সুধাময়

 

বদলির অর্ডারটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকেন সুধাময়। অন্যান্য সহকর্মীরা আড়চোখে তাঁকে লক্ষ করে। এই বদলির আসল কারণ সকলেই জানে। সুধাময় দক্ষ কর্মচারি। সার্ভিস-রুলবুক তাঁর মুখস্থ। যেকোনো সমস্যায় ডিপার্টমেন্টের পিওন থেকে অফিসার – সকলে তাঁর পরামর্শ চায়। উদ্ভূত সমস্যার নিয়মমাফিক সমাধান কী হতে পারে - তাঁর কাছ থেকে জেনে নেয়। কাজে ফাঁকি দেন না সুধাময়, ফাইল আটকে রাখেন না। কোনো কাজই তাঁর টেবিলে জমে থাকে না। কাজ নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে কমপ্লেনের কোনো অবকাশই নেই। তবু কমপ্লেন তৈরি হল। আর্থাৎ  কমপ্লেন ম্যানুফেকচার হল।

কোনের টেবিলে বসে রূপক কর তাকিয়ে থাকে সুধাময়ের দিকে। রূপকের সাথে চোখাচোখি হতেই সুধাময় মুখে হাসি টেনে আনার চেষ্টা করেন। যা আসে, তা শুধু গাল আর ঠোঁটের পেশী মিলে   একসারসাইজের মতো কিছু হয়। কিন্তু তাই রূপকের কাছে যথেষ্ট। সে সিট ছেড়ে উঠে আসে। সুধাময়বাবুর টেবিলে এসে সামনের চেয়ারটায় ধপ করে এসে বসে পড়ে রূপক। বলে – এইটা  কী হইল সুধাময়দা!’

-‘জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ না করনের শাস্তি।‘

কথাটা ঠিকই। কিন্তু রূপক আস্বাস্তি বোধ করে। কে শুনে ফেলে কার কান ভারি করে ফেলে বলা যায় না। সর্বত্র নেতাদের চর রয়েছে। শেষে না সুধাময়বাবুর দশা হয়। রূপক বদলি হলে বিপাকে পড়বে। তার মেয়ে শিশুবিহারে পড়ে। বৌয়ের পোস্টিং বিজয়কুমার ইশকুলে। এমন কমফর্ট জোন থেকে নির্বাসিত হতে চায় না রূপক। সে কাজের অছিলায় কেটে পড়ে।  

সুধাময়বাবুও নিজের কাজে মন দেন। রোজকার মতো সব কাজ শেষ করে পাঁচটা বাজার একটু আগে দুটি অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে গিয়ে দাঁড়ান সেকশন আফিসারের কাছে। একটা            ভি.আর.এস.-এর আবেদন। আন্যটা তিনমাস ছুটির দরখাস্ত। সুধাময়বাবুর তিনিমাসের ছুটি পাওনা আছে।  

বাড়ি ফিরে মনীষাকে কথাটা বলতেই সে আর্তনাদ করে ওঠে – ‘ ভি.আর.এস! সংসার কেমনে চলব?’

-‘হোমিওপ্যাথি করুম।‘

-‘হোমিওপ্যাথি করুম!’ স্বামীর কথাগুলো ভেংচি কেটে পুনরাবৃত্তি করে মনীষা। আসন্ন অর্থকষ্টের চিন্তায় এমনই কাতর হয়ে ওঠে সে, দিগবিদিগজ্ঞানশূণ্য হয়ে অনর্গল বাক্যবাণে সুধাময়কে জর্জরিত করে তোলে – সুধাময় চিরকাল অপরিণামদর্শী, এখন টাকার অভাবে দোলনের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া মাঝপথে বন্ধ হতে পারে, সৌম্যকে ডাক্তারি পড়ানোর সম্ভাবনা সমূলে

                                                                                                                         

উৎপাটিত হল! …..না ভাবেচিন্তে ঝোঁকের মাথায় সিদ্ধান্ত নিয়ে সারাটা জীবন কী জ্বালান জ্বালিয়েছেন সুধাময় – তার লম্বা ফিরিস্তি দিতে থাকেন মনীষা। অফিস ফেরত সুধাময়ের এককাপ চা-ও যে জোটেনি, সেই খেয়াল থাকে না মনীষার।

চুপচাপ স্ত্রীর বকাবকি শুনতে শুনতে সুধাময় মনে মনে ভাবেন – ‘তোমারে বিয়াও করছিলাম ঝোঁকের মাথায়। যার খেসারত দিতে দিতে জীবন গেল।‘ তবে মনের কথা মুখে আনার সাহস করেন না। স্ত্রীর গঞ্জনা চুপচাপ সহ্য করার অভ্যাস হয়ে গেছে। মহিলা অত্যন্ত খরজিহ্বা। তায় অসম্ভব আয়েশি। চাকরি-বাকরির ধার দিয়েই গেল না। চাকরির পরিশ্রম পোষাবে না বলে। তার ওপর আবার শৌখিন। তার শখ মেটানোর জন্য সুধাময়কে চাকরি করতেই হবে। সুধাময় কিছুতেই বলতে পারবেন না – চাকরির অত্যাচার তার পোষাচ্ছে না।  বিয়ের শুরুতেই মনীষা বলে দিয়েছিল – একটু ভালোভাবে থাকতে চায়। জীবনযাপনের নানা আধুনিক উপকরণের প্রতি তার অসম্ভব আকর্ষণ। এল.ই.ডি. টিভি বাজারে আসতে না আসতেই কিনে দিতে হয়েছিল সুধাময়কে।

সুধাময় আবার উল্টো প্রকৃতির। ডালভাতে সন্তুষ্ট মানুষ। তাঁর জীবনধারণের আনন্দের উৎস শুধু ভিন্ন নয়, একেবারে বিপরীত। কাজেই বিবাহিত জীবনের শুরু থেকেই অমিল। অথচ প্রেম করে বিয়ে। ভালো ছাত্র হিসেবে কলেজে সুধাময়ের নামডাক ছিল। মনীষার মনে হয়েছিল, এই ছেলে ভবিষ্যতে শাইন করবে। ফিউচার প্রসপেক্টের কথা ভেবে মনীষাই সুধাময়কে নিজের দিকে টেনাছিল। সুধাময় সেই টানে এগিয়েছিলেন। কম বয়সে বুদ্ধিবিবেচনা পাকা হয়নি। ঝোঁকের মাথায়ই মনীষার ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। তা ছাড়া পরিবারের বৃত্তে মা-ঠাকুমা-দিদি-কে দেখে সুধাময়ের ধারণা হয়েছিল, মেয়েরা প্রকৃতিগতভাবে স্নেহশীলা হয়। তাদের সেবার হাত সংসারের সবাইকে সুখী করে। তারা অন্যের প্রয়োজনের অগ্রাধিকার দেয়। বাইরের জগতের উত্তাপ থেকে ছাতা দিয়ে পরিবারের লোককে রক্ষা করাই তাদের ধর্ম। মেয়েরা যদিও চাকরি-বাকরি করে, তাদের মূল ভূমিকা সুখী গৃহের নির্মাণে।

অত্যন্ত সেকেলে এই ধারণা প্রথম চোট খেয়েছিল মনীষার নানা আচরণে। কিন্তু বিয়ে যখন একবার হয়েই গেছে, তখন এই নিয়ে কচলে কী হবে! সুধাময় তাই চুপচাপ থাকাই স্থির করে নিয়েছিলেন। মনীষাকে ঝগড়ায় কেউ হারাতে পারে না।

পাশ করে বেশিদিন বেকার থাকতে হয়নি সুধাময়কে। ফুড অ্যান্ড সিভিল সাপ্লাই-তে ইউ.ডি ক্লার্ক হয়ে জয়েন করার দুই বছর পর মনীষাকে বিয়ে করেছিলেন। সুধাময়ের পরিবার যথেষ্ট সম্পন্ন। রামনগর তিন নম্বরে পুকুর সহ বাড়ি। এক দিদি। বিয়ে হয়ে গেছে। কাজেই মনীষার ভালোভাবে থাকার অসুবিধে হয়নি। চাকরি-বাকরি করতে চায়নি। সুধাময়ও ভেবেছেন – সেই ভালো।

মা-বাবা গত হয়েছেন, কয়েক বছর হল। এখন বাড়িটা সুধাময়ের একার। দিদি পৈত্রিক সম্পত্তির ভাগ চাইবে মনে হয় না। অতবড় বাড়িটা। আশেপাশে অনেক বাড়ি প্রমোটারকে দিয়ে ফ্ল্যাট হচ্ছে। সুধাময় সেসবের ধার দিয়েও যান নি। দিব্যি তো চলছে জীবন। তবে কেন ওসব  লোভে   পড়া!

সুধাময়ের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করার দিকে খুব ঝোঁক। এই নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করেন তিনি। রোগ নির্ধারিণ ভালো করেন। তাঁর ওষুধে রোগ সারে। তার ওপর কিনা বিনা পয়সায় চিকিৎসা করেন। তাই চেনাজানা অনেকেই তাঁর কাছে চিকিৎসার জন্য আসে। মনীষার মতে বিনা পয়সায় চিকিৎসা করাতে আসে ওরা। তাই সুধাময় যে ভাবছেন, ভি.আর.এস. নিয়ে হোমিওপ্যাথি করবেন, একবার পয়সা নেয়া শুরু করলেই আর রোগী জুটবে না।

-‘তাইলে বাড়িভাড়া আছে, প্রভিডেন্ড ফান্ডের টাকাও পামু,  …..পেনসন ….।‘

-‘হঁ!’ নাক দিয়ে এমন তাচ্ছিল্যের শ্বাস বার করে দিল মনীষা। তারপর স্থানত্যাগ করল।     ভাবখানা – পাগলে কী না বলে!

 বৌয়ের এমন ব্যবহার সুধাময়ের গা-সওয়া হয়ে গেছে। তবে চিকিৎসা এখনো বিনা পয়সাতেই করেন সুধাময়। মুখ ফুটে পয়সা চাওয়া আর কিছুতেই হয়ে উঠল না তাঁর। ভি.আর.এস. স্যাংশন হয়ে গেছে, এই বাঁচোয়া। অত সহজে হত না। অ্যাসোসিয়েশন যেরকম রেগেছিল তাঁর ওপর – নানা ফ্যাকড়া তুলে নাজেহাল করার জন্য কাঁকড়াবিছার মতো শুঁড় বাগিয়েছিল নেতারা। কিন্তু কিছু লোক মনে মনে সুধাময়কে শ্রদ্ধাভক্তি করে। তারা তলে তলে কলকাঠি নেড়ে ফাইলে ডাইরেক্টরের সই করিয়ে নিতে পেরেছিল। সরকারের থেকে পাওনাগণ্ডা আদায় হয়েছে সুধাময়ের। তবে পেনসন এখনো আটকে আছে। সে হবে’খন। সুধাময়ের দিব্যি চলে যাচ্ছে। পোস্টাপিসের এম.আই.এস।, ব্যাঙ্কের এফ.ডি. থেকে কোয়ার্টারলি ইন্টারেস্ট – এসব নিয়ে ভালোভাবেই চলে যাচ্ছে।

মুশকিল হল, মনীষার ভালোভাবে থাকার ভূত ঘাড় থেকে নামতেই চায় না। দিনযাপন যে আগের মতোই হচ্ছে, খাওয়া-পরায় যে কোনোও পরিবর্তন আসে নি, এখনো রবিবারের দুপুরে তিন রকমের মাছ খাওয়া হয়, সৌম্যও চারজন টিউটরের কাছে আগের মতোই যাচ্ছে – তবু মনীষা সন্তুষ্ট নয়। ও যা চায়, সেই চাওয়াকে আমল দেন না সুধাময়। ও চাইছে, বাড়িটা প্রমোটারকে দিয়ে দিতে। প্রমোটার ফ্ল্যাট বানাবে। গোটা চারেক ফ্ল্যাট সুধাময় মাগনা পাবেন। লাখ কয়েক টাকা ক্যাশও পাবেন। ব্যাস, সারাজীবন পায়ের ওপর পা তুলে থাকা যাবে। কোনো কাজ করতে হবে না আর।

সুধাময় বলেছিলেন, চারটে ফ্ল্যাট, লাখ কয়েক টাকা তাঁর চাই না। পায়ের ওপর পা তুলে জীবন কাটানোর স্পৃহা নেই তাঁর। যেঁ বাড়িতে জন্মেছেন, বড় হয়েছেন, যে পুকুরে সাঁতার কেটে, মাছ ধরে দিব্যি আমোদে কেটেছে কৈশোর-যৌবন, সেই বাড়িকে নিশ্চিহ্ন করে হাল ফ্যাশনের ফ্ল্যাটে তাঁর আগ্রহ নেই। ঠাকুর্দার আমলের বাড়ি। চার চারটি বড় বড় ঘর। উত্তরের দিকে দুই ঘর ভাড়াটেও আছে। বাবা দোতলাও বানিয়েছিলেন – অতিথি-অভ্যাগত এলে যাতে জায়গার অকুলান

                                                                                                                                          

না হয়। আজকাল তো পুরো দুতলা খালি পড়ে থাকে। অতিথি-অভ্যাগত দূরে থাকুক – দিদি পর্যন্ত আসে না।

মনীষার গায়ে বিছুটি লাগে। সে তীব্রভাবে বলে – ‘তোমার দিদি আসেন না, তার আমি কী করুম!’

আর কথা বাড়ান নি সুধাময়। লাভ নেই। মনীষা ভালো করেই জানে, দিদি কেন আর আসে না, কয়েক দিন বাপের বাড়িতে থেকে সুখের ভাত খেয়ে দিব্যি ছুটির আমেজ উপভোগ করতে কেন সে প্রতিবছর আসে না আর। মনীষার স্মৃতিশক্তি দুর্বল নয়। দিদির সাথে যেসব দুর্ব্যবহার করেছিল, সেই কথাগুলো সে ভুলে যায়নি নিশ্চয়। অযথা সেসব কথা টেনে এনে পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই। উল্টে কথার পিঠে কথা গেঁথে গরল শব্দমালাটি সুধাময়ের গলায় ঝুলিয়ে দেবে মনীষা।  কোনো কথাই তার মুখে আটকায় না। বিয়ের এত বছর পর সেদিন সে বলেছিল – মরতে সে বিয়ে করেছিল সুধাময়কে। তার কত ভালো ভালো বিয়ের সম্বন্ধ এসেছিল। ষোল বছরের ছেলের সামনে একথা বলতে বাধেনি তার। মনীষার কথা সাধারণত কানে নেন না সুধাময়। সেদিন কিন্তু মনটা বড় খারাপ লাগছিল তাঁর। কারণ মনীষার কথার মধ্যে যথেষ্ট সত্যতা ছিল। সে দেখতে খুব সুন্দর। সুন্দরী মেয়েদের সাধারণত ডাক্তার-ইঞ্জিনীয়র-অফিসার স্বামী জোটে। সুধাময় ইউ-ডি ক্লার্ক থেকে বড়বাবু হতে পেরেছিলেন মাত্র।

রোজ রোজ নূতন নূতন অশান্তি ডেকে আনে মনীষা। গতকাল থেকে সমানে বলছে, সুধাময় যেন এল.আই.সি-র এজেন্সি নিয়ে নেন। যে রোগীগুলো মাগনা ওষুধ নিয়ে যায় – অন্তত একটা করে ইন্সিয়রেন্স পলিসি নিতে আপত্তি করবে না। চক্ষুলজ্জার খাতিরে নিতে বাধ্য হবে।

-‘চক্ষুলজ্জা আমারও আছে। আমি ওদের কইতে পারুম না – একটা পলিসি নেন …..আমি এজেন্সি নিছি …..পয়সা রোজগারের একটা রাস্তা তো নিতে হইব! কী কন?’

এমন আবেদনের ভঙ্গীতে, প্রায় ভিক্ষা চাওয়ার মতো করে কথাগুলো বলেন সুধাময় – আন্য কেউ হলে তাঁর অভিনয়-প্রতিভা দেখে খুব আনন্দ পেত। কিন্তু মনীষার অসহ্য লাগে এই মশকরা। সিরিয়াস কথাতে মশকরা দু’চক্ষে দেখতে পারে না সে। কাজেই সারাদিন ধরে থেকে থেকেই গালাগালি খান সুধাময়। তিনি যতই স্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করেন – টাকাপয়সার অকুলান হবে না, ততই মনীষা নূতন নূতন যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে – আজ চলে যাচ্ছে, কিন্তু কাল চলবে না, আজ যে টাকাকে যথেষ্ট বলে মনে হচ্ছে, কাল তা নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর হবে। টাকার মান কীভাবে কমছে – সেকথাও তো মাথায় রাখতে হবে।

-‘ততদিনে দোলন-সৌম্য দাঁড়াইয়া যাইব।‘

সুধাময় আর মনীষার মধ্যে ভাবনার অমিলের আরেক জায়গা এটা। মনীষা ছেলেমেয়েদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কথা ভাবতেই পারে না। ছেলেমেয়েদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার সম্ভাবনাতে সে আতঙ্কগ্রস্ত হয়। এর কারণ মনে মনে আন্দাজ করেন সুধাময়। মনীষা তার মা-বাবার

                                                                                                                              

বৃদ্ধাবস্থায় কোনোদিন গিয়ে শুশ্রূষা করে নি। তার মা এখনো জীবিত আছেন। একেবারে অথর্ব হয়ে বেঁচে আছেন। আজকাল পারতপক্ষে বাপের বাড়ি যায় না সে। অথচ মা যখন কর্মক্ষম ছিলেন, জান দিয়ে করেছেন মেয়ের জন্য। মনীষা নিজে স্বার্থপর, তাই ধরে নিয়েছে – সন্তানরাও তাই হবে। কিন্তু সুধাময়ের বিশ্বাস আছে ছেলেমেয়েদের প্রতি। তাদের ওপর নির্ভরশীল হতে তাঁর আপত্তি নেই। আর আর্থিক নির্ভরশীলতা না থাকলেও অন্যান্য নির্ভরশীলিতা তো হবেই। অথর্ব অবস্থায় অসুখ করলে তো টাকা হাত ধরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে না!

সারাদিন ধরে অশান্তি থেকে বাঁচার জন্য সুধাময় আজকাল সকাল-বিকেল বাগানের পরিচর্যা করেন। গাছপালা আগে থেকেই ছিল। মায়ের হাতে লাগানো রাজঘণ্টা, বেলফুল, জুঁই, গন্ধরাজ। পরিচর্যা পেয়ে গাছগুলো খুব সতেজ হয়ে উঠেছে। রাজঘণ্টার গাছটা দু-তলার জানালা অব্দি উঠে গেছে। অজস্র ফুলে ছেয়ে আছে গাছ। ফুলের হলুদ রঙের আভা যেন চারপাশকে আলোকিত করে দিয়েছে। পথচারিরা যেতে যেতে ঘাড় ফিরিয়ে ফুলের শোভা দেখে তারিফ করে। পরিচিত লোক হলে দু’মিনিট দাঁড়িয়ে কথা বলে। গেটে দাঁড়িয়েই তাদের সাথে গল্প করেন সুধাময়। ভেতরে ডেকে এনে এককাপ চা খেয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করতে সাহস হয় না।

এসব কারণে মাঝে মাঝে বাড়িটাকে নিজের বাড়ি বলে মনে হয় না সুধাময়ের। বড় দুর্বল স্বাভাবের লোক তিনি। নইলে তিন পুরুষের বাড়িতেও অধিকার ফলাতে পারেন না! অথচ ক্ষেত্র বিশেষে তিনি দুর্বল নন। কর্মজীবনে দাপট খাটিয়েছেন। কেউ তাঁকে দিয়ে ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করাতে পারে নি। অ্যাসোসিয়েশনের সাথে গোলমাল হল তো তাই নিয়েই। রেশনশপওয়ালাদের ভুয়া রেশনকার্ড পেতে অসুবিধা হচ্ছিল। তেরো টাকা কেজির চাল, ষোল টাকা কেজির আটা, বাইশ টাকা কেজির চিনি দেড়-দুই গুণ দামে খোলা বাজারে বেচার জন্য উদ্বৃত্ত খাদ্যবস্তুগুলো আসে তো ওই ভুয়া কার্ডগুলার কল্যাণে। তবেই না পড়তায় পোষায়। নইলে রেশনশপের ডিলারশিপ মোটেই লাভজনক ব্যবসা নয়। এই ডিলারশিপ পাওয়ার জন্য বিস্তর কাঠখড় না হলে কেউ পোড়াত না। সুধাময়বাবু ভুয়া কার্ডগুলা আটকে দিচ্ছিলেন। রেশনশপের মালিকরা জায়গামতো কমপ্লেন করেছিল। তারা প্রতি মাসে চাঁদা দেয়। মোটা অঙ্কের চাঁদা বাধ্যতামূলকভাবে দেয়। তার বদলে নিজেরাও যদি দু’পয়সা বেশি কামাতে না পারে – তাহলে তাদের পোষাবে কেন!

তাদের কমপ্লেন যখন ঘুরে-ফিরে অ্যাসোসিয়েশনের পাণ্ডাদের কাছে আসে, তারা মোক্ষম মওকাটি পেয়ে যায়। সুধাময়বাবু অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের পাত্তা দেন না। এই ত্যাদড়ামির শাস্তি দেওয়ার জন্য পথ খুঁজছিল নেতারা। পথ পেয়ে গেল। মফঃস্বলে বদলি হয়ে গেলেন সুধাময়।

শিরিদাঁড়া সোজা রাখার এই চরিত্রবল পারিবারিক ক্ষেত্রে খাটাননি সুধাময়। বাইরের জগতের নিয়ম আর অন্তরের নিয়ম পরস্পরের বিপরীত – এটাই তাঁর বদ্ধমূল ধারণা। জ্ঞান হওয়া অবধি

                                                                                                                                   

পারিবারিক সম্পর্কগুলি যেভাবে আবর্তিত হতে দেখেছেন তিনি – তার ফলেই ধারণাটি তৈরি হয়েছিল। এখানে একে অন্যের প্রয়োজনটি বোঝে, বাবার কখন আরেক কাপ চা খাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে – মা টের পেয়ে যেতেন। ঠাকুমার নানা বাতিক নিয়ে খটাখটি করে ফুস্কুড়ি খুঁটে ঘা তৈরি করেননি মা। দিদির বিয়ে হলে জামাইবাবু কেমন বউয়ের আঁচলটি ধরেছিলেন – সুধাময় সেটি প্রত্যক্ষ করেছেন। দিদির থেকে নয় বছরের ছোট ভাইটির মনের জগতে তাই মেয়েদের যে রূপটি আঁকা হয়েছিল, তার স্নিগ্ধতার অনুভবে প্রথম আঘাত আসে মনীষাকে বিয়ে করার পর। সুধাময়ের ইমপ্র্যাকটিকাল দৃষ্টিভঙ্গী তার অসহ্য লাগে – বলে কি না, বেশি টাকা হলে ছেলেমেয়েরা মানুষ হবে না। তারা কর্মবিমুখ, অনুদার এবং অনুকম্পাহীন হবে। এমন অবুঝ মানুষকে নিয়ে মনীষার অসম্ভব সমস্যা। সে উঠেপড়ে লেগেছে – সুধাময়কে বোঝাতে, সময়ের সাথে তাল রেখে চলা কত যে জরুরি।

মনীষা যতই মুখর হয়ে ওঠে – সুধাময় ততই একেবারে চুপ হয়ে যান। বিয়ের আগে যে মুক্তি ছিল জীবনে, তার জন্য প্রাণে তাঁর হাহাকার ওঠে। মনীষার সব যুক্তি, বাড়িটা প্রমোটারকে দেওয়ার জন্য নানা চাপ তিনি মনে মনে অগ্রাহ্য করেন। তর্ক করেন না, কারণ তাঁর সব যুক্তি মনীষা অযৌক্তিক প্রমাণ করে ছাড়বে। এই পুরোনে বাড়ির প্রতি সুধাময়ের মায়াকে বলবে আহ্লাদি। আহ্লাদিপনা অসহ্য লাগে মনীষার। দাম্পত্যের গরমিল দিন দিন বাড়ে।

বিয়ের চব্বিশ বছর পর দাম্পত্যে যখন এত অমিল – তখন তার ভূমিটি হয়ে ওঠে পোড়ামাটির মতো বন্ধ্যা। এখানে কাঁটাগাছ পুঁতলেও বাঁচে না। সুধাময় আর মনীষা যার যার আপন বৃত্তের ঘেরেটোপে থেকে দিনযাপন করেন।

তবে সুধাময়ের বাগান আছে। হোমিওপ্যাথি আছে। তাঁর বাগানের চম্পাফুল সন্ধের পর সারা পাড়াকে গন্ধে উদাস করে। তাঁর ওষুধ খেয়ে বেতো রোগী, কাশ-রোগী, ক্রনিক পেটরোগী আরোগ্য লাভ করে। মুখে মুখে সুধাময়ের নাম ছড়ায়। রোগীর সংখ্যা বাড়ে।

একদিন রূপক ফোন করে। তার ছোটমাসিকে নিয়ে আসতে চায়। মাসির অনিদ্রা রোগ। সন্ধ্যার পর মাসিকে নিয়ে আসতে বলে দেন সুধাময়।

রূপকের ছোটমাসিকে দেখেই চিনতে পারেন সুধাময়।

-‘তুমি নিরঞ্জনা না?’

-‘হ। ….মনে আছে?’

-‘মনে থাকব না ক্যান?’

সুধাময় যখন থার্ড ইয়ারে, নিরঞ্জনা তখন ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছিল। সুধাময়কে এক ডাকে

                                                                                                                         

সকলে চিনত। তাই নিরঞ্জনাও চিনবে – সেটাই স্বাভাবিক। তবে নিরিঞ্জনার মতো এমন সাধারণ ছাত্রীকে যে সুধাময় এত বছর পরেও চিনতে পেরেছেন – তাতে সে অবাক হয়।

নিরঞ্জনার কথা শুনে মিটিমিটি হাসেন সুধাময়। এটা তো আর বলা যায় না – রোগা, খুব কালো এবং দাঁত-উঁচু নিরঞ্জনার চেহারা এখনও প্রায় আগের মতোই অবিকল আছে।

-‘আগে চশমা পরতা না।।……নাইলে কোনো পরিবর্তন নাই!’

নিরিঞ্জনা অবাক হয়। সে যে আগে চশমা পরত না, সেকথা পর্যন্ত মনে আছে সুধাময়ের! তাকে তো সাধারাণত কেউই মনে রাখে না। ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার মতো মানুষ সে। মন দিয়ে লেখাপড়া করেছিল বলে বেঁচে গেছে। জন্ম থেকেই সে সবার মুখে শুনেছে – ‘এই মাইয়ারে পার করন যাইব না!’ পার করা মানে যে বিয়ের ব্যবস্থা করা – এটা বুঝিয়ে দিয়েছিল কেউ একজন। আরেকটু বড় হয়ে নিরঞ্জনা নিজেই বুঝেছিল, লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো ছাড়া অন্য কোনো রাস্তা নেই তার।

-‘তুমি কি কর?’

-‘মাস্টারি করি। নন্দননগর ইশকুলে।‘

রূপক বলে – ‘ছোটমাসি হেড মিসট্রেস।‘

-‘তো কী আসুবিদা?’

-অসম্ভব অ্যাসিডিটি। আইজকাল জল খাইলেও অ্যাসিড হয়।‘

-‘কিছু ওষুধ খাও?’

-‘অ্যালোপ্যাথি করাইছি। সাময়িক কাজ হয়। কয়দিন একটু ঠিক থাকি। তারপর আরো বেশি অ্যাসিড হয়।‘

-‘টেনশন কর নি?’

-‘টেনশন তো আছেই। রোজ রোজ পঞ্চায়েত থাইক্যা ঝামেলা করে। মিড-ডে মিলের মনগড়া খুঁত ধরে। ইশকুলের পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম নিয়া গিয়া খারাপ কইর‍্যা দিছে। শাশক দলের ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা আইয়া হাঙ্গামা করে – ফেইল ছাত্ররে পাশ করাইতে কয়। স্যার-দিদিমণিরা ঠিকমতো ক্লাস করেন না। .....কিন্তু কিছু বলা যায় না ......অ্যাসোসিয়েশনের ডর দেখায়। নতুন এক ক্লার্ক এসেছে বদলি হয়ে। কিচ্ছু কাজ জানে না। জিজ্ঞাসা করলাম...এতোদিন ধরে কীভাবে চাকরি করছে। কয়, এতদিন যেখানে আছল, কাজ করতে হত না। ‘জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ’ করলেই হইত!’

                                                                                                                                        

একশ্বাসে কথাগুলো বলতে বলতে হঠাৎ থেমে যান নিরঞ্জনা। তাঁর হাঁফ ধরে গেছে। তিনি ঘন ঘন শ্বাস টানেন। ব্যাপারটা লক্ষ করেন সুধাময়। বোধ হচ্ছে হার্টেরও সমস্যা আছে।

রূপকের দিকে তাকিয়ে সুধাময় বলেন – ‘সর্বত্রই এক চিত্র। কাম করব না, অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের কথায় উঠব বসব, তাইলেই সাতখুন মাপ!’

-‘চাকরির বাইরে কিছু কর?’

-‘যেমন?’

-‘কিছু হবিটবি আছে?’

-‘আমার খুব বেড়ানোর শখ। সুযোগ পাইলেই ঘুরতে যাই গা।‘

-‘ছোটমাসির খুব বাগানের শখ। বাড়িতে সুন্দর বাগান করছে।‘

-‘হ। সকালে ঘণ্টাখানেক বাগানে কাজ করি।।......আপনার বাগানটাও দেখলাম। গাছগুলা খুব তাজা।‘

নিজের গাছের প্রশংসা শুনে সুধাময় খুশি হন। আজকাল তাঁর বাড়ি চেনাতে হলে লোকে দূর থেকে দেখিয়ে দেয় – ‘ওই যে ঘণ্টাফুলও’লা বাড়িটা...।‘ গাছটা কে লাগিয়েছিলেন, মা না ঠাকুমা, ঠিক মনে করতে পারেন না সুধাময়। খুব সম্ভবত ঠাকুমা। অর্থাৎ দুই পুরুষ আগের গাছ, একটু যত্ন পেয়ে কী ফুল যে দিচ্ছে! মনীষা ফ্ল্যাট ফ্ল্যাট করে মাথা খেয়ে নিচ্ছে। ফ্ল্যাট বানাতে গেলে কেবল ঘণ্টা ফুলের গাছ নয়, নারকেল গাছ, আমগাছ, অড়বরই গাছ, অত উঁচু চম্পা গাছ, গেটের কাছে শিউলি ফুলের গাছ – সব কাটা পড়বে। সবই তিন পুরুষ আগের গাছ। মনীষা এসব কথা এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দেয়। নির্বোধরাই নাকি এরকম সেন্টিমেন্টাল হয়।

তিনপুরুষের গাছের চাইতে সর্বাধুনিক ঝাঁ-চকচকে ফ্ল্যাট কীভাবে বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে – এটা কিছুতেই বুঝতে পারেন না সুধাময়। নির্বোধ বইকি। পুকুরপাড়ে একটা খুব পুরোনো আমড়াগাছ আছে। আজকাল বেশি আমড়া ধরে না। কিন্তু যে ক’টা ধরে – এমন মিষ্টি, আমকেও হার মানায়। যখন আমড়া পাকে – বাতাস ম’ ম’ করে গন্ধে। অথবা আমের মুকুলের গন্ধ, অথবা পশ্চিম সীমানার কামরাঙ্গা গাছে যখন কামরাঙ্গা পাকে – টিয়ার দল হামলে পড়ে পাকা ফলে। এত সব নষ্ট করে ফ্ল্যাট বানানোর কথা ভাবতেই পারেন না সুধাময়। কিন্তু দিন দিনই চাপ বাড়ছে। আগে মনীষা একা ঘ্যানর ঘ্যানর করত। এখন ছেলেও বলছে – ‘বাবা, ফ্ল্যাট কত সুন্দর।‘

গন্ধে গন্ধে এসে হাজির হয়েছে প্রমোটার। কত রকমের লোভ যে দেখাচ্ছে। নগদ টাকা দেবে, পনর’শ স্কোয়ার ফিটের চারখানা ফ্ল্যাট দেবে ......সামনে-পেছনে লন, গ্যারেজ ....।গাছ নিয়ে অত চিন্তা করার কী আছে! গাছ লাগিয়ে দেবে প্রমোটার।

                                                                                                                            

এত চাপ অসহ্য লাগে সুধাময়ের। ইচ্ছে করে – বিবাগী হয়ে চলে যান। কিন্তু সামনেই ছেলেটার বোর্ডের পরীক্ষা।

এরকম ভারাক্রান্ত এক সকালে নিরঞ্জনার ফোন আসে। বিকেলে সুধাময় বাড়ি থাকলে সে একটু আসতে চায়।

-‘আইও। ....ছয়টার পরে আইও।‘

ছ’টার পর আরো কয়েকজন রোগীকে আসতে বলেছেন সুধাময়।

ছ’টার জায়গায় পৌনে সাতটা হয়ে গেল নিরঞ্জনার। এসে দেখেন – তাঁর আগে চিরজন রোগী রয়েছে। তাদের হয়ে গেলে নিরঞ্জনার ডাক আসে। সুধাময় জিজ্ঞাসা করেন – ‘ওষুধে কাজ দিতাছে?’

-‘হ। রোজ অ্যাসিড হয় না। মাঝে মাঝে হয়।‘

-‘যেদিন অ্যাসিড হয়, মনে রাখবা, কী কী খাইছিলা। ....একলগে বেশি পেট ভইরা খাও না তো?’

-‘না।

-‘ঘুম?’

-‘ভালোই ঘুমাই। ....ঘুমাইতে যাওনের আগে ঈষদুষ্ণ জলে ক্যালিফস খাইয়া ভালো ফল পাইতাছি।‘

-‘ইশকুলের খবর কী?’

-‘ইশকুল চলতাছে ইশকুলের মতো।‘

-‘চলুক না। ...বেশি মাথা ঘামানোর কাম কী?’

-‘সব ব্যাপার ছাইড়াও দেওন যায় না। .....লেখাপড়ার দিকটা তো ছাড়ন যায় না। এই যে নিয়ম হইছে, ক্লাস এইট পর্যন্ত সব পাশ, নাইনে উঠলেই ফেইল করা শুরু করে। ক্লাস টু-র বিদ্যাও নাই, তবু প্রমোশন দিতে হইব। না দিলে ছাত্র-নেতারা আইয়া হামলা করে। সহ্য হয়?’

-‘আরুণির মতো আইলের উপরে শুইয়া বানের জল আটকাইতে পারবা?’

নিরঞ্জনা চুপ করে থাকেন। মনে মনে ভাবেন – সুধাময় নিজে চাকরি করার সময় যা যা করেছেন, তা তো আলের ওপর শুয়ে বেনোজল আটকানোর চেষ্টাই। কেন তিনি ভি.আর.এস. নিলেন, সেই গল্প রূপকের থেকে শুনেছেন নিরঞ্জনা। সুধাময় কি নিজের কার্যকলাপকে ভুল

                                                                                                                         

মনে করেন এখন? যে মূল্যবোধকে আঁকড়ে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন নিরঞ্জনা – সেটা কি অনর্থক? আপনজন সকলেই নিরঞ্জনাকে বলে – একলা কিছু বদলানো যায় না। তিনি পঞ্চায়েত নেতাদের অন্যায় আবদার, শাশকদলের মদতপুষ্ট ছাত্রনেতাদের বাঁদরামি বরদাস্ত করেন না। তিন বছরে দু’বার বদলি হয়েও ঘাড় সোজা রেখেছেন – কী লাভ হচ্ছে তাতে? নিরঞ্জনার মনে হয়েছিল, সুধাময় তাঁর কথাটা বোঝেন। সুধাময়ের মধ্যে একজন দরদি মানুষকে কল্পনা করে মনে মনে তাঁর সাথে কত সংলাপ করেন নিরঞ্জনা। সকালে ফুলবাগানে কাজ করতে করেতে তাঁর মুখে যে হাসির রেখা ফুটে ওঠে – তা তো এই দরদি মানুষের সঙ্গে কাল্পনিক কথোপকথনের বহির্প্রকাশ। পঞ্চাশ বছর বয়সে এসে আঠারোর সংরাগে নিষিক্ত হয়ে ওঠার নিভৃত যাপন নিরঞ্জনাকে আনন্দিত করেছিল। নিরঞ্জনার অসুন্দর অবয়বের ভেতরে যে অশেষ ভালোবাসা রয়েছে, বুকের পিঞ্জরে যে পূর্ণিমা লুকোনো আছে – যার খোঁজ কেউ রাখে না, সুধাময়কে ঘিরে তা উদ্বেলিত হয় আজকাল। নিরঞ্জনা প্রাণ দিয়ে আগলে রাখবেন এই ভাবনাকে। কেউ জানবে না এই গভীর অনুরাগের খবর। কারোর জীবনে অনর্থ ডেকে আনার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই তাঁর। তিনি বিশ্বাস করেন – যে সংরাগ কল্যাণের পথে চালিত করে না, তাকে প্রশ্রয় দিতে নেই। সুধাময়ের আজকের কথায় মনে মনে অবিন্যস্ত হয়ে পড়েন নিরঞ্জনা। তাঁর নিজের এবং সুধাময়ের ভাবনার জগতটি একই রকমের, এই মিলটি আবিষ্কার করেই তো নিরঞ্জনা এক কাল্পনিক সধর্মিতার ভুবন রচনা করে বড় আনন্দিত হচ্ছিলেন।  

নিজের চিন্তায় এতটাই অভিনিবিষ্ট ছিলেন নিরঞ্জনা, সুধাময় যে উত্তরের জন্য মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন, সে কথা খেয়াল থাকে না।

-‘কি হইল?’

-‘খুব সমস্যা। বুঝলেন?’

আজকাল স্কুল মেনেজমেন্ট কমিটি বলে একটা বস্তু হয়েছে। তারাই স্কুল চালায়। পঞ্চায়েত প্রধাণ সেই কমিটির সেক্রেটারি। কমিটিতে গার্জিয়ানরাও থাকেন। তারা স্কুলের সব ব্যাপারে নাক গলান। স্কুল-মাস্টাররা সময়মতো আসছেন কি না, ঠিকমতো পড়াচ্ছেন কি না, ডিসিপ্লিন মানা হচ্ছে কি না, সব দেখেন তারা। বিশেষ করে যে কোনো গ্রান্টের টাকা খরচ করার ব্যাপারে তারা খুব তৎপর। পারচেজ কমিটিতে তাদের লোকেরা থাকে। স্কুলের শিক্ষকরাও থাকেন। কেনাকাটার দায়িত্ব এই কমিটির। পঞ্চায়েত প্রধাণ যখন দেখলেন, ফলস ভাউচার তৈরি করানো যাচ্ছে না – তখন থেকে কেনাকাটার সময় পঞ্চায়েতের লোক আর সঙ্গে যায় না। না গেলে নেই। কিন্তু মুশকিল হল, ভাউচারের পেছনে এস.এম.সি. সেক্রেটারির সই দরকার। সেই সই তিনি করছেন না। ডিসিপ্লিন দেখার নাম করে বেছে বেছে সেইসব ছাত্রদেরই হয়রাণ করা হয়, যাদের মা-বাবার রাজনৈতিক চিন্তাধারা ভিন্ন। একটি ছেলে, খুবই গরিব, ইউনিফর্মের প্যান্টটা আছে, শার্ট ছিঁড়ে গেছে। নূতন শার্ট কেনার জন্য দিন সাতেক সময় চেয়েছিল। নিরঞ্জনা ওকে ওই ছাড়টুকু    

                                                                                                                           

দিয়েছিলেন। ছেলেটা লেখাপড়ায় মনোযোগী, সে ক্লাস মিস করুক, সেটা তিনি চান নি। ব্যাস, কমপ্লেন হল – নিরঞ্জনা ডিসিপ্লিনের ব্যাপারে মনোযোগী নন। কয়েকদিন আগে ডায়রেক্টরেটে মিটিংয়ে উপস্থিত থাকার জন্য নিরঞ্জনা স্কুল থেকে বেরিয়েছেন, রাস্তায় এক মেম্বার তাঁকে দেখেছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে কমপ্লেন চলে গেল – তিনি পুরো সময় স্কুলে থাকেন না।

‘সর্বক্ষণ আমার পিছনে লাইগ্যা আছে। আমি কি আমার অবস্থান থাইক্যা সইরা যাইমু? ওই চোরগুলার হাতে সব দিয়া দিমু? পঞ্চায়েতের সেক্রেটারি, বাংলায়ও ঠিকমতো সই করতে পারে না, সে চালাইব ইশকুল?’

সুধাময় অবাক হন। তিনি ভাবতেন, জুয়াচুরিগুলো সিভিল সাপ্লাই, পি.ডবলু.ডি – এইসব ডিপার্টমেন্টেগুলাতেই সীমিত। তা যে নয়, রোগটা যে সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে – বুঝতে বাকি থাকে না তাঁর।

নিরঞ্জনার জন্য মায়া হয় সুধাময়ের। সেই মায়া তাঁর চোখে ফুটে ওঠে। নিরঞ্জনা চোখের ভাষাটি পড়ে নেন। সুধাময় ওষুধের পুরিয়া বানাতে মনোযোগ দেন। খুব নীরব হয়ে পড়ে পরিবেশ। এই নীরবতার সুযোগে আবেগে টলমল করে প্রৌঢ়া এক নারী। সময়মতো যা ঘটে নি জীবনে – অসময়ে তা ঘটতে দেয়া যাবে না কিছুতেই। নিরঞ্জনা নিজেকে শাসন করেন।

ওষুধের পুরিয়াগুলো নিরঞ্জনার হাতে দিতে দিতে সুধাময় বলেন – ‘সামার ভেকেশনে যাইতাছ কোথাও?’

-‘না। এইবার কোনোও ব্যবস্থা হইল না।‘

-‘আমার লগে কুম্ভমেলায় যাইবা?’

-‘মনীষাদি যাইব?’

-‘তারে তো কই নাই।‘

-‘আপনার কি মাথা নষ্ট হইছে!’

সুধাময় ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। এর মধ্যে মাথা নষ্টের কী হল বুঝতে পারেন না। তিনি কি বেফাঁস কিছু বললেন? মুদ্রাদোষে মাথা চুলকান সুধাময়।

-‘আমি যাই। আর দেরি হইলে অটোটটো কিচ্ছু পামু না।‘

বাড়ি এসে সটান বিছানায় শুয়ে পড়েন নিরঞ্জনা। এ কেমন আমন্ত্রণ এল আজ? সুধাময় তাঁকে কী ভাবেন? তিনি কি এতই সস্তা, যে ডাকলেই ছুটে যাবেন? কিন্তু ওরকম ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা? মাথা চুলকানোর অপ্রস্তুত মুদ্রা? তার কিছুক্ষণ আগের সেই মায়াময় দৃষ্টি?

                                                                                                                                    

নিরঞ্জনার মাথার ভেতরে এক নিম্নচাপের অনুভূতি হয়। বড় ফাঁকা লাগে সবকিছু। বড় অসহায় লাগে।

অসহায় লাগে সুধাময়েরও। নিরঞ্জনা ভুল বুঝল। মানুষের পরিচয় কেন লিঙ্গোত্তীর্ণ হয় না – এ নিয়ে বড় আপশোষ হয় তাঁর। বুড়ো হয়ে গেলেন, তবু পুরুষ বলে কোনো মহিলাকে বন্ধুত্বে বরণ করতে গেলেই সমস্যা হয়ে যায়। মানুষের দৃষ্টি একটু খোলা, উদার হবে না কোনোদিন? যতই ফ্ল্যাটবাড়িতে আধুনিক জীবনযাত্রা হোক না, মনের আধুনিকতার, মুক্তির কোনো সম্ভাবনা নেই!

মুক্তির জন্য বড় ব্যাকুল বোধ করেন সুধাময়। মনীষা অনবরত চাপ দিয়েই চলেছে। ছেলেটাও বলছে – বাড়িটা প্রমোটারকে দিতে। ও ছেলেমানুষ। কী করে বুঝবে, এই বাড়ির মজবুত ভিত আর লোহার মতো শক্তপোক্ত দেয়ালের মূল্য! চারপাশের ফ্ল্যটবাড়ির চাকচিক্য দেখে সেও মায়ের পক্ষ নিয়েছে। ক’দিন পর মেয়েও আসছে ছুটিতে। ও এলে মনীষার জোর আরো বাড়বে। এত চাপ অগ্রাহ্য করা কঠিন হবে। এর থেকে মুক্তির উপায় খোঁজেন সুধাময়। মেয়ে এসে পৌঁছোনোর আগের দিন তিনি নিরুদ্দেশ হন।

এই নিয়ে পরিবারে আলোড়ন ওঠে। আত্মীয়স্বাজনরা একে অপরকে বলে – মনীষা সুধাময়কে শান্তি দেয়নি কোনোদিন। এ কথাটা কেউ বোঝে না, শান্তি মনীষাও পায় নি। জ্ঞান হওয়া অবধি সে শুনেছে, তার ভালো ঘরে-বরে বিয়ে হবে। কারণ সে দেখতে অসম্ভব সুন্দর। বোধ-বুদ্ধি জাগ্রত হওয়ার সময় থেকেই সে তৈরি হয়েছিল এমন একটা জীবনের জন্য – যা জেল্লা ছড়াবে। তার সেই আকাঙ্ক্ষাও যে অপূর্ণ রইল, এ কথা কেউ বুঝল না। এখন তো সুধাময়ের গৃহত্যাগের জন্য সবাই তাকেই দায়ী করছে। মনীষাও অন্তরে পোড়ে।

গেলেন কোথায় সুধাময়? কেউই কিছু ঠাহর করতে পারে না। কেবল নিরঞ্জনা আন্দাজ করেন – নির্ঘাৎ কুম্ভমেলায় গেছেন সুধাময়। কিন্তু সেকথা কাউকে বলতে গেলে অনেকের ভুরুতেই ভাঁজ পড়বে। যে কথা কেউ জানে না, তা কেবল নিরঞ্জনা জানেন? কেন? কীভাবে? কোন নূতন সম্পর্কের ইঙ্গিত এটা?

তাই চুপ করে থাকেন নিরঞ্জনা। কিন্তু তাঁর অন্তরে মহা কোলাহল ওঠে। সুধাময় তাঁর নিরুদ্দেশ যাত্রায় নিরঞ্জনাকে সঙ্গী হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই ডাকে সাড়া দিলে কী এমন অনর্থ হত? লোকে নিন্দে করত। একটা মুখরোচক কেলেঙ্কারি হত। কিন্তু প্রাত্যহিক যে বিপর্যয়গুলো জেরবার করছে তাঁকে, তার থেকে কিছুদিনের জন্য হলেও তো মুক্তি পাওয়া যেত। স্কুল-ম্যানেজমেন্ট কমিটি এমন পেছনে লেগেছে, রোজ রোজ নতুন অভিযোগ তৈরি হচ্ছে তাঁর বিরুদ্ধে। ডিপার্টমেন্টাল ইনক্যুয়ারি হচ্ছে, একটি বিশেষ দোকান থেকেই কেন অ্যানুয়াল স্পোর্টসের প্রাইজ কেনা হয়েছে পর পর তিন বছর। তার পেছনে কার স্বার্থ কাজ করছে ..... এইসব অভিযোগের তত্ব-তালাশ হচ্ছে। মনে হচ্ছে আরেকটা বদলি হবে। এবারের লাথিটি তাঁকে কোথায় নিয়ে ফেলে কে জানে। এসব অনিশয়তা থেকে, ভিত্তিহীন সব অভিযোগ – যা প্রমাণ

                                                                                                                                        ১৩

করতে চায়, নিরঞ্জনা দুর্নীতিগ্রস্ত; এই যন্ত্রণাকর পরিস্থিতি থেকে, যখন জানা হয়ে গেছে – মানুষের হৃদয় যাদের খাদ্য, তারাই এখন সবকিছুর কর্ণধার, উদ্ধারের কোনো পথ সমনে নজরে আসছে না, তখন কুম্ভমেলার জনস্রোতে মিশে গিয়ে প্রাণের আরাম খুঁজে পাবার পথ হয়তো জুটে যেত।

ভাবলে হাসি পায়, দুর্নীতিবাজ কতগুলো লোক দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে নেমেছে। সারা জীবন সোজা পথে হেঁটেছেন নিরঞ্জনা, এখন মনে হচ্ছে, সোজা পথে হাঁটার দিন শেষ হয়েছে।  সারা জীবনের অর্জিত ক্যারেক্টার সার্টিফিকেটে কাজ নেই তাঁর।এখন তিনি বাঁকা পথে হেঁটে দেখবেন, পৃথিবীটা কীরকম। উচিত-অনুচিতের সংজ্ঞা বদলাবেন তিনি। কিছুদিন আগে নিরঞ্জনার মনে হয়েছিল – সুধাময়ের আহ্বানে সাড়া দেওয়া অনুচিত হত। আজ তাঁর মন উল্টোপথে হাঁটে।

উল্টোপথে হাঁটতে হাঁটতে নিরঞ্জনার মনে হয়, যেসব কারণে চাকরিক্ষেত্রে তিনি জেরবার হচ্ছেন, সোজা রাস্তায় তার সমাধান অসম্ভব। তিনি বাঁকা পথে সমস্যার মোকাবেলা করবেন। স্কুল মেনেজমেন্ট কমিটির সেক্রেটারি অরবিন্দ লস্কর এক নম্বরের দুর্নীতিবাজ একটা লোক। একে ঘায়েল করবেন নিরঞ্জনা। পরে কী হবে না হবে, এসব ভাবনা মুলতুবি রেখে কাজে নেমে পড়েন তিনি।

স্কুলে সবসুদ্ধ সাতজন মিড ডে মিল কুক-কাম-হেল্পার আছে। তাদের একজন অরবিন্দ লস্করের স্ত্রী। মিড ডে মিল-এর কুকদের নিয়োগ হয় পঞ্চায়েত থেকে। এবং নিয়ম আছে, আর্থিক অবস্থা খারাপ, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, সিডিউল কাস্ট, এই রকমের মহিলাদের এই কাজে নিয়োগ করা হবে। অরবিন্দ লস্করের স্ত্রী এসব মাপকাঠিতে কিছুতেই এই কাজ পেতে পারে না। অরবিন্দ লস্করের স্ত্রী একদিনও স্কুলে আসে না। অন্যরা তার কাজ করে দেয়। মহিলা ঘরে বসে মাসের পর মাস মাইনে পায়। এতদিন এসব নিয়ে কথা ওঠান নি নিরঞ্জনা। এবার ওঠাবেন। কাগজে-কলমে এই নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন তিনি। এর ফলে নির্ঘাৎ রাতারাতি তাঁর বদলি হবে। তখন নিরঞ্জনা কোর্টে যাবেন। অভিযোগ আনবেন – দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে গেছেন বলেই তাঁকে বদলি করা হয়েছে।

ঠিক সুতোটি ধরে টান মারতেই অনেকের টনক নড়ে। তারা চামড়া বাঁচাতে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। অরবিন্দ লস্কর একা ফাঁসবে – এমন কাঁচা লোক সে নয়। ওদের অবস্থা দেখে নিরঞ্জনার আনন্দ হয়। নিজের ওপর ভরসা বাড়ে।

মাঝে কয়েকদিন ফুলগাছের যত্ন করা হয়নি। আজ খুরপি নিয়ে গাছগুলার পরিচর্যা করতে বসেন নিরঞ্জনা। মাত্র সকাল হয়েছে। বাতাস খুব তাজা। পাতাবাহারগুলো সোনালি রোদে ঝলমল করছে। গন্ধরাজে কুঁড়ি এসেছে। মন বড় খুশি লাগছে। এমন সময় গেট খোলার শব্দ হয়। নিরঞ্জনা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন – এত সকালে কে এল। সুধাময়কে দেখে নিরঞ্জনার দুই চোখে হাসি ঝলমল করে।

                                                                                                                        

-‘কবে ফিরলেন?’

-‘কাইল সন্ধ্যার সময়।‘

সুধাময় অপেক্ষা করেন, নিরঞ্জনা জিজ্ঞাসা করবেন – কোথায় গিয়েছিলেন তিনি। এই অবধারিত প্রশ্নের জন্য কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। কিন্তু নিরঞ্জনা কিছুই জিজ্ঞাসা করে না। সুধাময় বলেন – ‘কোথায় গেসলাম, জিগাইবা না?’

-‘কম্ভমেলায় গেসলেন তো? কেমন ঘুরলেন?’

সুধাময়ের অবাক লাগে। নিরঞ্জনা ঠিকই ধরেছিল – কোথায় গেছেন তিনি। কিন্তু কাউকে বলে নি একথা।‘

-‘চা করি?’

-‘হ।‘

সেদিন সুধাময় নিরঞ্জনাকে কুম্ভমেলায় সঙ্গী হতে বলেছিলেন। পরে তিনি বুঝেছিলেন, এভাবে বলা ঠিক হয়নি। নিরঞ্জনা নির্ঘাৎ ভুল বুঝেছে তাকে। এই ভুল ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন সুধাময়। তাই তিনি আজ বলতে এসেছেন – তাঁর মনে কোনো দুরভিসন্ধি ছিল না। তিনি নিরঞ্জনার অভিব্যক্তিতে যে আর্ত মানুষকে দেখেছিলেন সেদিন, অনুরূপ আর্ত মানুষের মিছিল তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন ছয় বছর আগে নাসিকের অর্ধকুম্ভে। অগনিত নরনারীর মুখে সেই বেদনার্ত অভিব্যক্তি, অমৃতযোগে স্নান করে তার থেকে পরিত্রাণের আকুতি সুধাময়কে দ্রব করেছিল। এই ভিড়ে মিশে গেলে নিজের একান্ত কষ্টের বোধ অকিঞ্চিৎকর মনে হয়। তাই তিনি নিরঞ্জনাকে এই অভিজ্ঞতায় সামিল হবার জন্য ডেকেছিলেন। সুধাময় কুম্ভমেলায় স্নান করেন নি। সেবারের গোদাবরীতেও না, এবারের রেবাতেও না। তিনি স্নান করেছেন জনস্রোতে। এ এক অন্য স্নান। শোক ভোলানো এক অভিজ্ঞতা। এতে দৈনন্দিন জীবনের তিক্ততাকে অন্য নিরিখে দেখার তৃতীয় নয়ন লব্ধ হয়। নিরঞ্জনার সঙ্গে কথাবার্তা বলে ভালো লেগেছিল সুধাময়ের। মনে হয়েছিল – এই নারী বুদ্ধিমতী। তাকে সাহায্য করার ইচ্ছে হয়েছিল সুধাময়ের। শুধু ওইটুকুই।

-‘ভুল বুঝি নাই তো!

সুধাময়ের বড় নির্ভার লাগে। চা খেতে খেতে নিরঞ্জনা শোনেন মেলার গল্প। টি.ভি.-তে তিনি দেখেছেন, নদীতীরে হাজার হাজার তাঁবু খাটিয়ে গড়ে ওঠা কুম্ভনগরী। কোন অতীতে অমৃতকুম্ভ নিয়ে পলায়নরত দেবতারা একটু বিশ্রামের জন্য পূর্ণকুম্ভটি ঘাড়ের থেকে কিছুক্ষণ নামিয়ে রেখেছিলেন যেসব স্থানে, সেখানে কয়েক ফোঁটা অমৃত ছলকে পড়েছিল। সেই ছলকানো অমৃত বারো বছর পর পর বিশেষ ক্ষণে আজো উত্থিত হয়। তাই লক্ষ লক্ষ মানুষ ছুটে যায় সেই

                                                                                                                                      

অমৃতের পরশের অভিলাষে। সত্য হোক বা না হোক, এ বড় মনোরম কাহিনী।

-‘আমাদের মাইথলজিগুলা বড় সুন্দর – ক’ন?’

-‘হ। আমি উঠি। তোমার তো ইশকুল আছে।‘

-‘ইশকুলের দেরি আছে। বসেন।‘

-‘কেমন চলছে ইশকুল?’

-‘খুব ভালো।‘

এম.এম.সি-র সেক্রেটারিকে কেমন বেকায়দায় ফেলেছেন, সংক্ষেপে সেই গল্প বলেন নিরঞ্জনা। শুনতে শুনতে সুধাময়ের চোখ স্বাভাবিকের চাইতে দ্বিগুণ বড় হয়। নিরঞ্জনা বলেন – তাঁর কাছে কেউ একজন প্রস্তাব করেছিল – ব্যাপারটা নিজেদের মধ্যে মিটিমাট করতে চাইছিল। নিরঞ্জনা লোকটাকে ফুটিয়ে দিয়েছেন। প্রথম যেদিন ব্যাপারটা জানাজানি হয়েছিল, মিড ডে মিল কুকদের চোখে নিরঞ্জনা দেখেছিলেন তাদের প্রতি অন্যায়ের প্রতিকারের আশার আলো। এই মহিলাদের সব সময় শাসায় সেক্রেটারি। চাকরি চলে যাওয়ার ভয় দেখায়। কুকদের চাকরি পার্মানেন্ট নয়। এরা স্কীম ওয়ার্কার। স্কীম যতদিন চলবে, ততদিনই চাকরি। এবং চাকরিটি প্রতি বছর রিনিউ হয়। অর্থাৎ পঞ্চায়েতের, বিশেষ করে এস.এম.সি-র সেক্রেটারির মন-মর্জির ওপর নির্ভর করে , চাকরি রিনিউ হবে কি হবে না। কুকরা তাই চাকরি বজায় রাখার জন্য অন্যায়, অবিচার, হেনস্তা মুখ বুজে সহ্য করে। অরবিন্দ লস্করকে ঘায়েল করে রেখেছেন বলে শুধু কুকরাই নয়, অনেকেই নিরঞ্জনাকে বিশেষ শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখছে আজকাল।

নিরঞ্জনা বলেন – ‘....আপনে তো কইলেন, আইলের উপরে শুইয়া পইড়া বানের নোংরা জল আটকানোর চেষ্টা বৃথা। কথাটা নিয়া অনেক ভাবছি আমি ....।‘

ভেবে ভেবে নিরঞ্জনার মনে হয়েছে, কথাটা ঠিক নয়।

সুধাময় মাথা নাড়েন। তাঁর মনে হয়, ভি.আর.এস. নেওয়া ঠিক হয়নি তাঁর। রণে ভঙ্গ দিয়েছিলেন তিনি। তিনি যা পারেন নি, নিরঞ্জনা তা করে দেখাচ্ছে। গভীর দৃষ্টিতে নিরঞ্জনার মুখের দিকে তাকান সুধাময়। অন্য দিকে তাকিয়ে থেকে শরীরের সব রোমকূপ দিয়ে সেই দৃষ্টি প্রত্যক্ষ করেন নিরঞ্জনা। কিন্তু না। চোখে চোখ মেলান না তিনি।

অলীক পূর্ণকুম্ভ থেকে কয়েক ফোঁটা অমৃত ছলকে পড়ে।

 

 

          

                                                                              

 

Comments

Popular posts from this blog

স্ত্রীর পত্র

কচুয়া শাড়ি দারাসিং লাফ