শাপমোচন

 

                                                                      

 

 

-       ‘জীবন নিয়ে কী করবি ভাবতে ভাবতে যা যা করা উচিত নয় সেইসব করে চলেছিস।‘

-       ‘মেজমামা তুমিও!’

মেজমামা অংশুমানের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কেমন চিমসাড়ে চেহারা হয়েছে। মুখাবয়ব অপরিচ্ছন্ন। চোখের নিচে কালির আভাস।

অংশুমান আরো কিছু বলবে, এই আশায় অপেক্ষা করেন মেজমামা। চুপচাপ কাটে বেশ কিছুক্ষণ । হঠাৎ উঠে দাঁড়ায় অংশুমান। কিছু না বলে চলে যায়।

হাতের বইটা নামিয়ে, চশমা খুলে টেবিলের ওপর রেখে কনুইয়ে ভর দেয়া ডানহাতের তর্জনী দিয়ে থুতনি চুলকোন মেজমামা। মাথাটা খালি লাগছে। অংশুকে নিয়ে সবাই চিন্তিত। মিতু এসেছিল দুদিন আগে। কান্নাকাটি করে গেছে আর বলেছেমেজদা, তুমিই ওর মাথাটা খেয়েছ !

শিশু বয়সেই বোঝা গিয়েছিল – অংশু ব্রিলিয়ান্ট। ও নাকি একদিনে, একটানে এ থেকে জেড অক্ষর চিনে গিয়েছিল। ইলিশ মাছের কাঁটায় ওয়াই-র সাদৃশ্য দেখিয়েছিল। মিতুমাসি-অলকমেসো চমৎকৃত হয়েছিলেন। ঠিক করেছিলেন – ছেলেকে আই.এ.এস. বানাবেন। বানানোর কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল সেই থেকে। কে .জি. ক্লাস থেকে অংশুর গ্রেড আউটস্ট্যান্ডিং। নামকরা স্কুলের গ্রেডিং-এ ভুল হতে পারে না। অন্য মা-বাবারা তাদের ছেলেদের অংশুর মতো হতে বলতেন। সেই অংশু আজ কলেজ ড্রপ-আউট। বাউণ্ডলের মতো ঘুরে বেড়ায়। মদ খায়। বাড়ি থেকে টাকা চুরি করে।

অংশু গল্পের বই পড়তে ভালোবাসে। যেখানে যে বই পায়, নিয়ে পড়তে শুরু করে – বুঝুক, না বুঝুক। সেবার বাপের বাড়ি এসেছিল মিতু। অংশু দাদুর আইনের বই নিয়ে এমন মন দিয়ে পড়ছিল – দেখে সবাই খুব হেসেছিল।

ক্লাস ফাইব অব্দি সব ভালো চলছিল। অংশু যথারীতি ফার্স্ট হচ্ছিল। তারপর কী যে হল! দিনদিন লেখাপড়ায় অবনতি হতে থাকল। মিতুমাসি-অলকমেসো লেগে থাকল ছেলের পেছনে। ছেলেকে দু’দণ্ড জানালায় দাঁড়াতে দেখলেই মিতুমাসি হাঁক পাড়ে। বলে – ‘পড় পড়।‘ অংশুর পাগল পাগল লাগে।

একদিন স্কুল ফেরত বাড়ি না এসে পার্কে বসে গল্পের বই পড়ে অংশু। মিতুমাসি ছেলের ফেরার অপেক্ষা করতে করতে উৎকণ্ঠা যখন চরম সীমায় পৌঁছোয়, তখন অলকমেসোকে অফিসে ফোন করে। সে এক হুলুস্থুলু ব্যাপার। সেদিন আংশুকে কষে চড় মেরেছিল মিতুমাসি। এতদিন যা বকাঝকার মধ্যে সীমিত ছিল, আজ তার সাথে চড় সংযোজিত হল। কিন্তু অংশুর গল্পের বই পড়া বন্ধ হল না। অংশু না পড়ার জন্য বকুনি খায়। পড়ার জন্যও বকুনি খায়। এর মধ্যে হেঁয়ালি নেই কোনো। অংশু পড়ার বই পড়ে না। না পড়ার বই সর্বক্ষণ পড়ে।

একমাত্র মেজমামা অংশুকে প্রশ্রয় দেন। মেজমামার প্রচুর বই। অংশু ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী’ একটানে পড়ে লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠে আবার বইখানি পড়ে আবার কেঁদেছিল।  চোদ্দ বছরের অংশু মেজমামাকে ‘সান্তিয়াগো’ ভাবতে শুরু করেছিল। সেই মেজমামাও বলেন – ‘যা করার নয় করে চলেছিস …..।‘ অংশু আরো নিরাশ্রয় হয়।

গল্পের বইয়ের কোনোও এক বিশেষ চরিত্রের সাথে নিজের কিংবা চারপাশের কারোর মিল খুঁজে পায় অংশু। তার কল্পনা ডানা মেলে দেয়। একাচোরা স্বভাবের অংশু কল্পনার জগতে ঘুরে বেড়ায়। বড় হতে হতে আরো একা হয় সে। তখন মেজমামার কাছেও আর যেতে ইচ্ছে করে না। আজকাল তিনিও আর সকলের মতো উপদেশ দেন – বলেন, ‘এবার ভালো করে প্রিপারেশন নিয়ে পরীক্ষা দে।‘

গতবছর পরীক্ষা দেয় নি অংশু। বাড়ি থেকে রোজ বেরোত পরীক্ষা দিতে। তারপর কোথায় বসে সময় কাটিয়ে আসত কে জানে। রেজাল্ট বেরোলে জানা গেল – প্রতিটি পেপারে সে আ্যাবসেন্ট। মি্তুমাসির জীবনে আশা বলে কিছু আর রইল না। একমাত্র ছেলে তার। কত স্বপ্ন ছিল তাকে নিয়ে।

‘একমাত্র ছেলে’ – এই ব্যাপারটাও অংশুকে তাড়না করেছে জ্ঞান হওয়া অব্দি। এ এক অসম্ভব বোঝা। এ বোঝা বইবার জন্য একজন সাথি, একটা অন্তত ভাই কিংবা বোন নেই তার। মা-বাবার স্বাপ্নের সমস্ত দাবি সে মেটাতে চেষ্টা করেছিল ছোটবেলা থেকে, সেই দাবির বোঝা তাকে পিষে মারছিল। লেখাপড়া তখন অসহ্য হয়ে উঠল এবং ক্লাস এইটে হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় অংশু ফেল করল। ফেল করেছে বলে মা-বাবার কষ্টের কথা ভেবে খাতায় নম্বর বাড়িয়ে তখনকার মতো অবস্থা সামাল দিলেও পেরেন্টস-টিচার্স মিটিং-এ প্রগ্রেস রিপোর্ট দেখে আসল নম্বর জেনে ধুন্দুমার করল মিতুমাসি। শুধু তো ফেল করে নি অংশু, কারচুপি, ফোর্জারি ……। লজ্জায় কোথায় মুখ লুকোবে, ভেবে পায় না মিতুমাসি।

এরপর থেকে অংশু যখন পড়ে – মিতুমাসি কাছে বসে থাকে। সংসারের কাজকর্ম পড়ে থাকে। ছেলেকে নরমে গরমে রেখে স্কুলের গণ্ডী পার করায়।

রামযস কলেজে ইংলিশ অনার্সে ভর্তি হয় অংশু। বারো ক্লাসের পরীক্ষায় ইংরাজিতে ভালো নম্বর ছিল না। কপালগুণে বোর্ডের দেয়া নম্বরের ওপর ভরসা না করে কলেজ অ্যাডমিশন টেস্ট নিত। গল্পের বই পড়ে পড়ে ইংরাজি ভালো লিখতে শিখেছিল অংশু। টেস্টে প্রিয় বইয়ের রিভিউ লিখতে বলেছিল। অংশু ‘দ্য অল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী’-র রিভিউ লিখেছিল। …..লোনলি সান্তিয়াগো, বন্ডিং উইথ ম্যানোলিন ….এক হতদরিদ্র মানুষও কী বড় মাপের হতে পারে! সাকসেস আর ফেলিওরের মাপকাঠি নিয়ে সবকিছুর বিচার করে যে জগত ….। সব শেষে অংশু লিখেছিল – ইচ্ছে করে সান্তিয়াগোকে জীবনে পেতে, ইচ্ছে করে ম্যানোলিন হতে …।

অংশু কলেজে ভর্তি হল। মিতুমাসি আবার আশায় বুক বাঁধল। ইংরাজির গ্র্যাজুয়েটও আই.এ.এস. পরীক্ষায় বসতে পারে। ছেলেকে আই.এ.এস.-এর স্বপ্ন একবার ধরিয়ে দিতে পারলে আর পেছন ফিরে তাকাতে হবে না। মিতুমাসি মেজমামার শরণাপন্ন হয়।

-       ‘তোমার কথা ও শোনে মেজদা।‘

-       ‘শোনে, কারণ ওরকম উদ্ভট স্বপ্ন ধরানোর চেষ্টা করি না। ও কী হতে চায় জিগ্যেস করেছিস?’

মেজদার কথাগুলো রুক্ষ লাগে। কেঁদে কেটে চলে যায় মিতু। মেজমামা ভাবেন – ছোটবেলায় খুব মিষ্টি স্বাভাবের, দেখতেও মিষ্টি,…… মিতু সবার আদরের ছিল। মিষ্টি না হয়ে শক্তপোক্ত মেয়ে হলে ভালো হত। তাকে শক্তপোক্ত করে তোলার কোনোও চেষ্টা হয়নি।  মেজমামা নিজেও তো সেই চেষ্টা করেন নি। ভালো দেখে তার বিয়ে দেয়া হয়েছিল। মিতু বিয়ে-ম্যাটেরিয়াল ছিল। তাই পাত্র জুটেছিল অনায়াসে। জীবনের বাঁধা ছকের বাইরে ভাবতে পারবে কী করে ও!

ক’দিন পর অংশু এলে মেজমামা জিগ্যেস করেন – ‘হোয়াট ইজ ইওর এম ইন লাইফ?’

-       ‘আই অ্যাম এমলেস। …..কিছুই হতে চাই না মেজমামা!’

-       ‘এটা কোনোও কাজের কথা হল?’

-       ‘তাহলে বলি, আমি সান্তিয়াগোর মতো তিমি শিকারি হতে চাই।‘

-       ‘তিমি শিকার ব্যান হয়েছে জানিস?’

-       ‘তাহলে?’

-       ‘হাই সী ফিশিং তো বন্ধ হয় নি।‘

-       ‘হুম ! …..কীরকম লাগছে কলেজ?‘

-       ‘মন্দ না।‘

এক বছরেই কলেজ ‘বেশ ভালো লাগছে’ থেকে ‘মন্দ না’-তে এসে দাঁড়িয়েছে। ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষা পাশ করেছিল অংশু। সেকেন্ড ইয়ার থেকে আবার গণ্ডগোল। ছেলে বড় হয়ে গেছে, এখন আর পাশে বসে থাকলেই পড়া গিলে নেবে – তা হয় না। মিতুমাসি তবু চাপ দেয়। স্বপ্নের চাপ।

অংশু মদ খাওয়া শুরু করে। কিছুদিন বাবা-মা ধরতে পারেন না – ছেলে মদ খাচ্ছে। কারণ অংশু নিজের ঘরে চুপচাপ বসে থাকে। কথা বলে না কারো সাথে। রাতের খাবার একসাথে খেতে আসে না। বলে – আরো কিছুক্ষণ লেখাপড়া করবে, পরীক্ষা আসছে, খেলেই ঘুম পায়। তাই পরে খাবে। ছেলের সুমতি দেখে খুশি হয়ে মিতুমাসি তার খাবার টেবিলের ওপর ঢেকে রেখে ঘুমোতে যায়।

একদিন মদের মাত্রা বেশি হলে অংশু বোঝে – আজ বাড়ি ফেরা যাবে না। সে পথে পথে হাঁটে। এক সময় এসে দাঁড়ায় কলেজের সামনে। রাত তখন এগারোটা। কলেজের লাল বিল্ডিং-এর দিকে তাকিয়ে অংশু বলে – ‘ইউ লুক লাভলি অ্যাট নাইট!’

আরো খানিক হেঁটে ছোট্ট একটি গোল পার্কের ঘাসে গিয়ে বসে পড়ে অংশু। একটি  কুকুর কোথা থেকে এসে কুঁই কুঁই করে লেজ নাড়ে। অংশু ওর দিকে তাকিয়ে বলে – ‘হাই !’ কুকুরটা তখন লেজটা সীলিং ফ্যানের মতো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জোরে জোরে নাড়ে। কুকুরের সারা গায়ে ঘা।  অংশু বলে – ‘হাই দোস্ত ! …..কাম টুমরো, আই’ল গিভ ইউ সাম মেডিসিন।‘

কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল অংশু। সকালে সূর্যের তেরছা আলো চোখে এসে পড়ে। অংশু চোখ খোলে। কুকুরটা অদূরে কুণ্ডলি পাকিয়ে ঘুমিয়ে আছে। ফুটপাতের দোকান থেকে চা কিনে এনে খায় অংশু। কুকুরটা কাছে বসে তাকিয়ে থাকে। কী মনে করে এক টুকরো টোস্ট কিনে এনে তাকে খেতে দেয় সে। দিন বাড়লে কেমিস্টের থেকে বরিক পাউডার এনে কুকুরের ঘায়ে ছিটিয়ে দেয়। কুকুরটা কুঁই কুঁই করে আপত্তি করে, কিন্তু পালায় না।

সেই থেকে যেদিন বেশি মদ খায় অংশু, বাড়ি যায় না। পার্কে এসে বসে। কুকুরটা কোথা থেকে দৌড়ে আসে। অংশু জড়ানো স্বরে বলে – ‘হাই !’ একদিন বলে – ‘তোমার নাম দিলাম দরবেশ।‘ কুকুরটা কান ফেলে তেরছা চোখে তাকায়। অংশু আর দরবেশের বন্ধুত্ব দিন দিন পাকা হয়। অংশু দরবেশকে বলে – ‘বুঝলে দরবেশ, নৌকোটা এবার সারাতেই হবে ……ওই ছেঁড়া পালে অজস্র তালি ……তালিগুলোও ছিঁড়ে যাচ্ছে ……দেখি, কিছু একটা করব …।‘

কুকুরের সাথে বিড়বিড় গল্প করে। ছেলেটা পাগল হয়ে গেছে। মিতুমাসিকে কেউ এসে বলে যায়। অলকমেসো এসবের চাপ নিতে পারছিলেন না। অফিসেও চলছিল নানারকম কুটকচালি পলিটিক্স। এক রাতে স্ট্রোক হয়ে তিনি মারা গেলেন। অংশু এই মৃত্যুর জন্য দায়ী, ভাবল অনেকে। যদিও সরাসরি এই কথা বলে নি কেউ, অংশুর স্পর্শকাতর মন তা বুঝল। তাতে আরো বিধ্বস্ত হল সে।

একদিন মিতুমাসি এসে হাউ হাউ কাঁদে – ‘মেজদা, অংশু বাড়ি ফেরে নি আজ চারদিন।‘

ভোরবেলা গোল পার্কটাতে এসে মেজমামা দেখেন, অংশু অঘোরে ঘুমোচ্ছে। একটা কুকুর তাকে আগলে রেখেছে, কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছে না। কিছুক্ষণ অদূরে একটা বেঞ্চে বসে থাকেন মেজমামা, অংশুর জাগার অপেক্ষা করেন। অনেকক্ষণ বসে থাকেন। অংশু ওঠে না। অসুখ করে নি তো ছেলেটার! এমন বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে। কী করবেন, ভাবতে ভাবতে কমলা নগর থানায় গিয়ে সাহায্য চান তিনি। মেজমামা নামী মানুষ, থানার ও.সি. তাঁকে বিলক্ষণ চেনে। সে এক কনস্টেবলকে সঙ্গে দেয়। পুলিশ এসে লাঠি দেখিয়ে কুকুর ভাগায়। অংশুর গায়ে হাত দিতেই ছ্যাঁকা লাগে। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে গা !

সেন্ট স্টিফেনস হাসপাতালের ওয়ার্ডের বাইরে কুকুরটা বসে থাকে। লাঠির বাড়ি খেয়েও আবার এসে উঁকি মারে। অংশু এহটু সুস্থ হয়েছে। সে দরজার দিকে তাকাতেই দরবেশের সাথে চোখাচোখি হয় আর তিড়িং করে অংশুর বিছানার ওপর এসে অংশুর গালে-ঘাড়ে নাক ঘষে দরবেশ। নার্স থতমত খায়। অংশু হাত তুলে তাকে আশ্বস্ত করে, তারপর দরবেশকে কী বলে কে জানে, সে ওয়ার্ড ছেড়ে চলে যায়। অন্যান্য রোগীরা চমৎকৃত হয়ে দেখে এই দৃশ্য। সেদিনের পর থেকে রোজ দরবেশ অংশুর বেডের তলায় এসে বসে থাকে অনেকটা সময়।

চারপাশে আরোও কুকুরপ্রেমীরা রয়েছেন। বড় ডাক্তার রাউন্ডে এলে কুকুরকে লুকিয়ে ফেলেন তারা। কোনের দিকের খাটের তলাটা অন্ধকার। সেখানে সুড়ুৎ করে ঢুকে পড়ে দরবেশ। ডাক্তারও জেনে গেছেন ব্যাপারটা। তিনি দেখেও দেখেন না। দরবেশের গায়ের ঘা শুকিয়ে সেখানে সুন্দর লোম গজিয়েছে। কাজেই ওয়ার্ডে তার উপস্থিতি আপত্তিকর লাগে না কারোও। বরঞ্চ রোগশয্যার পাশে এমন এক সুন্দর স্বভাবের কুকুর, একেবারে ঘেউ ঘেউ করে না – ভালো লাগে সকলের। ডাকলেই কাছে আসে, ঘাড় চুলকে দিলে কান ফেলে দেয় – বড় ভালো লাগে।

অংশু সেরে উঠলে তাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য মিতুমাসি আসে। দরবেশকে বাদ দিয়ে ছেলেকে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। মিতুমাসি বাধ্য হয়ে কুকুরকেও গাড়িতে তোলে। অংশুর বিছানার তলায় শুয়ে থাকে দরবেশ। অংশু বাথরুমে গেলে দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, বেরোতে দেরি হলে কুঁই কুঁই করে, দরজা আঁচড়ায়। মিতুমাসি দেখে – কুকুরটা  খুব সভ্য-ভদ্র। দিনে দু’বার সদর দরজা খুলে দিতে হয়।  কিছুক্ষণের জন্য সে বেরিয়ে গিয়ে প্রাকৃতিক কাজগুলো সেরে আসে। দরকার হলে মাঝে আরেকবার এসে কুঁই কুঁই করে। মিতুমাসি বোঝে, ও বেরোতে চাইছে। রাস্তার কুকুর বলেই বুঝি খুব শক্তপোক্ত। শৌখিন কুকুরের পেছনে যে হাজারটা কাজ থাকে – এর বেলা এসব কিছু নেই। সারাদিনে একবার পেট ভরে খাবার দিলেই হল। তবে এটাকে ভ্যাকসিনেট করাতে হবে – ভাবে মিতুমাসি।

অংশু চুপচাপ বিছানায় শুয়ে ভাবে সর্বক্ষণ – বাবা নেই, মা-ও আগের মতো সর্বক্ষণ তাকে পথে আনার চেষ্টা করেন না। কেমন চুপচাপ হয়ে গেছেন মা। নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয় তার। জীবন দুঃসহ লাগে। আজকাল বই পড়তেও বেশিক্ষণ ভালো লাগে না। কয়েক পাতা পড়েই উৎসাহ চলে যায়। যে অংশু ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্পের বই পড়ত …….। মা আর আগের মতো এসে বকে না, মায়ের পায়ের শব্দ শুনলেই গল্পের বই লুকিয়ে ফেলে পড়ার বইয়ে মনোযোগের ভান করতে হয় না। ওপরের দিকে তাকিয়ে শুয়ে থেকে, ছাদের নিরেট সাদার দিকে চোখ অপলক রেখে কী ভাবে সে? দরবেশ অংশুর দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। এক সময় উঠে এসে বিছানার ওপর ডান পা তুলে অংশুর জামা টানে। অংশু চোখ ফেরায়। তার চোখে জল। দরবেশ লাফ মেরে বিছানায় উঠে অংশুর বুকে-গলায় মুখ ঘষে।

এরকম হামেশা হয়। মিতুমাসি এসবের কিছু দেখতে পায় না। কেবল দেখে, বড় চুপচাপ হয়ে গেছে ছেলে।বড় মনমরা। শরীর যেন সেরেও সারছে না। যত্নের তো ত্রুটী রাখছে না সে। তবু কেন ছেলের স্বাস্থ্য ফেরে না !

বাড়িটা যেন নিস্তব্ধ প্রেতপুরী। কোথাও একটা খুট শব্দ হলেই কানে বাজে। মা এতকাল সারাদিন গান শুনত। এখন শোনে না আর। অংশু বলে – ‘… দরবেশ, আই হ্যাব ডেস্ট্রয়ড মা, কিলড বাবা!’ কুকুরটা কী বোঝে কে জানে – কান ফেলে চোখ পিটপিট করে। বসা অবস্থায় মেঝেতে লেজের বাড়ি মারে আস্তে আস্তে।

সেই রাতে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠলে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় অংশু। এক ঝটকায় তুলে নেয় বিছানার চাদর। কুকুরটা তীরের মতো ছুটে এসে অংশুর কব্জিতে দাঁতগুলো আলতো করে রাখে– যেন এক পা এগোলেই কামড় বসাবে। অংশু চিত্রার্পিতের মতো দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর ঘাড় হেলিয়ে তাকায়। দরবেশের চোখে চোখ রাখে। সেই চোখ দুটিতে মিনতি আর ভর্ৎসনা একাকার হয়ে আছে। অংশুর হাত থেকে চাদর খসে পড়ে। 

সকালবেলা চা দিতে এসে মিতুমাসি দেখে, উদলা তোষকের ওপর ঘুমে কাদা হয়ে আছে অংশু, কুকুরটাও ওর গা ঘেঁষে ঘুমোচ্ছে। বিছানার চাদর মাটিতে পড়ে আছে। কুকুরটা একবার চোখ খুলে তাকার, যেন বলে দেয়  - ‘এখন ওকে জাগিয়ো না।‘ মিতুমাসি নিজের ঘরে ফিরে যায়। নিঝুম হয়ে বসে থাকে। জীবনকে পেছন ফিরে দেখে মিতুমাসি। কোথায় ভুল করেছে খোঁজে। ছেলে কেন এরকম হল, সকালের উজ্জ্বল রোদ বেলা বাড়ার সাথে এমন ধুলিবিবর্ণ হয়ে গেল কোন ভুলে ! একদিনের তরেও তো ছেলেকে অবহেলা করে নি সে। কোনো অযত্ন-অবহেলা করে নি। মাটিতে রাখলে পিঁপড়ে, মাথায় রাখলে উকুন কামড়াবে – এই ভয়ে বুকে রেখেছে সর্বক্ষণ। তবু আজ তার ঘুম-জাগরনের প্রতিটি মুহূর্ত এক রাস্তার কুকুরের সাথে ! দিনমানে মায়ের সাথে একটি কথাও বলে না। তার চাইতে বড় কথা। অংশুকে দেখলে স্বাভাবিক মানুষ বলে মনে হয় না।

মিতুমাসির মনে পড়ে, ছোটবেলায় দিদিমা একটি গল্প বলেছিলেন। চিনিমামা যখন পাগল হয়ে গেলেন, তখন গল্পটি বলেছিলেন দিদিমা। তাদের এক পূর্বপুরুষের ওপর ক্রোধান্ধ হয়ে কোনোও এক সন্ন্যাসী নাকি নিজের কুশাসনটি সেই পুর্বপুরেষের মাথার ওপর ঝেড়ে দিয়ে অভিশাপ দিয়েছিলেন – এই  বংশের উত্তরপুরুষদের মধ্যে ,পৌত্র এবং দৌহিত্র, দুই ধারায়ই, মস্তিষ্ক-বিভ্রাট হবে। সেই পুর্বপুরুষ আছড়ে পড়েছিলেন সন্ন্যাসীর পায়ে, ব্যাকুল হয়ে প্রার্থণা করেছিলেন অভিশাপ প্রত্যাহারের। তখন করুণাপরবশ হয়ে সন্ন্যাসী বলেছিলেন – অভিশাপ ফেরানো যায় না, তবে উত্তরপুরুষের কেউ যদি মস্তিষ্ক-বিকারকে সৃষ্টির কাজে ব্যবহার করে, তাহলে এই অভিশাপ চিরতরে লোপ পাবে। মিতুমাসির মনে হয় – এই অভিশাপ আজ অংশুর ওপর নেমে এসেছে !

বিকেলে মেজমামা এলেন। নিচু স্বরে কিসব কথাবার্তা বললেন মিতুমাসির সঙ্গে। মিতুমাসি বলল – না, সেরকম উন্নতি সে দেখছে না, ওষুধে কাজ হচ্ছে বলে মনে হয় না। কুকুরের কাছে বিড়বিড় করে কথা বলে, কী যে বলে, নিঃশব্দ পায়ে দরজার কাছে গিয়ে শোনার চেষ্টা করেছে সে। কিন্তু কী করে যেন টের পেয়ে যায় অংশু। চুপ করে যায়। কুকুরের মতোই সজাগ কান আর তীব্র ঘ্রাণশক্তি হয়েছে যেন। দিদিমার কাছে শোনা গল্পটি বলে মিতু। শুনে মেজমামা ঘর কাঁপিয়ে হাসেন। বলেন – ‘মিতু, একটু বিজ্ঞানচর্চা কর !’

কিন্তু মেজমামাও জানেন, কিছু একটা জেনেটিক সমস্যা আছে পরিবারে। প্রত্যেক জেনারেশনেই মাথায় ছিটগ্রস্ত হয়েছে দু’চার জন। তাঁর নিজেরও তো এক সময় মনে হচ্ছিল – পাগল হয়ে যাচ্ছেন। সেই ভয়েই তো বিয়ে-থা করলেন না।

 - ‘ওকে আমার কাছে নিয়ে যাই ক’দিনের জন্য?’

      মিতুমাসি ঘাড় হেলায় – হ্যাঁ

অংশু অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেজমামার সাথে যায়। দরজার তালায় চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে মেজমামা বলেন – ‘সরস্বতী আসছে না আজ চারদিন। শুধু সেদ্ধভাত খেতে হবে কিন্তু।‘  অংশু এসব যেন শুনতে পায় না – সটান খাটে গিয়ে শুয়ে পড়ে। মেজমামার যে বয়স হয়েছে, ঘরের কাজে তাঁকে সাহায্য করা দরকার, সেই বোধটাও লোপ পেয়েছে। দেখে মনে হয়, জীবনকে বিসর্জন দিয়েছে অংশু। মেজমামা বোঝেন, শুধু ওষুধে কাজ হবে না, সাইকো-থেরাপির প্রয়োজন। কিন্তু জোর করে তো তা হবার নয়। তেইশ বছরের ছেলের ওপর জোর খাটানো যায় না। তবে একটা ভালো লক্ষণ আছে, কুকুরটার ওপর খুব টান।

সকালবেলা চা বানিয়ে খাচ্ছেন মেজমামা, অংশু অন্য ঘরে ঘুমোচ্ছে। সিঙ্কে বাসনগুলো জমে আছে, সেগুলো ধুতে হবে …। এমন সময় দরজায় বেল বাজে। সরস্বতী এসেছে, হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন মেজমামা। নিজের ঘরে গিয়ে জুত করে ইজিচেয়ারটায় বসেন – চায়ে চুমুক দিতে দিতে হাতের বইখানি পড়েন। ঘণ্টাখানেক পর আরেক কাপ চা দিয়ে যায় সরস্বতী। সাড়ে ন’টায় ঘড়ির কাঁটা ধরে ব্রেকফাস্ট দিয়ে যায়। এখন অনেক্ষণ কেউ তাকে বিরক্ত করবে না। এভাবেই চলছে জীবন। মাঝে মাঝে সরস্বতীর খুটখাট কাজের শব্দ আসছে, নইলে সবই নিস্তরঙ্গ, চুপচাপ।

হঠাৎ কুকুরের প্রবল চিৎকারে পড়িমরি ছুটে আসেন মেজমামা। সরস্বতীর ওপর মহা বিক্রমে ঘেউ ঘেউ করছে কুকুরটা। সরস্বতী ঘরে ঢুকতে গেলেই তেড়ে আসছে। কী ব্যাপার! বেলা অব্দি ঘুমোচ্ছে বলে মাঝে দু’বার এসে অংশুকে ডেকে গেছে সরস্বতী। এখন, এগারোটা বাজে, অংশুকে জোরে ডেকে ওঠানোর চেষ্টা করেছিল সরস্বতী। এতেই বিপত্তি।

অংশু চোখ মেলে তাকায়। সরস্বতী গজগজ করতে করতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। দরবেশ অংশুর মাথার কাছে বসে এমন ভাব করল, যেন বলল – ‘ঘুমো তুই। ….আমি আছি।‘ মেজমামার দিকে তাকিয়ে দাঁত বার করে হাসে অংশু। দাঁতগুলো নোংরা, হলুদ। তবু এই হাসি আশ্বস্ত করে। বহুকাল তাকে হাসতে দেখে না কেউ। মেজমামা কিছু না বলে নিজের ঘরে চলে আসেন।

একটু পর হাতে চায়ের কাপ নিয়ে অংশু ঢোকে। চেয়ার টেনে বসে। চায়ে চুমুক দেয়। জিগ্যেস করে – ‘কী বই পড়ছ?’ বই বন্ধ করে অংশুর দিকে সেটা বাড়িয়ে ধরেন মেজমামা – ‘অব লাভ অ্যান্ড আদার ডেমনস।‘ অংশু উল্টেপাল্টে দেখে, বই মেজমামার হাতে ফেরত দিতে দিতে বলে – ‘তোমার পড়া হয়ে গেলে আমাকে দিও।‘

-       ‘রাতে ঘুমোস নি?’

-       ‘অনেক দেরিতে ঘুমিয়েছি। …….’ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’-টা শেষ করলাম।‘

-       ‘হেমিংওয়ে তোর প্রিয় লেখক। ….তবে নব্বুই বছর আগের বই।‘

-       ‘হুঁ।‘

কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটে। তারপর অন্য কথা পাড়েন মেজমামা। বলেন – ‘দাঁতগুলো মাজবি!’

-       ‘হ্যাঁ, চানও করব। টুথব্রাশ আছে?’

-       ‘আনিয়ে দিচ্ছি।‘

-       ‘আমি যাচ্ছি আনতে।‘

অংশু বেরিয়ে যায়। মেজমামা লক্ষ করেছেন, অংশুর চোখের দৃষ্টি বেশ পরিষ্কার ছিল।

মেজমামার খুব চা খেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু সরস্বতী চটে আছে। তাকে চায়ের কথা বলার সাহস হচ্ছে না। এমন সময় চা এনে খট করে কাপ নামিয়ে রেখে চলে যাচ্ছিল সরস্বতী। রাগ! মনে মনে হাসেন মেজমামা। অংশুকে আরো কিছুদিন এখানে রাখার ইচ্ছে। সরস্বতীকে একটু তোয়াজ করা দরকার।মেজমামা বলেন – ‘সরস্বতীদি!’

-‘কী বলবে জলদি বল। সব কাজ পড়ে আছে। বেলা বারোটা পর্যন্ত লোকে ঘুমোয়। কখন বিছানা তুলি, কখনই বা ঘর পরিষ্কার করি। কুকুর নিয়ে ঘুমোয়!’

-‘ নাঃ। থাক তাহলে।‘

-‘বলেই ফেল।‘

-‘বলছিলাম, …আজ একটু মাংস …।‘

-‘চিকিন তো?’

-‘হ্যাঁ।‘

শক্ত ঘাড়টা একদিকে করে চলে যায় সরস্বতী। ‘হ্যাঁ’ ‘না’ কিছু বলে না। কিন্তু মেজমামা বুঝে যান। দোকানে ফোন করে চিকেন আনান।

অংশু স্নান করেছে আজ। পরিষ্কার জামাকাপড় পরেছে। ওরা দু’জনে বসে খান। চিকেনের হাড়গোড়গোলা দরবেশ খায়।

খেয়েদেয়ে মেজমামার ঘরে এসে বসে অংশু। বলে – ‘তখন কী বলছিলে, নব্বুই বছর আগের বই।‘

-‘হ্যাঁ। … রিসেন্টলি যেসব বই লেখা হচ্ছে …।‘

-‘ক্লাসিকস সর্বকালের নয়?’

-‘অবশ্যই। তবে তার মানে এ নয় যে নতুন ক্লাসিকস লেখা হচ্ছে না।‘

-‘হচ্ছে কি?’

-‘দেখ অংশু, মেটাল আর প্লাস্টিক-পলিথিনের মধ্যে যে তফাত, সেই সময় আর এই সময়ের মধ্যেও এই তফাত। একথা মেনে নিয়ে, এই যে ঠুনকো মানুষ আমরা – ঠুনকো, অসহায় …, তাদের কথাও তো সাহিত্যে আসুক!’

-‘এসেছে তো। চেতন ভগত ….এটসেটরা। একবার পড়ে ফেলে দিতে হয়, এরকম সব বই ….তোমার ওই পলিথিন ব্যাগের মতো। বাংলা আমি পড়তে পারি না, বাংলায় কিছু লেখা হয়ে থাকলে জানি না।‘

মেজমামা চুপ করে থাকেন। তাঁর বলতে ইচ্ছে করে, তিনি অংশুকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। না, আই.এ.এস.-এর স্বপ্ন নয়। অংশু ক্লাসিক লিখবে, এই স্বপ্ন। ছোটবেলায় কী আসাধারণ সব কম্পোজিশন সে লিখত।

-‘হ্যারি পটার পড়েছিস?’

-‘পড়েছি। …হবিট, লর্ড অব দ্য রিংস – সেগুলোও পড়েছি। ম্যাজিক ওয়ার্ল্ডের ফাঁকিবাজি গপ্পো। পড়তে ভালো লাগে যদিও …।

‘-‘ফাঁকিবাজি লাগে তোর! ম্যাজিক ওয়ার্ল্ড-এর পেছনে বাস্তব জগতটা আরো ভালো করে দেখা যায় না? আই থিংক, ম্যাজিক একটা বড় টুল। বাস্তব জগতটাকে আরো ভালো করে দেখানো যায় তাতে।

দরবেশ দু’বার এসে কুঁই কুঁই করেছে, কান ফেলে আর্জি জানিয়েছে, অংশুর সেদিকে খেয়াল নেই। অবশেষে সে সরস্বতীর শরণাপন্ন হয়। এই ক’দিনে সরস্বতী বুঝে গেছে তার ভাষা। সে সদর দরজা খুলে দেয়।

হঠাৎ অংশুর খেয়াল হয় – ‘দরবেশ কোথায়!’

-‘হাগতে গেছে।‘

-‘কতক্ষণ হল?’

-‘তা হবে দশ-পনরো মিনিট।‘

অংশু ছুটে বেরিয়ে যায়। নতুন এরিয়াতে অন্য কুকুর দরবেশকে আক্রমণ করতে পারে। যদিও কয়েক দিন হয়ে গেছে, তবু দরবেশ যখন বেরোয়, অংশু কান খাড়া করে রাখে, লেন ডিস্টার্বেনস হলে শোনা যাবে।

দরবেশ ফিরে এসে দূরে গিয়ে বসে থাকে। স্পষ্ট বোঝা যায়, ওর গাল ফুলেছে। কতক্ষণ পেচ্ছাব আটকে রাখতে হয়েছিল তাকে! ওর মান ভাঙ্গাতে হিমসিম খায় অংশু।

রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুম আসে না অংশুর। ম্যাজিক ওয়ার্ল্ড এবং বাস্তব জগৎ - এই দুয়ের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে মেজমামার কথাগুলো তাকে ভাবাচ্ছে। এরকম করে সে ভাবে নি কখনো। কলেজের পড়া ছেড়ে দিয়ে, কেবল নিজের ভাবনার জগতে আটকে থেকে, অন্যের ভাবনার সাথে আদান-প্রদান না করে যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য সে নিজে দায়ী।

মাথার ভেতরে ভাবনারা বিষম কোলাহল শুরু করে। মগিজের তলায় ঘুমিয়ে থাকা স্মৃতিগুলো ফুঁড়ে উঠতে শুরু করে। অংশুর মনে পড়ে, বাবার তখন জামনগরে পোস্টিং, অংশু সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে ক্লাস সেভেনের ছাত্র। তিন দিনের এক্সকারশনে ওরা পিরটন দ্বীপে গিয়েছিল – ম্যারিন লাইফ পর্যবেক্ষণে। সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। পূর্ণিমার রাতে দ্বীপের প্রায় পুরোটাই জোয়ারের জলের তলায়। কেবল লাইট হাউসটি এবং অংশুদের তাঁবুগুলো ডোবে নি। কচ্ছপের খোলের উঁচু জায়গাটার মতো দ্বীপের একফালি ভাসা আছে। ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় চারদিকে শুধু জলোচ্ছাস। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে বসে দেখেছিল অংশু। অন্য সকলে একজন দু’জন করে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তখন ঢেউয়ের রূপালি চূড়ায় জলপরীদের নাচতে দেখেছিল অংশু। ভোরের দিকে তাঁবুতে ঢুকে শুয়ে পড়ে ভাঁটার টানে ঢেউয়ের পশ্চাদপসরনের বিষণ্ণ গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছিল অংশু।

সকালে ঘুম ভাঙলে, সমুদ্র তখন অনেক দূরে চলে গেছে, চার কিলোমিটার সমুদ্রতল জেগে উঠেছে, এখানে ওখানে ছোট ছোট ডোবার মতো জল জমে আছে। সেই বিস্তীর্ণ সমুদ্রবক্ষে গাইড নবীনভাই অংশুদের নিয়ে গিয়েছিল, দেখাচ্ছিল ছোট ছোট পলায়ানরত অক্টোপাস কেমন করে শরীর থেকে পিচকারি মেরে ছিটিয়ে দেয় বেগুনি রঙয়ের জল। সেইদিকে চোখ চলে যায় আর এই সুযোগে পালায় অক্টোপাস। নিজেকে বাঁচানোর অভিনব উপায়। পলকে খপ করে মুঠোয় একটি মাছ ধরে ফেলে নবীনভাই বলেন – ‘ভালো করে দেখ, কী হয় …।‘ মাছটি মুঠোর ভেতর কাঁপে আর ফুলতে থাকে। শরীরে হাওয়া ভরে ফুটবলের মতো গোল হয়ে ওঠে। মুঠোয় আর আঁটে না। ফসকে গিয়ে জলে ডুব মারে। নবীনভাই বলেন – ‘ ডিফেন্স মেকানিজমের আরেক উদাহরণ।‘

এক জায়গায় এসে নবীনভাই বলেন – ‘চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক, টুঁ শব্দটি করবে না।‘ পায়ের পাতা ডোবে না, এমন জলের  তলায় বালির ওপর হাতের পাতা আলতো করে চেপে রাখতে বলেন সবাইকে। কয়েক মিনিট এভাবে রাখার পর হাতের তেলোয় মৃদু চাপ। জীবন্ত কোরালরা পায়ের শব্দে মাটির নিচে সেঁধিয়ে গিয়েছিল, শব্দ নেই, তাই আবার জেগে উঠছে। সেই কোরালস্পর্শের স্মৃতিতে এতো বছর পর আজ অংশুর লোমহর্ষোণ হয়।

হঠাৎ সোরগোল উঠেছিল। ক্লাস এইটের কুশ মেহতা তলিয়ে গেছে, ক্যুইক স্যান্ডে মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেছে। ওর যমজ ভাই লব মেহতা প্রাণপণে চিৎকার করছে, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না। হঠাৎই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সমস্ত পর্যবেক্ষণ – এক্সকারশন পার্টি জামনগর ফিরে গিয়েছিল। মোটরবোটে গাদাগাদি করে উঠেছিল তারা। নবীনভাই পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নৌকো অনেকটা এগিয়ে গেলে দূর থেকে দেখা যায়, নবীনভাইর ধবধবে সাদা চুল উড়ছে ….. যেন এক পয়গম্বর।

অংশুর মাথায় গল্পের ভ্রূণ তৈরি হয়।

সেদিন কুশ মেহতার চোরাবালিতে মৃত্যু হয় নি। তাকে আসলে টেনে নিয়ে গেছে অন্য এক জগৎ। পাতালের সেই জগতকে মাটির ওপরের মানুষ যেমন অন্ধকার মৃত্যুপুরী ভাবে – মোটেও সেরকম নয় তা। হ্যাঁ, সেখানে সুর্যোদয় নেই, তবে তার বদলে আছে বাসুকি নাগের মাথার মণির আলো। সেই স্বর্ণ-আলোয় ঝলমল করে চারদিক। এ এক অন্য জগৎ - যার নাম অনন্তলোক। অনন্তনাগের রাজ্য। অনন্তলোকের বাসিন্দাদের চোখের দৃষ্টি সেই আলোতে দীপ্ত হয়। সকল প্রানোড়ওসের উৎস এই আলো। এই রস পান করে গাছে গাছে পেকে টুসটুস করে নেকটারিন।

অনন্তনাগের আরেক নাম বাসুকি। তাই এখানকার সকলের পদবি বাসুকি। সকল পুরুষের নামের শেষ অক্ষর ‘ল’। সকল নারীর নাম ‘জ’ অক্ষর দিয়ে শেষ হয়েছ। আর কোনো জাতিভেদ, বর্ণভেদ নেই এখানে।

অনন্তলোকে বহুদিন ধরেই মর্তলোকের কোনোও আইডিন্টিকাল টুইনের একজনকে প্রয়োজন হচ্ছিল। মর্তের মানুষ, যারা সেই আদিম যুগ থেকেই যুদ্ধবাজ, তাদের ইদানীংকালের কার্যকলাপ অনন্তলোককেও বিপদগ্রস্ত করছিল। তাদের আনবিক অস্ত্রসম্ভার চিন্তিত করছিল অনন্তলোকের বিজ্ঞানীদের। এই অস্ত্রের প্রয়োগ হলে তার বিকীরণ ধ্বংস করবে এই পাতাল্পুরীও। এই ভয়ঙ্কর দিনকে প্রতিহত করতে কুশকে ওদের প্রয়োজন। কুশের মেধাকে ওরা বিকিশিত করবে। সে হবে শান্তিবিজ্ঞানী।শান্তিবিজ্ঞান মর্তের বিজ্ঞানীদের অধিগত নয় এখনো। অনন্তলোকের বিজ্ঞানী রামেল বাসুকি কোরালের ডেড সেল থেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন পিস-পার্টিকলস। এই পিস-পার্টিকলস আরো সূক্ষ্ম করে তুলতে অনেকটাই এগিয়েছেন রামেল বাসুকি। কুশের শান্তিবিজ্ঞিনী হয়ে ওঠার পর জেনেটিক কোড কনটাক্ট  অ্যাপলিকাশনের সাহায্যে কুশের এই পরিবর্তন লব মেহতার মধ্যেও সঞ্চারিত করবেন রামেল বাসুকি। ফলে মর্তবাসীও ক্রমশ হয়ে উঠবে যুদ্ধবিমুখ।

রাতের পর রাত জেগে লেখে অংশু। দিনরাত লেখে কেবল। তার হাতের কাছে জলের বোতল, ভাত-তরকারি, চা-কফি – সব রেখে যায় সরস্বতী। ছেলেটাকে যেন ভূতে পেয়েছে। কখন যে খাবারটা খায়, বোঝা যায় না। কেবল এক সময় এসে সে দেখে – থালা খালি। কিংবা কাপ খালি। দরবেশ সর্বক্ষণ বসে থাকে অংশুর পায়ের কাছে।

অংশু লেখে – রামেল বাসুকি বসে আছেন কুশ-এর বিছানার পাশে। এই তিনদিন সে একটানা ঘুমোচ্ছে। এই ঘুম কুশকে ভুলিয়ে দেবে তার আগের জীবন …..।

কুশ জেগে উঠবে এখন। তার চোখের পাতা কাঁপছে। হঠাৎ চোখ খুলল সে। রামেল বাসুকি ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করলেন – ‘কুশল বাসুকি, তুমি ভালো আছ?’ কুশ জবাব দেবার আগেই ঘরে ঢোকেন মিরজ বাসুকি – হাতে এক বাটি নেকটারিন পুডিং।

দশ বছর ধরে কুশল বাসুকি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে শান্তি-বিজ্ঞানী। ওদিকে জামনগরের উপকূলে এক ল্যাবরেটরিতে লব মেহতা পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করে। পীস পার্টিকলের সন্ধান পায় লব। লবের এই আবিষ্কার নিয়ে বিজ্ঞানীরা উৎসুক হন…। বড় বড় দেশগুলো এই আবিষ্কারকে ধ্বংস করার জন্য তৎপর হয়।

লব মেহতা ইতিমধ্যে পীস পার্টিকেলের সূক্ষ্মতম বিভাজনে সক্ষম হয়। অন্যান্য বিজ্ঞানীদের তত্বাবধানে তৈরি হয় ডিসপেনসার, যা শান্তিকণা ছড়িয়ে দেয় আয়নোস্ফিয়ারে …।

টানা কুড়িদিন লেখে অংশু। তার কলমে যেন পবনের গতি। একান্নটি চ্যাপটারে লেখা শেষ হয় তার। কাগজের তাড়া মেজমামাকে ধরিয়ে দেয় সে। কৃশ অংশু। মুখটা লম্বা। চোখগুলো মাত্রাতিরিক্ত বিশাল।

একথালা ভাত খেয়ে ঘুমোতে যায় অংশু। বিছানায় গা লাগাতে না লাগাতে ঘুমে তলিয়ে যায় সে।

মেজমামা পড়েন। পড়তে পড়তে ডুবে যান গল্পে। তিনদিন লাগে পড়া শেষ করতে। একান্নটি চ্যাপটার যেন সুজাতার পরমান্নের একান্নটি গ্রাস।

পড়া শেষ হলে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন মেজমামা। তারপর চশমা খুলে কাচ থেকে বাষ্প মোছেন। এক সময় উঠে এসে বসেন অংশুর শিওরের কাছে। অংশুর চোখগুলো তিরতির কাঁপছে। এই বুঝি জাগবে ও।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Comments

Popular posts from this blog

স্ত্রীর পত্র

কচুয়া শাড়ি দারাসিং লাফ