‘কসু নথি’ – কিছু না

 

                                  

                                                          হনসা

সবাই যাবে। যেতেই হবে। ‘না‘ বলার সাহস নেই কারও। নটবর প্যাটেল এসে বলে গেছে – সকাল এগারোটার সময় বলরামপুর চার-রাস্তায় ট্র্যাক্টর অপেক্ষা করবে। সবাইকে ট্র্যাক্ট্ররে করে নিয়ে যাবে। দিয়েও যাবে বিকেলে। আর দেবে এক দিনের রেগা-মজুরি। মজুরি আগের দিনই পাবে সকলে।

অগ্রিম মজুরি দিতে আগুপিছু ভাবনার দরকারই নেই নটবরভাইর। তার কথা অমান্য করার হিম্মত নেই কারোও। অগ্রিম টাকা পেয়ে বরঞ্চ ভয়ের সাথে খানিকটা ভক্তিও যোগ হবে। পাক্কা হিসাব নটবর প্যাটেলের। এমনি এমনি তো আর পুরো এলাকার লিডার হয় নি!

লাবুও যাবে। যদিও এক বছর আগে নটবর প্যাটেলের ছেলেরাই পানুরামকে এমন বেদম মেরেছিল – যার ফলে পানুরাম সেই থেকে বিছানায় অপাহিজ হয়ে পড়ে রয়েছে ……… তবু যাবে লাবু। জলে বাস করতে হলে কুমিরের সাথে লড়াই চলে না। একদিনের মজুরি তো বাড়তি লাভ। ওই টাকা দিয়ে পুরো হপ্তার আটা-চোখা কেনা যাবে। ক’দিন পেট ভরে বাজরার রোটি খাওয়ার সুখ পাবে ছেলেমেয়েগুলো।

সকালবেলা যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে হনসাকে পাখিপড়া করে বলে লাবু – বাপুকে সময়মতো খেতে দেয় যেন, রোটি বানিয়ে রেখে গেছে সে, বাপু এবং ভাইদের খাইয়ে সেও যেন খেয়ে নেয়। আর ছাগলগুলোর দিকে যেন কড়া নজর রাখে। শেয়ালের উপদ্রব খুব বেড়েছে আজকাল ……..।

এসব বলতে বলতে মেয়ের মুখের দিকে তাকায় লাবু। মেয়ের মুখ হাঁড়ি হয়ে আছে। সে অসহিষ্ণু স্বরে জিজ্ঞাসা করে – কী হয়েছে তোর?

-       ‘কসু নথি।‘  কিছু না।

 মাকে বলে লাভ নেই। শেয়ালের উপদ্রব বেড়েছে বলে ছাগলের জন্য মায়ের চিন্তা কত। একটা মানুষ-শেয়াল যে হনসাকে শেষ করছে, সেকথা মাকে বললে মা উল্টে তাকেই বকবে। আধপেটা খেয়েও হনসার শরীরে কেন নতুন লাবণ্য এসেছে, এ  যেন তার অপরাধ।

নটবর প্যাটেলের বড় ছেলে নবীন প্যাটেল ওৎ পেতে থাকে, কখন হনসা ওদিকটায় যাবে। দু’এক বার হনসার বুক চটকে দিয়েছে। কয়েকদিন আগে, হনসা তৈরি ছিল – নবীনের হাত কামড়ে দিয়েছিল। ব্যথায় মুখ বিকৃত করে, ‘দেখে নেব’ বলে সেদিনের মতো চলে গিয়েছিল নবীন। সেই থেকে ভয়ে ভয়ে ছাগল চরাতে যায় হনসা।

হনসার আরেক মা আছে অবশ্য। কালিমাই। বুড়ি ছাগিটা। তার সাথে কথা বলে হনসা মনে বল পায় –  'নবীন বদমাশ ছে, ছে না কালিমাই?’ কালিমাই বলে ‘ম্যাঁ –এ-এ।‘  হনসা খিলখিল হাসে। ‘কালিমাই, উভা থানু’ ছাগলটা পেছনের দু’পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, ডাকে – ম্যাঁ-এ-এ-এ’।

এই খেলা শুরু হয়েছে সেদিন থেকে, যেদিন নবীনকে কামড়ে দিয়ে থু থু ফেলতে ফেলতে কেঁদে ফেলেছিল হনসা। কালিমাই কোথা থেকে দৌড়ে এসে হনসার চানিয়ায় গা ঘষেছিল।

হনসাদের বাড়িটা শহরের একেবারে প্রান্তে। তারপরেই হাইওয়ের দুই ধারে কিছু খেতি জমি, আর বেশির ভাগ পাথুরে জমি। পাথুরে জমির খানাখন্দে ঘাস গজায়। সেই ঘাসে গরু-ছাগল চরে। হনসাদের বেশ কয়েকটা ছাগল আছে। শেয়ালের থেকে ওদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য কড়া নজর রাখতে হয়। ছাগলগুলোই এখন জীবনের ভরসা। যবে থেকে বাপু বিছানায়, মা যায় কাজে। কখনো কাজ পায়, অনেক সময়ই পায় না। রোটি বড় অনিশ্চিত তাই। হনসা বিষণ্ণ দৃষ্টিতে দূরের দিকে তাকিয়ে থাকে।

 সামনে দিয়ে কালীমাইর শিং বাগিয়ে দৌড়ে যাওয়া দেখে হনসার সম্বিত ফেরে। কী ব্যাপার বোঝার জন্য সে এগিয়ে যায়। একটি পাথরের পেছন থেকে কার যেন আর্তনাদ। বাঁক নিতেই  সে দেখে – কালিমাই শিঙের গুঁতো মেরেছে নবীন প্যাটেলের পেটে। পেটে হাত চেপে গোঙাচ্ছে নবীন। ওর দুর্দশা দেখে খিলখিল হাসে হনহা। অপমানে নবীনের চোখমুখ লাল হয়। 

প্রাথমিক উল্লাস কেটে গেলে হনসা ভয় পায়। এর ফল দূর পর্যন্ত গড়াবে জানে সে। বাড়িতে এমন কেউ নেই, যে হনসার সঙ্কটে সহায় হবে। বাপু তো অপাহিজ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে, তা আজ দু’বছর হল। কী মারটাই তারা মেরেছিল – বাপুকে আর যসুরাম কাকাকে। বাপু আর যসুকাকা একটা মরা গরুর চামড়া ছাড়াচ্ছিল। ওরা সেখানে গিয়ে হাজির হয়ে বলল – বাপুরা নাকি গরু মেরেছে। গরু ভগবান। ভগবানকে মেরেছে !

কী মারটাই না মারল ওরা ! নবীন প্যাটেল মারের ভিডিও তুলেছিল। দুনিয়াকে দেখালো সেই ভিডিও – যাতে কেউ ভবিষ্যতে গরুর গায়ে হাত তোলার সাহস না করে। কেউ এগিয়ে যায় নি মার আটকাতে। ভয়ে। কেবল ধর্মরাজ পরিত্রাহী চিৎকার করেছিল।

তারপর শুরু হল মহা শোরগোল। ‘ছাপা’-র লোক, টি.ভি.-র লোক এসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাপুকে জিজ্ঞাসা করল – কেন মারল, কী করে মারল ….। ছবি তুলল।

পানুরাম বলেছিল – মরা হাতি যেমন লাখ টাকা, মরা গরুও লাখ না হলেও কয়েক হাজার টাকা। কেবল গরুর চামড়া নয়, শিং থেকে শুরু করে পায়ের খুর, মরা গরুর শরীরের এক ইঞ্চিও ফেলা যায় না।

-‘কী কাজে লাগে তা?’

- ‘ওষুধ, ভিটিমিন, খেলার সরঞ্জাম, মুখে লাগানোর ক্রীম, পায়ের গোড়ালিতে ঘষার ক্রীম….. আরো না জানি কত কী !’

-‘তা কার কথায় গরুর চামড়া ছাড়াতে গিয়েছিলে? মানে কে দিয়েছিল কাজটা?’

পানুরাম এ কথার জবাব দেয় নি। কারণ জবাবটা আরো বিপদ ডেকে আনত। মরা গরুর ব্যাবসা করে লাখ লাখ টাকা কামায় পবনকুমার সেজপাল। ওর সাথে লাগতে যাওয়া মানে বিষাক্ত সাপের লেজে পা দেয়া। লোকে জানে, এই ব্যবসা জিয়াদ উল্লাহ-র। আসলে জিয়াদ সেজপালের শিখণ্ডী। তা ছাড়া, মুখ বন্ধ রাখার জন্য কিছু টাকাও দিয়েছে সেজপাল। গভীর রাতে ওর লোক এসে পাক্কা দু’হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে গেছ।

হনসার মনে হয় - এত মার খেয়েও বাপুর যেন খুশি লাগছিল। ছাপার লোক, টি.ভি.-র লোক, সামাজিক কার্যকর্তা এসে যেন ওদের ঝুপড়িকে কয়েকদিনের জন্য বিখ্যাত করে দিল। কত নেতালোগ এসে সান্ত্বনা দিলেন, এই অত্যাচারের প্রতিকার করবেন বলে গেলেন, সরকার থেকে মোয়াবজা পাইয়ে দেবেন বলে গেলেন। টি.ভি.-তে বড় বড় সব লোকের সাথে বাপুকে দেখাল। বাপুর খুব গর্ব হল। ঝুপড়িটা পর্যন্ত বিলাত-আমেরিকার লোক দেখল, কম কথা নাকি !

কিছুদিন পর সব ঠাণ্ডা পড়ে গেল। তখন অন্য সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হল ওরা। গরিব ওরা আগেই ছিল। বাপুর রোজগারের ক্ষমতা চলে গেল বলে আরো গরিব হল ওরা। যাদের জন্য ওদের এই হাল, তাদের কথায় মা যাছে মিটিং শুনতে। হনসার ভেতরটা রাগে গরগর করে।

                                                                                                       

                                                           লাবু

 বলরামপুর চার-রাস্তায় পৌছে লাবু দেখে, কী ভিড় রে বাবা ! অনেকগুলো ট্র্যাক্টর লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঠাসাঠাসি করে লোক বসেছে ট্র্যাক্টরের ট্রেলারে। আরো লোক আসছে সমানে। মাথায় ‘জয় শ্রীরাম’ লেখা গেরুয়া ফেট্টি বেঁধে ভলান্টিয়াররা দৌড়াদৌড়ি করছে, ডাক-হাঁক করেছে। লাবুকে ওরা একটা ট্র্যাক্টরের পেছনে বসিয়ে দিল। লাবু বলেছিল – ওর মহল্লার লোকেদের সাথে বসতে চায়। কথা কানে নিল না। দ্বিতীয় বার বলার সাহস হয় নি লাবুর। গেরুয়া ফেট্টি দেখলে ওর বুক ধড়ফড় করে। পানুরামকে যখন ওরা  নাঙ্গা করে মারছিল, তখনো এই রকম ফেট্টি বেঁধেছিল। লাবু ফাঁদে পড়া কবুতরের মতো থরথর কাঁপে।

এত ভিড়ে একা লাগে লাবুর। লোকজন বুক চিতিয়া নারা লাগাচ্ছে – ‘জয় শ্রীরাম !‘ সবাই বলেছে, এবারো ভগোয়া সরকার বানাবে এখানে। হিন্দুদের ভগোয়া বাঁচিয়ে রেখেছে, ভবিষ্যতেও বাঁচতে হলে ভগোয়াকে জেতাতেই হবে। লাবু ভাবে – সেও তো বাঁচতে চায়। কিন্তু বাঁচতে পারছে কই। খাদ্য বলতে আচার আর বাজরার রোটি। দাল তো কবেই বাদ পড়েছে পাতের থেকে। তোয়ার দাল একশো টাকা কিলো। রোটি, আচার আর খানিকটা কাঁচা মুলো কিংবা গাজর, কাঁচাই খেতে হয়, রান্নার তেল তো নাগালের বাইরে কবে থেকেই। এইভাবে বাঁচাকে বাঁচা বলে না।

তার মানে কি লাবুরা হিন্দু নয়? তাহলে কী ওরা? মন্দিরে ঢোকার অধিকার না থাকলেও মন্দিরের দেব-দেবীদের পুজো করে তারা, দেওয়ালি-হোলি তাদেরও উৎসব। রামনবমীতে তারাও তো কীর্তন গায়, রামায়ান-মহাভারতের গল্পগুলো তারাও তো শোনে তন্ময় হয়ে। রামের বনবাসকাহিনী শুনে কেঁদে ভাসায়, সীতামাইর পাতালপ্রবেশ পাঁজরের হাড়গুলো গুঁড়োগুঁড়ো করে দেয়!

আজকের মিটিং-এর এত বোলবোলাও, কারণ তিনি আসছেন। আগে তিনি এই রাজ্যের মুখিয়া ছিলেন। এখন তিনি সারা দেশের মুখিয়া। তাঁর এক কথায় নাকি সারা দেশ চলে। হবে। আগে যখন এখানে রাজ করেছেন, তাঁর এক কথায় অনেক অনেক মুসলমানকে কেটেছে। ওদের মহল্লাগুলোয় আগুন লাগিয়েছে, স্ত্রীলোকদের প্রথমে বরবাদ করে তারপর জ্বালিয়েছে। সে আজ কত বছর যেন হল।

তখন লাবু ভেবেছিল, ভাগ্যিস সে মুসলমান নয়। এখন তার মনে হচ্ছে, সে হিন্দুও নয়। তার তবে কোনোও ধর্ম নেই! ভগবান নেই। বিপদে কার স্মরণ সে নেবে ? ভয়বিহবল লাবু শুনতে পায় না, সারা মাঠ কাঁপিয়ে কী তিনি বলছেন। হঠাৎ তার চটকা ভাঙ্গে জনতার প্রবল হর্ষধ্বনি আর ‘জয় শ্রীরাম’ হুঙ্কারে। তিনি বলছেন, মারবেন তিনি, বাড়ির ভিতর ঢুকে মারবেন, পাতাল থেকে টেনে বার করে এনে মারবেন! জনতা তাল মিলিয়ে গর্জন করে – ‘জয় শ্রীরাম’।

লাবুর সারা শরীর থরথর কাঁপে – তার মনে হয়, এসব কথা তাকে বলছেন তিনি। আবার পানুরামকে মারবে তাঁর বানরসেনা, এবার মেরে একেবারে নিকেশ করবে, হনসাকে বরবাদ করে জ্বালাবে। বরবাদ কী করে দিয়েছে? মেয়েটা কেমন যেন হয়ে গেছে। কিছু একটা হয়েছ তার। বলছে না।

 যবে থেকে লাবুর মনে হয়েছে, তারা হিন্দু নয়, যদি হত,তবে তো  গরুর চামড়া ছাড়ানোর কাজ পানুরাম করত না। কিন্তু পানুরামের বাপদাদার, বাপদাদারও বাপদাদার আমল  থেকে তারা এই কাজ করে আসছে। গরু তখনো ভগবান ছিল। মরা গরুও ছিল?  যদি তাই হয়, তবে তো ভগবানের ছাল ছাড়ানো অধর্মের কাজ। পুরুষানুক্রমে অধর্মাচরণের শাস্তি পেয়েছে পানুরাম। অধর্মাচরণের জন্যই তারা এত গরিব। পাপের শাস্তি এই দারিদ্র, এই মারের বাড়া মার। কিন্তু তাহলে তো পবনকুমার সেজপাল আরো বড় পাপী। তার কেন শাস্তি হয় না!

যবে থেকে লাবুর মনে সন্দেহ জেগেছে, তারা হিন্দু নয়, তবে থেকেই নানা প্রশ্ন তাকে অবিরাম আক্রমণ করছে। তার মাথা কামড়ায়, যেন খুলি কেটে মগজ বেরিয়ে আসবে।

কখন যে মিটিং শেষ হল, কখন লোকজন সব চলে গেল, লাবু টের পেল না। যখন সম্বিত ফিরল, চারদিকে তাকিয়ে দেখল, মাঠ খালি হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরবে কী করে সে। ত্রস্ত লাবু ট্র্যাক্টর ধরতে দৌড় মারে। বলরামপুর চার রাস্তার ট্র্যাক্টর খুঁজতে গিয়ে হয়রাণ হয় সে। হাজার হাজার ট্র্যাক্টর দাঁড়িয়ে আছে। তার মাঝে কোনগুলো বলরামপুর চার রাস্তায় যাবে, কে বলে দেবে লাবুকে! মিটিং হয়ে গেছে, এখন আর ভলান্টিয়ারদের দেখা নেই। লাবুর কান্না পায়। তাকে কাঁদতে দেখে কার যেন দয়া হয়। একটি ট্র্যাক্টরের অকথ্য ভিড়ের ভেতর লাবুকে ঠেলে ঢুকিয়ে দেয় সে। ট্র্যাক্টর স্টার্ট দিতেই সবাই নারা লাগায় – ‘জয় শ্রীরাম’। লাবু তাদের সাথে গলা মেলাতে পারে না। তার মনে হয়, রামনামে অধিকার নেই তার।

অথচ লাবুদের জাতে পুরুষের নামের সাথে রামনাম জোড়া থাকে – দয়ারাম, খিলারাম, যসুরাম, রামবোল, পানুরাম . . . । এ এক মহা ধন্দ। ‘নেই’ না ‘আছি’ – এই ধন্দের ফয়সালা করা লাবুর অসাধ্য। লাবুর বাবা ছিল পরশুরাম, জেঠা তরসুরাম। অনবধানে লাবুর বুক চিরে আর্তনাদের মতো বেরিয়ে আসে – ‘হায় রাম’!

                                               কালিমাই এবং ধর্মরাজ

সেদিন গুঁতো খাওয়ার পর কদিন হল, নবীন প্যাটেল এ মুখো হয় নি। ছাগলগুলো নিয়ে চরাতে যাওয়ার পথে উঠানের কোনে শুয়ে থাকা কুকুরটাকে হনসা বলে -    ‘ধর্মরাজ , বাপুকে দেখে রাখিস . . ।‘ ধর্মরাজ উঠে দাঁড়ায়, লেজ নাড়ে। কুকুর বড় বাফাদার প্রাণী। আজকাল তো সারা দিনেরাতে একখানা মাত্র রোটি সে দেয় ধর্মরাজকে। কিন্তু আগের দিনগুলোর কথা সে ভোলে নি। রাস্তা থেকে তাকে তুলে এনেছিল হনসা। এইটুকু বাচ্চা ! বাপু সেদিন মুর্গি কিনে এনেছিল। নিজের খাওয়া হয়ে গেলে হাড়গুলো নিয়ে সে বাইরে যাচ্ছিল – লাবু জিজ্ঞাসা করেছিল – ‘কুতরো মাটে?’

-‘ধর্মরাজ মাটে।‘

হনসা জানত মহাভারতের গল্প – স্বর্গের পথে যুধিষ্ঠিরের সঙ্গী হয়েছিলেন কুকুরবেশে ধর্মরাজ।

আজ  হনসার নবীনের ভয় নেই, সেও গেছে মিটিং-এ। নিডর হনসা ছাগলগুলোর সাথে খুব খেলে আজ। নিডর হওয়ার মতো সুখ আর কী আছে এই দুনিয়ায়! এর সাথে কোথায় লাগে ভরপেট খাওয়ার সুখ। নির্ভয় হনসার কুঁকড়ে থাকা স্তনগুলো আজ আরেকটু পুষ্ট হয়, চামড়া চিকন হয়, চোখের পাতায় যৌবন-স্বাপ্ন ছায়া মেলে। কালিমাই দেখে – হনসা মন-সায়রে ডুবে আছে। মেয়ের জন্য মমতায় বুক ভরে যায় তার।  কালিমাইর চোখগুলো থেকে স্নেহ চুঁইয়ে পড়ে। তখন তার চোখে পড়ে, পাথরের খাঁজে সবুজ ঘাস। কালিমাই অবাক হয়ে ভাবে, শীতের এমন শুকনো সময়ে সবুজ ঘাস! পাথর তবে ধরে বাঁচিয়ে রেখেছিল খানিকটা বর্ষার জল।

আজকের মিটিং নবীন প্যাটেলকে খুব উদবুদ্ধ করেছে। প্রবল উত্তেজনায় সে ভাবে, হিন্দুরাজ্যের এক বীর সেনা সে। বসুন্ধরা বীরভোগ্যা। তখন সেদিনের ছাগলের গুঁতো খাওয়ার অপমান তাকে ক্রোধান্ধ করে। রাত গভীর হলে সে অপমানের প্রতিশোধ নিতে রাস্তায় বেরোয়।

মাঝরাতে মহল্লার সব কুকুর একসাথে ডেকে উঠলে হনসার ঘুম ভাঙ্গে। ধর্মরাজ তড়াক করে উঠে দৌড় মারে সেই সমবেত ডাকের পানে। কুকুরের তাড়া খেয়ে দৌড় লাগিয়েছিল নবীন প্যাটেল। ধর্মরাজ গিয়ে কামড়ে ধরেছিল নবীনের পায়ের ডিম। পরিত্রাহী চিৎকার শুনে বেরিয়ে এসেছিল মহল্লার লোকজন।

 এত রাতে কেন এসেছিল নটবরভাইর ছেলেটা, এই নিয়ে কানাকানি করে তারা। নটবরভাইকে তারা ভয় পায়। তার ছেলেকে মহল্লার কুকুর কামড়েছে। এর প্রতিশোধ না নিয়ে ছাড়বে না নটবর। ওই কুকুরটা পানুরামের মেয়ের। ওরা পানুরামের ওপর বিরক্ত হয়, নিজে তো বরবাদ হয়েইছে, এখন পুরো মহল্লায় আগুন লাগানোর বাকি রয়েছে! সকাল হলেই তারা গিয়ে নটবরভাইর পা ধরে মাফ চায়।

নটবর প্যাটেল ঝানু লোক। এমন কিছু সে করবে না, যাতে ভীত লোকগুলো সাহসী হয়ে ওঠে। আর এই নিয়ে কিছু করা মানে নবীনের বদ উদ্দেশ্যকে পাঁচ কান হতে দেয়া। আর শরণাগতকে আশ্বস্ত করা তো হিন্দুশাস্ত্রের বিধান। লোকগুলোকে অভয় দিয়ে এক ঢিলে দুটো নয়, তিনটে পাখি মারে নটবর। নবীনের ব্যাপারটা ধামাচাপা দেয়, হিন্দুধর্মের পালক হয়ে এই চামারগুলোর ভক্তি অর্জন করে এবং এদেরকে দিয়েই কিছুটা হলেও  নবীনের হেনস্তার প্রতিশোধের ব্যাবস্থাও  সে করে। ওদের অপরাধ একেবারে ছেড়ে দিলে ভয়টাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। মাথাটা ভালো খেলাতে পারে বলেই নটবর প্যাটেল লিডার।

দু’দিন পর দুপুরবেলা কোথা থেকে অদ্ভূত এক আওয়াজ, বীভৎস কান্নার মতো, করতে করতে ধর্মরাজ দৌড়ে আসে। ত্রস্তে ঘর থেকে বেরোয় হনসা। ধর্মরাজের চোখদুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। ‘শু থই ছে তন্নে !’ আর্তনাদ করে ওঠে হনসা। মুহূর্তের মধ্যে ধর্মরাজের নিথর শরীর হনসার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে।

দুপুরের খাবারে বিষ মিশিয়ে ধর্মরাজকে খাইয়েছিল কেউ।

স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে হনসা। লাবু ওকে ওর মতো থাকতে দেয়। শোক ভোলার সময় দেয়। কয়েক দিন হয়ে গেলেও হনসা ঘরের কাজকর্মে এগিয়ে আসে না। ছাগলগুলো চরাতে নিয়ে যায় না। লাবুর মনে হয়, সে আর পারছে না। রোটি বানানো, পানুরামের দেখভাল, মজদুরি করতে যাওয়া . . . সব সে একা সামলাবে? অতবড় মেয়ে, তার কোনো বিবেচনা নেই !  লাবুর কানে এসেছে, মহল্লার লোকজন  নানা কথা কানাকানি করছে হনসার সাথে নবীনের নাম জুতে দিয়ে। লাবু ভাবে, তার ধরম নেই, মানটুকুও গেছে। তার ওপর  একটা কুকুরের জন্য মেয়ের এত শোক! কুকুরের জন্য শোক, না আর কিছু? অনেকদিন ধরেই মেয়েটার মতিগতি সে বুঝে উঠতে পারছে না। নানা চিন্তায় জর্জরিত লাবু মেয়ের কাছে গিয়ে কঠোরস্বরে  বলে – ‘শু থই ছে তন্নে !’

মরুভুমির চাইতেও শুকনো চোখে মায়ের দিকে তাকায় হনসা। ততোধিক শুকনো স্বরে বলে – ‘কসু নথি’, কিছু না।

লাবুর প্রাণ ভয়ে কেঁপে ওঠে।

Comments

Popular posts from this blog

স্ত্রীর পত্র

কচুয়া শাড়ি দারাসিং লাফ