যথাযথ বিকাশ হল না। হিন্দুশাস্ত্রে ঠিকই বলে – মেয়েলোকের বেশি লেখাপড়া করতে নেই।
দুঃখের বিষয়, হিন্দু
শাস্ত্রকে মান দেয় না এরা। পশ্চিমি সভ্যতার অন্ধ অনুকরণ করে দেশের সর্বনাশ ডেকে আনছে।
এই সর্বনাশকে রোধ করার জন্য স্বয়ংসেবকরা জান দিয়ে লড়ছে। শাখাগুলোতে নিয়মিত ক্লাস হয়।
হিন্দু সভ্যতা যে অন্য সব সভ্যতার চাইতে উৎকৃষ্ট, এই সত্যটা সত্যবান জাডেজা এইসব ক্লাসে
গিয়েই না জেনেছে। সরাসরি শাখার ক্লাসে অবশ্য সত্যবানরা যায় না। তাদের জন্য গোপন ব্যবস্থা
আছে। পুলিশে চাকরি করে সর্বসমক্ষে এইসব ক্লাসে যাওয়া সম্ভব নয়। এমন সোরগোল তুলবে –
পুলিশকে কোনো বিশেষ ধর্মের প্রতি অনুগত হওয়া নাকি বারণ ! উদ্ভট সব কথা। মানুষ মাত্রেই
তার ধর্ম থাকবে। ধর্ম থাকলে ধর্মের জন্য জান দিতেও সে প্রস্তুত থাকবে। একেই বলে ধর্মযুদ্ধ।
সত্যবান জাডেজা এই ধর্মযুদ্ধটাই লড়ছে।
যুদ্ধের নিয়ম সাধারণ
নিয়মের সাথে মেলে না। শত্রুপক্ষের স্ত্রীলোকদের ধর্ষণও যুদ্ধের অংশ। পুরুষাঙ্গও লড়াইয়ের
অস্ত্র। সেই অস্ত্রের যথাযথ প্রয়োগ অন্যায় নয়। জগন্নাথ যোশী কী সুন্দরভাবে এসব বুঝিয়ে দেয়। কুরুক্ষেত্রের
রণাঙ্গনে দাঁড়িয়ে শ্রীকৃষ্ণ যেভাবে অর্জুনকে বুঝিয়েছিলেন ধর্মযুদ্ধের কর্তব্য, জগন্নাথভাইও
সেরকমই জলের মতো সহজ করে বুঝিয়ে দিয়েছেন – মিয়াগুলোকে বধ করা কিংবা তাদের মেয়েমানুষদের
ধর্ষণ করার মধ্যে অন্যায় নেই কোনো। সঞ্জনা ভাটরা এসব নিয়ে বড় ঝামেলা করছে। সঞ্জনা ভাটকে
একবার জগন্নাথভাইর ক্লাসে বসাতে পারলে আর এসে ঝামেলা করবে না।
বাড়িতে বসে ঘণ্টা
দুয়েক বিশ্রাম করে থানায় ফোন করে সত্যবান। সঞ্জনারা বিদেয় হয়েছে জেনে আবার থানায় ফিরে
আসে সে। এসেই নবকিশোরভাইকে ল্যান্ডলাইনে ফোন করে সত্যবান জাডেজা। মোবাইলে ফোন না করার
জন্য কড়া হুকুম দিয়েছেন নবকিশোর ছাবারিয়া।
উমাবেন
আফজল মাদ্রাসা থেকে
সবাইকে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। বেশির ভাগই গেছে পানিগেট ক্যাম্পে। জুবেদারা কোন ক্যাম্পে
গেছে, খোঁজ নিতে রামানুজ পিল্লাইর কাছে আসেন উমাবেন। রামানুজ বলেন – খোঁজ নিয়ে জানাবেন।
উমাবেনকে ঘরে এনে বসান রামানুজ। সুধাবেন এসে জিজ্ঞাসা করেন – উমা চা খাবেন কি না।
-‘না না, তোমাকে কষ্ট
করতে হবে না।‘
-‘কষ্ট কিসের।. .
. আমরাও খাব।‘
এই আদর উমাবেনের চোখে জলসঞ্চার করে। আজকাল খুব একা পড়ে গেছেন উমা। হিতেশ পর্যন্ত ভালোভাবে কথা বলে না। বাড়ির অন্য সকলে – ভাসুর, দেওর, জায়েরা, তাদের ছেলেপিলেরা তো পারলে উমাবেনকে বাড়িছাড়া করে দেয়। হিতেশও ওদের দলে। চালের আড়তে সে সারাদিন ধরে শিখেছে – মুসলমানরা দেশের শত্রু। তাদের মেরেধরে পাকিস্তান পাঠানো একান্ত জরুরি। এসব কথার প্রতিবাদ করেছিলেন উমা। মনে পড়িয়ে দিতে চেয়াছিলেন জুবেদামাসির উপকারের কথা। হিতেশ কথাগুলোয় আমল দিল না। তাউ-কাকাদের সাথে আজকাল হিতেশের খুব আঠা হয়েছে। ওদের সাথে সেও সুর চড়িয়ে বলে – মুসলমানরা গদ্দার।
-‘কী গদ্দারি করেছে
শুনি ?’
-‘ওরা পাকিস্তানের
দালাল।‘
-কী করে জানলি ?’
-‘বোঝাই যায়।‘
-‘জুবেদামাসি না থাকলে
কোথায় ভেসে যেতাম !’
-‘ওইসব এক্কা-দোক্কা
ভালোমানুষ দিয়ে সর্বাঙ্গীন বিচার হয় না।‘
-‘ফকিরভাইকে যারা
খুন করেছে, তুই তাদের দলে !’ বলতে বলতে উমাবেনের গলা ধরে আসে। হিতেশ তাতে বিরক্ত হয়।
ফকিরভাইর প্রতি মায়ের আনুগত্য – যা অনেক সময়ই প্রেমের মতো মনে হয়েছে, বিরাগ তৈরি করেছে
হিতেশের মনে। উঁদিয়া রাঁধলে হিতেশের হাত দিয়ে একবাটি ফকিরভাইকে পাঠিয়ে দেয়া কিংবা স্কুল
থেকে ফিরে ঘর তালাবন্ধ দেখে দোকান থেকে চাবি আনতে গিয়ে মাকে হেসে হেসে ফকিরভাইর সাথে
গল্প করতে দেখে – ঠিক যেমন বাবার সাথে করত – হিতেশের মনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বহুদিন
আগে থেকেই মায়ের ওপর অখুশি হিতেশ। তাই ফকিরভাইর জন্য কান্নায় মায়ের গলা বুঁজে আসা হিতেশকে
কেবল বিরক্তই করে। একটুও মমতার উদ্রেক হয় না তার।
একুশ বছর বয়সেই হিতেশ শিখেছে – মায়া-মমতা দিয়ে জীবন চলে না। অর্থ উপার্জন করে জীবনে দাঁড়াতে হলে, মানুষের মতো বাঁচতে হলে মনকে কঠিন করা চাই। চালের আড়তে যে মজুরগুলো শ’কিলো চালের বস্তা পিঠে তুলে ন্যুব্জ হয়ে চলে, তাদের কড়া শাশনে না রাখলে কাজ-কারবার থেমে যাবে। এই কঠোর শাশনের ভার হিতেশের ওপর দিয়েছেন ধর্মেশভাই। হিতেশের বাবাও ধর্মেশভাইর আড়তে চাকরি করতেন। পুরোনো কর্মচারির ছেলেকে এক কথায় কাজে বহাল করেছিলেন ধর্মেশ। দুই বছরেই নিজের কর্মদক্ষতা প্রতিপন্ন করেছে হিতেশ। কথায় বলে – বাঁশের চাইতে কঞ্চি দড়। বাপ ছিল ঢিলাঢালা মানুষ। ছেলে হয়েছে অসম্ভব শক্তপোক্ত। ধরে আনতে বললে বেঁধে আনে। হিতেশের ওপর দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। ছেলেটা পরিশ্রমী এবং সৎ। তাকে ক্যাশে বসিয়ে দেখেছেন ধরমেশভাই। এক টাকারও এদিক-ওদিক করে না।
বাপ নেই। ধর্মেশকে
বাপের মতো ভক্তি করে হিতেশ। তাঁর থেকে ব্যবসার ঘাঁৎ-ঘোঁৎ শিখে নেয়। একদিন সেও আড়তদার
হবে – এই স্বপ্ন দেখে হিতেশ। সেটা তো আর এমনি এমনি হবার নয়। প্রচুর টাকার দরকার। অন্য
আরেকটি রাস্তার সন্ধান দিয়েছেন নবকিশোরভাই। তিনি এক অসামান্য তীক্ষ্ণধী পুরুষ। স্বয়ংসেবক।
সমস্ত আড়ত-অঞ্চলের নিয়ন্ত্রক। তিনিই কানে কানে বলে দিয়েছেন – মুসলমান আড়তদারদের হটিয়ে
সেসবের মালিক হতে হলে লড়াইতে ভাগ নিতে হবে। হিতেশ ভাগ নিচ্ছে। এই কাজে উমাবেন বাগড়া
দিচ্ছেন। মা হয়ে এমন শত্রুতা করছেন, কিছুতেই তাকে বোঝানো যাচ্ছে না, আখেরে ফায়দা হবে
ছেলের। এইসব নিয়ে মায়ে-ছেলেতে রোজ তর্ক হচ্ছে।
তর্কে কেউ জেতে না।
কিন্তু বেশি হারেন উমাবেন। তিনি বোঝেন, তাঁর পায়ের তলা থেকে মাটি সরছে রোজ। সমস্ত পরিবার
তাঁকে কোনঠাসা করেছে। তাঁর সমালোচনায় সরব সকলে। তিনি জুবেদার কাছে রোজ ছুটে গেছন, ফকির
রংরেজের ‘কুতরো মাটে’ রুটি নিয়ে বারবার ছুটে যান আর খুব সম্প্রতি সঞ্জনা ভাটের দলবলের
সাথে ঘরে বসে কম সে কম দু’ঘণ্টা ধরে কী সব ফুসুর ফুসুর হয়েছে, রাম জানে ! হিতেশকে প্রফুলকাকা
নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে সাবধান করেছে – ‘তারো বা নো সমভাল যে . . . !’ তোর মাকে সামলা।
প্রফুলকাকার ঘরে নবকিশোরভাই বসে ছিলেন। তিনি এমনভাবে হিতেশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, ওই
চোখের ভাষা পড়তে এক মুহূর্ত লাগে নি হিতেশের – কর, না হলে মর !
হিতেশ তাই মাকে শাসায়
– ‘বাড়াবাড়ি না থামালে, রোজ রোজ জুবেদামাসিকে দুধের প্যাকেট দেয়া বন্ধ না করলে, কালুকে
বাখরি খাওয়ানোর অছিলায় বেরিয়ে গিয়ে অড়স-পড়স থেকে যেসব মুসলমানরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে,
তাদের খোঁজ-তালাস নেয়া না থামালে ভালো হবে না বললাম!’
-‘দুধ কাকে দেব। জুবেদামাসিরা
তো চলে গেছে।‘
-‘আপদ গেছে!’
-‘তোর বাবার মৃত্যুর
পর তোর তাউ-কাকারা একদিনও খোঁজ নেয় নি, আমাদের খাওয়া জুটেছে কি না। তখন জুবেদামাসিই
. . . ।
-‘আবার ওই এক ঘ্যানঘ্যানানি!’ মায়ের মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই হিতেশ থামিয়ে দেয়। কাকাজেঠাদের বিরুদ্ধে কোনো কথা শুনতে রাজি নয় সে। ছোটকাকা প্রফুলভাইর খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে হিতেশ। প্রফুল নবকিশোর ছাবারিয়ার ডানহাত। কাকার সাহায্যে যদি জাভেদ রাজকোটিয়ার দোকানটা হাতিয়ে নিতে পারে, এই আশায় মরিয়া হয়ে সে পারলে মাকে এখান থেকে সরিয়ে নিজের রাস্তা সাফ করে । সেই চেষ্টা সে করেছিল। ভিরমগামে উমাবেনের কাকার ছেলেরা থাকে। তাদের কাছে কিছুদিন গিয়ে থাকার প্রস্তাব এক কথায় উড়িয়ে দিয়েছেন উমাবেন। কোনোদিন যারা খোঁজ নেয় না, তাদের কাছে যেচে যেতে পারবেন না তিনি।
-‘তারা তোমার আপন
খুড়তুতো দাদারা।‘
-‘আপন-পরের হিসেব
কে করবে!’
-‘তোমার সব হিসাবই
উল্টোপাল্টা।‘
-‘হবে!’
-‘গান্ডি!’ পাগল।
পাগল তকমা নিয়ে উমাবেন
এসে উপস্থিত হন রামানুজ পিল্লাইর কাছে। বড় একা লাগছে। তাঁর আপন-পরের হিসেবে মহা গণ্ডগোল
পাকিয়ে উঠেছে। সত্যিই কি তিনি তবে সৃষ্টিছাড়া এক মানুষ। ‘গান্ডি বাই রি!’ অসার, অসাড়
এক অনুভবে আচ্ছন্ন হয়ে জুবেদার জন্য বড় আকুল বোধ করেন উমা। জীবনের সব অবসন্ন সময়ে জুবেদাই
যে তাঁর একমাত্র অবলম্বন। রামানুজভাই হয়তো জানেন, কোথায়, কোন ক্যাম্পে আছে জুবেদা।
রামানুজ পিল্লাইর
বন্ধুর মতো ব্যবহার, সুধাবেনের চায়ের অনুরোধ উমার চোখের কোনকে সিক্ত করে। ঠোঁটগুলো
শাসন মানে না। তাঁর মুখাবয়বে পেশির কম্পন দেখে রামানুজ জিজ্ঞাসা করেন – ‘কী হয়েছে বেন?’
-‘কসু নথি।‘
উমাবেন ‘কিছু নয়’
বললেও রামানুজের বুঝতে অসুবিধে হয় না, এই নারীর মন অত্যন্ত পীড়িত হয়ে আছে। এরকম পীড়াকাতর
তো আজ অনেকেই। তবে রামভক্তদের প্রবল চিৎকারে যখন বাতাস চিরে খানখান হচ্ছে, তখন এই দীর্ঘশ্বাসের
মৃদুধ্বনি কেউ শুনতে পাচ্ছে না। রামানুজ নিজে এমন জর্জরিত হয়ে আছেন, নানাভাবে আক্রান্ত
হচ্ছেন, সেসবের মোকাবেলা করতে গিয়ে সময়ের এমন অভাব হচ্ছে যে উমাবেনকে কথা দেয়া সত্ত্বেও
জুবেদা খাতুনের খবর এনে দিতে দু’দিন লেগে যায়।
সত্যবান জাডেজা এই
দু’দিনের মধ্যে তিনবার রামানুজকে থানায় ডেকে পাঠিয়েছে। একবার তার বাড়িতে এসে তল্লাসি
করে গেছে, সে খবর পেয়েছে – রামানুজের ঘরে বিস্তর পরিমাণে বোমা-বারুদ-পিস্তল জমা হচ্ছে।
হজফেরত মিয়াগুলো সেসব এনে রামানুজের হেফাজতে রাখছে, রামানুজের কাছে এগুলো নিরাপদ থাকবে
– এই ভরসায়। ‘সন্দেশ’-এ বিস্তারিত রিপোর্ট বেরিয়েছে – মোল্লাগুলো যে কোনোদিন প্রবল
বিক্রমে হিন্দুদের ওপর সসস্ত্র আক্রমণ করবে। রামানুজ বলেছিলেন – ‘আমিও তো হিন্দু।‘
শুনে খলখল হেসেছিল সত্যবান জাডেজা।
পানিগেট ক্যাম্পে জুবেদাদের খোঁজ নিতে গিয়ে রামানুজ জানলেন – আফরোজা-মাহরুনিসাদের ওপর নবকিশোর ছাবারিয়া খুব চাপ দিচ্ছে রামানুজ পিল্লাইর বিরুদ্ধে রেপের অভিযোগ করতে। সত্যবান জাডেজা এসেছিল লিখিত অভিযোগে দস্তখত করাতে। অভিযোগ সে লিখে নিয়ে এসেছিল। আফরোজা বলেছিল – ‘তিনি তো আমাদের বাঁচালেন। জান বিপন্ন করে আমাদের রক্ষা করলেন . . . ।‘ সত্যবান বোঝানোর চেষ্টা করেছিল – ‘ লোকটা গুজরাতি পর্যন্ত নয়, . . . তোমাদের মুসলমান তো নয়ই। তার জন্য এত দরদ!’
দরদ
দরদ বড় বালাই। যত
নসষ্টের গোড়া। দরদ ক্লীব করে। এই ক্লীবত্ব নিয়ে যুদ্ধ জয় করা যায় না। যারা দরদ ঝেড়ে
ফেলে দিতে পারছে, তারাই টিঁকে থাকবে। দরদে ডুবে থাকলে বাঁচা যাবে না। মহারণ উপস্থিত,
স্বজন হননে প্রস্তুত হও অর্জুন !
হিতেশ মাকে শাসায়।
বলে, বাড়ি থেকে বার করে দেবে। জুবেদা বলে – ‘তুই আর আসিস না এখানে। এখানে এসে এভাবে
নিজেকে বিপন্ন করিস না।‘
-‘তাড়িয়ে দিচ্ছিস!’
-‘বাস্তব অবস্থাকে
বোঝার চেষ্টা কর উমা। . . . . . তুই আর আমি এখন আলাদা . . ।‘
-‘খুলে বল। . . .
আমি এলে তোর অসুবিধে হচ্ছে কোনো?’
জুবেদা চুপ করে থাকেন।
উমাকে কী করে বোঝাবেন – এখন পরস্পরের সান্নিধ্য এড়িয়ে চলাই দু’পক্ষের মঙ্গল। উমার এখানে
আসা মানেই জুবেদাদের আলাদাভাবে চিহ্নিত হওয়া। আলাদাভাবে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা তৈরি করা। বিশেষ
করে হিতেশ-প্রফুলভাই যেভাবে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে . . .। আটত্রিশ দিন হাজতবাসের পর জাফরভাই
আর আশরফকে ছেড়েছে ওরা। স্বামী-পুত্রকে অক্ষত দেখে, মানে শরীরে মারের দাগ নেই দেখে জীবনকে
আবার গড়ে তোলার দুর্বার বাসনা হয়েছে জুবেদার। এখন উমার এখানে ছুটে ছুটে আসা মানেই হিতেশের
আক্রোশে পড়া। একথা প্রিয়সখিকে কীভাবে বোঝাবেন, ভেবে স্থির করতে পারেন না জুবেদা। উমা
জুবেদার এই সঙ্কটকে বুঝতে পারেন না। জুবেদা তাঁকে হিন্দু ভেবে পরিত্যাগ করছে, এই ভেবে
উমার প্রবল অভিমান হয়। হায় রে, শৈশব থেকে যে
ভালোবাসা প্রতি পলে বেড়েছে, যে বন্ধন অটুট বলে জানতেন উমা, তা এক ঝটকায় ছিঁড়ে দিতে
চাইছে জুবেদা। কী করে তা আটকাবেন উমা! সমস্ত হিন্দুদের হয়ে পায়ে ধরে মাপ চাইবেন? কিন্তু
জুবেদা তো জানে, রামানুজভাইর মতো হিন্দুরাও আছে। তবে? উমার অন্তর গুমরে ওঠে, যেন বলতে
চায় – ‘জুবেদা, তুই আমাকে ত্যাগ করিস না . . . . .বেনপানি আমার!’
কিন্তু কিছুই বলা হয় না। উমা উঠে দাঁড়ান। ধীর পায়ে বেরিয়ে আসেন। উমা জানেন না, সেদিন রান্নাবান্না করেন নি জুবেদা। মাহরুনিসা রুটি বানিয়ে মাকে খেতে ডেকেছিল। জুবেদা খান নি। আর সারারাত আকুল হয়ে কেঁদেছিলেন। এ ঘোর সঙ্কটকালে এ যাবত একফোঁটা অশ্রুপাত হয় নি তাঁর। উমার মমতা, তার বেদনার্ত দৃষ্টি যেন ঝর্ণাধারা হয়ে নেমে এসে জুবেদার ভেতরের আগুনকে নির্বাপিত করতে চাইছে। নেমে এস অশ্রুধারা। আরো বেগে নেমে এসে বুকের ভেতরের জ্বলন্ত চিতাকে নিবিয়ে দাও।
সেদিন উমাও রান্না
করেন নি। হাত-পাগুলো অসাড় হয়ে ছিল। হিতেশ বাড়ি ফিরে মাকে শুয়ে থাকতে দেখে রান্নাঘরে
গিয়ে রুটির ডাব্বা খোলে। রুটি নেই। ডাল-তরকারিও নেই। সে প্রফুলকাকার ঘরে গিয়ে খেয়ে
নেয়। মা যে খেল না, এ নিয়ে মাথা ঘামায় না হিতেশ। তার অত সময় নেই। এক রাত না খেলে মানুষ
মরে যায় না।
হিতেশের এখন অনেক
কাজ। সারাদিন চাকরির ধকল। তারপর নবকিশোরভাইর সাথে যেতে হয় এখানে ওখানে। সামনের সপ্তাহে
স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম আসছে এখানে। যেসব লোকজন এস.আই .টি-র সামনে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে
সাক্ষ্য দিতে যাবে বলে শোনা যাচ্ছে, তাদের নিরস্ত করার জন্য খুব ছোটাছুটি করছেন নবকিশোর।
অতুলভাই দাভে নাকি প্রফুলকাকার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। আজ গিয়ে অতুলভাইর সাথে কথা বলেছেন
নবকিশোর ছাবারিয়া। কথা হয়েছে ভেতরের ঘরে। হিতেশ বাইরের ঘরে বসে ছিল। কী কথা হল কে জানে।
অতুল দাভে তো হেসে হেসে নবকিশোর আর হিতেশকে সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন।
ক’দিন ধরেই হিতেশ
সুযোগ খুঁজছিল। আজ নবকিশোরকে একলা পেয়ে সে কথাটা পেড়েছে। জাভেদ রাজকোটিয়ার দোকানটার
জন্য নবকিশোরকে বলেছে হিতেশ। নবকিশোর খালি বলেছেন – ‘দেখব।‘ হিতেশ বুঝতে পারছে – জবরদস্ত
কিছু করে না দেখালে আশা নেই কোনো। লাইনে আরো অনেক লোক আছে। তাদের টাকাও আছে। হিতেশ
তো ফুটোকড়ির মালিক!
হিতেশ যখন হন্যে হয়ে
ভাবছে, কীভাবে নবকিশোরভাইর আস্থাভাজন হবে, তখনই কাণ্ডটি হল। এস. আই . টি-র সামনে দাঁড়িয়ে
উমাবেন হরিশভাই দেসাই সাক্ষ্য দিলেন – তিনি ছাদ থেকে স্পষ্ট দেখেছেন, প্রফুলভাই অনন্তভাই
দেসাই দশ-বারোজন নানা বয়সি লোকেদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তাদের উৎসাহিত করছিলেন . .
. . হ্যাঁ, তারাই জাফরভাইর দোকানে আগুন লাগিয়েছে। তারা যখন চিৎকার করতে করতে তিন-রাস্তার
দিকে এগিয়ে আসছিল, তখন প্রচণ্ড ভয়ে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নেমে এসে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে
দিয়েছিলেন উমা। বলতে বলতে থরথর করে কাঁপছিলেন উমা। তাঁকে ধরে বসিয়ে দিয়েছিলেন সুধাবেন।
কমিউনিটি হলে তখন
তিল ধারণের জায়গা নেই। হিতেশ মায়ের আচরণে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। প্রাথমিক ধাক্কা কেটে
গেলে পর রাগে দুঃক্ষে চোখে অন্ধকার দেখেছিল হিতেশ। হিতেশভাই হরিশভাই দেসাই।
সেদিন ফিরে গিয়ে ঘরে ঢুকতে পারেন নি উমা। ঘর তালাবন্ধ করে রেখেছিল ওরা। হিতেশ কাছেপিঠে কোথাও ছিল না। উমাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন সুধাবেন পিল্লাই। কয়েকদিন সেখানে থেকে ফকিরভাইর দোকানে এসে দাঁড়িয়েছিলেন উমা। তাঁকে দেখে ছুটে এসেছিল কালু।
ফকিরভাইর প্রাইমাসে
কেরোসিন ভরা ছিল। ডাব্বাতে বাজরার আটা ছিল। প্রাইমাস জ্বেলে তাওয়া বসিয়ে দিলিন উমা।
হাত দিয়ে থাপড়ে থাপড়ে তিনটি রুটি বানালেন। একটা রুটি কালুর জন্য। একটু দূরেই সব্জির
রেড়ি নিয়ে যে লোকটি দাঁড়িয়ে ছিল, তাকে উমা চেনেন। একটা পেঁয়াজ চেয়ে আনলেন তার থেকে।
কালুকে নিয়ে দোকানে সংসার পাতলেন উমা। এয়ারফোর্স কলোনিতে গিয়ে পূর্বপরিচিত অফিসার-গিন্নিদের
থেকে কাজের অর্ডার নিয়ে এলেন উমা। কিছু অ্যাডভানস টাকাও চেয়ে আনলেন। সকাল থেকে কাপড়ে
সুতোর বাঁধন দেন। একবার উঠে গিয়ে রুটি বানান। হাত দিয়ে থাপড়ে থাপড়ে রুটি গড়তে গড়তে
কালুর সাথে কথা বলেন উমা – ‘শু কালু , ভুখ লাইগু? . . . শু কালু , ফকিরভাইনো ইয়াদ আওয়ে
ছে ?’ কালু কানদুটো একেবারে ফেলে দিয়ে কুঁই কুঁই করে উমার কথার জবাব দেয়।
সুধাবেন স্বামীকে
বলেন – ‘উমা কাজ করছেন, এটাই ভালো। ঘরে বসে বিড়বিড় করতেন, এটা তো ভালো লক্ষণ নয়।‘
-‘কিন্তু ভয় হয়, ছেলে-দেওর,
পরিবারের অন্য সবাই যদি আক্রমণ করে !’
-‘এই মুহূর্তে এসব
কিছু করবে না। ওরা এখন ব্যাকফুটে আছে।‘
-‘রাতে যেন ওখানে
না থাকেন।‘
-‘না না, রাতে এখানে
এসে ঘুমোতে হবে। বলে দিয়েছি . . ।‘
-‘সত্যবান জাডেজা
আমার বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। দু’একজন অভিযোগকারি যোগাড়ও করে
ফেলেছে।‘
-‘আফরোজারা . . .
?’
-‘না না। ওদের ভাঙ্গাতে
পারে নি।‘
-‘ভগবান আছেন ‘
-‘ভগবান! . . . ভয়াবহ
সেই দু’তিন দিন কোথায় ছিলেন তোমার ভগবান ?’
সুধা চুপ করে থাকেন।
তারপর বলেন – ‘ . . . . অন্তত কিছু মানুষ এখনো আছে।‘
রানানুজ নীরবে ভাত মাখেন। হ্যাঁ। কিছু মানুষ এখনো আছে। হামিদা-আফরোজারা আছে। . . . . উমাবেন আছেন। . . . সুধাও তো আছে।
এক বছর পার হয়ে গেল।
সত্যবান এখনো রামানুজের বিরুদ্ধে তাগড়া কোনো কমপ্লেন ম্যানুফেকচার করতে পারে নি। আবার মার্চ এসে গেছে। গত মার্চেই তো এস. আই . টি প্রথমবার বসেছিল টাউনহলে।
মার্চ মাস।মার্চ মানে
ফাল্গুন। ফাল্গুন মানে পলাশফুলের আগুনরঙে গাছের ডাল ঢাকা পড়ে যাওয়া। কমেটিবাগে পর পর
চার-পাঁচটি পলাশফুলের গাছ আছে। বড়সড় একটি সাঁজি নিয়ে রোজ ফুল কুড়োতে যান উমা। ফুল শুকিয়ে
সারা বছরের জন্য রাখতে হবে। পলাশের রস থেকে যে রঙ বেরোয়, সেই কমলা রঙয়ের ঔজ্জ্বল্যই
আলাদা। ফকিরভাই রংরেজ উমাকে শিখিয়েছিলেন, কীভাবে পলাশফুল থেকে, ডালিমের খোসা থেকে,
পারিজাতের বোঁটা থেকে, নীল অপরাজিতা থেকে, বাবুল-অর্জুন-তেঁতুল গাছের ছাল থেকে, অর্জুনের
গোটা থেকে, তেঁতুলের বীজ থেকে রঙ বার করে নিতে হয়। ঈপ্সিত সবুজ রঙের জন্য কতটা নীল
আর কতটা হলুদ মেশাতে হয়।
বাঁধনি কাপড়ে কেবল
ভেষজ রঙের ব্যবহার করেন উমা। তাঁর খদ্দেররাও তাই চায়। সংখ্যায় খুব বেশি নয় তারা। তবে
উমার চলে যায়। জীবনকে নানা উপকরণে সাজাবার স্পৃহা নেই তাঁর। অজান্তে তিনিও দিন দিন
ফকির হচ্ছেন। তাই হা-হুতাশও নেই কোনো। ফকিরভাইর কোনো পরিজন ছিল কি না, কোনোদিন জানা
হয় নি। তাঁর যে অন্য কোনোও অতীত থাকতে পারে, সেকথা মনেও আসে নি। তাই জিজ্ঞাসা কয়রা
হয় নি কোনোদিন। জিজ্ঞাসা করার মতো অন্তরঙ্গতা তও গড়ে উঠেছিল।
পলাশফুল কুড়িয়ে সাঁজি ভরে নিয়ে অদূরে ঢিবির ওপর গিয়ে
বসেন উমা। ফাল্গুনের রোদে কেমন মিঠা গন্ধ। কেমন এক নেশা লাগে। কেমন যেন মনে হয়, এই
রোদ আড়াল করে রেখেছে অন্য আরেকটি জগতকে। সেই জগতের লোকেরা হেসে-খেলে, গল্পে-গানে বুঁদ
হয়ে আছে। তাদের ঘরগুলোতে তাজা হাওয়া আর সোনালি রোদ দাপিয়ে বেড়ায়। উমাবেন গুনগুন করেন
– ‘ . . . এক এওয়া ঘোর মলে . . .।‘ এই বিশ্বে যদি এরকম একটি গৃহ মেলে, যেখানে কোনো
কারণ ছাড়াই যেতে পারি . . . ‘যা কসা কারণ বিনা পন যাই সকুঁ . . .।‘
গানের পংক্তিতে গৃহহীন
জীবনের সমস্ত বিলাপ বেঁধে রেখে দেন উমা। খানিক দূরেই পানিগেট ক্যাম্পে এখনো আছে জুবেদা।
জুবেদাও গৃহহীন। এখনো বাড়ি ফিরতে পারে নি তারা কেউ। নিজেও গৃহ থেকে বিতাড়িত হয়েছেন
বলে জটিল এক মুক্তির অনুভবে নির্ভার বোধ করেন উমা। ভালোই হয়েছে, হিতেশ তাকে বার করে
দিয়েছে।
সাঁজি নিয়ে উঠে দাঁড়ান উমা। ইচ্ছে হয়, জুবেদার ওখানে একবার হয়ে যান। পরক্ষণেই বাতিল করে দেন এই ইচ্ছে। এর চাইতে বরঞ্চ পলাশফুলগুলো থেকে রঙ বার করে মাহরুনিসার বিয়ের চুন্নিতে আশ্বিনের ভোরের রোদকে বন্দি করার আয়োজন করা বেশি জরুরি। উমা শুনেছেন, মাহরুর মাঙ্গেদার ফিরে এসেছে। এই মাসেই তাদের বিয়ে। আর বেলাও যে অনেক হল। কালু অপেক্ষা করে বসে থাকবে। অবোলা প্রাণী। বড় মায়া। বড় দরদ।
Comments
Post a Comment