দামা

 

                                                           দামা

 ডঃ পি.কে. দাস ইন্টরকম উঠিয়ে ডায়াল করেন। ওপাশ থেকে করুণা সিং জিজ্ঞাসা করে – ‘ইয়েস স্যর?’

-‘আর ক’জন রোগী বাকি রয়েছে?’

-‘দু’জন স্যর।‘

-‘পুরোনো কেস?’

-হ্যাঁ স্যর।‘

পি.কে. ঘড়ি দেখেন। হোপফুলি দেড়টার মধ্যে রোগী দেখা শেষ করে বেরোতে পারবেন। বিকেলে আজ আর বসবেন না চেম্বারে। বিকেলের অ্যাপয়েন্টমেন্টগুলো রিসিডিউল করা হয়ে গেছে।

সাধারণত বেলা দু’টো-আড়াইটের আগে রোগী দেখা শেষ হয় না। আজ হচ্ছে। কারণ প্রথম থেকেই অন্যদিনের চাইতে কম সময় নিয়ে প্রত্যেক রোগীকে দেখেছেন ডাক্তারবাবু। এটা তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ।

গতকাল বীরু ফোন করেছিল। সে দিল্লি এসেছে। জিজ্ঞাসা করছিল – দেখা হতে পারবে কি না।

-‘কোথায় উঠেছিস তুই?’

-‘কালিবাড়ি গেস্ট হাউসে।‘

-‘নিউদিল্লি কালিবাড়ি?’

-‘হ্যাঁ।‘

-‘দিল্লিতে কোনোও কাজে এসেছিস?’

-‘না। …..হরিদ্বার গেছলাম। …..বাবার অস্থি বিসর্জন দিতে।‘

-‘দুপুর দু’টায় তৈরি থাকতে পারবি? আমি এসে তোকে নিয়ে যাব। একসাথে ভাত খাব।‘

-‘ঠিক আছে।‘

বীরজিৎ চন্দ ফোন রেখে ভাবেন, প্রদীপ সম্পর্কে যা কানে এসেছিল – তা সত্যি নয়। সত্যি হলে তার গলার স্বরে এত আগ্রহ থাকত না। পরের দিনই দেখা করার কথা বলত না। আর ভাত খাব’-র জায়গায় ‘লাঞ্চ করব’ বলত।

                                                                                                                          

অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে ফোনটা করেছিলেন বীরিজিৎ। উড়ো কথা শুনে – ‘প্রদীপ আর আগের প্রদীপ নাই …।‘ দু’পয়সা কামিয়ে  অতীতকে ভুলে গেছে …. এসব নানা কথা শুনেও প্রদীপের ফোন নম্বর যোগাড় করেছিলেন বীরজিৎ।ভেবেছিলেন – যোগাযোগ করবেন কি না, সেটা পরে ভেবে দেখবেন।

দু’টোর একটু আগেই কালীবাড়ি পৌঁছে যান প্রদীপ। গেস্ট-হাউস সেই আগের মতোই আছে। তক্তার ওপর পাতলা তোষক-বালিশ। বিবির্ণ বিছানার চাদর। অনেক বছর আগে, প্রথম যখন দিল্লি এসেছিলেন প্রদীপ – এখানে ছিলেন চার-পাঁচ দিন। সবে তখন ডাক্তারি পাশ করেছেন। ইন্টার্নশিপ হয়ে গেছে। চাকরি খুঁজছেন। দিল্লির একটা নার্সিংহোমে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসেছিলেন। কলকাতা থেকে পালাতে চাইছিলেন প্রদীপ। কলকাতা তখন অগ্নিগর্ভ। ত্রিপুরায়ও ফিরে যেতে চান নি। সেই যে দিল্লি এলেন – তারপর থেকে যমুনার জল কতবার কুল ছাপিয়েছে – সে হিসাব রাখেন নি প্রদীপ।

তক্তপোষের ওপর বসতে বসতে প্রদীপ জিজ্ঞাসা করেন – ‘থাকবি কয়েক দিন?’

-‘কাইল সন্ধ্যায় ট্রেন।‘

-‘চল, খাইতে যাই।‘

‘ওহ ক্যালকাটা’-য় ফোন করে বলে দিয়েছিলেন প্রদীপ। ওদের ঢুকতে দেখে ম্যানেজার এগিয়ে আসে। জানালার কাছে একটা টেবিলে ওদের নিয়ে বসায়।

-‘কেমন আছ ব্যানির্জি?’

-‘ভালো স্যর।‘

-‘তোমার মা?’

-‘মা-ও ভালো আছেন।‘

ব্যানার্জির মা প্রদীপের পেশেন্ট। অসম্ভব হাইপোকন্ড্রিয়াক মহিলা। প্রদীপের ওপর খুব আস্থা মহিলার। তাতে মাকে নিয়ে ব্যানার্জির সমস্যা অনেক কমেছে।

-‘কী খাবি?’

-‘তুই ঠিক কর। আমি এইসব বড়লোকি জায়গায় দিশা পাই না। …. ভাতের হোটেলে খাইয়া অভ্যস্থ।‘

-‘এইটারেও ভাতের হোটেল ভাব না!’

                                                                                                                             

বীরজিৎ লক্ষ করেন, ‘এটাকে’ না বলে ‘এইটারে’ বলল প্রদীপ।

-‘এইখানকার ডাবচিংড়ি খুব ভালো। অর্ডার দেই?’

-‘খাই নাই কোনোদিন।‘

-চিংড়িতে অ্যালার্জি নাই তো?’

-‘না।‘

মুসুর ডাল, কুচো আলুভাজা, মোচার ঘণ্ট আর ডাবচিংড়ি। শেষ পাতে মিষ্টি দই। নিটোল একটি বাঙালি ভুরিভোজ। মিষ্টিপান মুখে দিতে দিতে ভোজনের তৃপ্তিকে নিখুঁত করেন প্রদীপ।

কব্জির ঘড়িতে সময় দেখেন প্রদীপ। ঘড়িটা খেয়াল করেছেন বীরজিৎ। অন্যরকম দেখতে। তিনি পড়েছেন – ‘স্মার্ট ওয়াচ’ বলে একটি বস্তু বাজারে এসেছে, যাতে সময় দেখা ছাড়াও আরো অনেক ব্যাপার আছে। এমনকি ফোনেরও বিকল্প হিসেবে এটাকে ব্যবহার করা যায়। প্রদীপের ঘড়িটা সেরকম কিছু মনে হয়।

-‘কোথাও যাওয়ার আছে তোর? বাজার-হাট করবি? …. শাল, সোয়েটার?’

-‘সকালেই সেসব করছি।‘

-‘তাহলে চল, তোর গেস্ট-হাউসে গিয়ে বসা যাক।‘

-‘তাস খেলবি?’

-‘গুড আইডিয়া।‘

-‘কিন্তু তাস তো নাই।‘

-‘সেটা কোনো সমস্যা হবে না।‘

দুপুরে যখন বন্ধুকে নিতে এসেছিলেন প্রদীপ – তখন গেস্ট-হাউস সংলগ্ন লাইব্রেরিটি বন্ধ ছিল। এখন খোলা। লাইব্রেরিয়ান এগিয়ে আসে – ‘স্যর আপনি!’

-‘ . . . . এই তো, আমার বন্ধু। . . . এক প্যাকেট তাস যোগাড় করে দিতে পার, বিদ্যুৎ?’

-‘আবশ্যই স্যর।‘

বিদ্যুৎ চলে গেলে সটান চৌকিতে শুয়ে পড়েন প্রদীপ। বেশি খাওয়া হয়ে গেছে। দুপুরে যেখানে একবাটি সব্জিসেদ্ধ, একটা রুটি আর একহাতা ভাত একটুকরো মাছ দিয়ে খাওয়ার অভ্যাস,  

                                                                                                                                       

সেখানে এতসব খেয়েছেন আজ। পেট আঁইঢাই করছে। শুয়েই প্রদীপ বলেন – ‘আঃ’, যেন এই পাতলা তোষক, শক্ত বালিশ আর বিবর্ণ চাদরের বিছানার জন্য হা-পিত্যেশ করে কেটেছে তাঁর জীবন!

-‘ঘুমাইবি?’

-‘ না না। . . . . . এইবার ক’, সবার খবর। . . . টুলু কই থাকে?’

-‘আগরতলা। . . . টুলুই তো তোর ফোন নম্বর যোগাড় করি দিল।‘

-‘কার থাকি দিল?’

-‘শুক্লার থাকি। . . . শুক্লা আর টুলু একলগে চাকরি করে।‘

শুক্লা। প্রদীপের সব ছোট বোন। খুব আহ্লাদি ছিল। একবার প্রদীপ আর বীরু স্কুল থেকে ফেরার পথে নদীর চরে এক নিবে যাওয়া চিতার ওপর একটা ছাতা টাঙ্গানো দেখতে পেয়ে প্রদীপ তরতর করে নদীর ঢাল বেয়ে নেমে গিয়ে ছাতাটি তুলে নিয়েছিল।

-‘এইটা তুই কী করলি!’

-‘কেনে? . . . জানস না, মরলে কেবল আত্মা থাকে। আত্মার শরীর নাই। শরীর না থাকলে ছাত্তি দিয়া কী করব!’

লেডিস ছাতা ছিল। প্রদীপ সেটা শুক্লাকে দিয়েছিল। নতুন ছাতা পেয়ে শুক্লা খুব খুশি। সেই খুশিতে জল ঢেলে দিয়েছিল টুলু – ‘শ্মশানোর ছাত্তি . . . ।‘

শুক্লা কেঁদেকেটে অস্থির। টুলু কীভাবে জানল? বীরু ছাড়া তো আর কেউ জানে না। বীরুই নির্ঘাৎ টুলুকে বলেছে। বীরুর সাথে ঝগড়া করে কয়েকদিন দুই বন্ধুতে বাক্যালাপ বন্ধ ছিল।

শুক্লার সাথেই কেবল যোগাযোগ আছে প্রদীপের। ডাক্তারি পাশ করে সে ত্রিপুরায় ফিরে যায় নি, বাবা খুব বিরক্ত হয়েছিলেন। তার ওপর ছেলে যখন মুসলমান বিয়ে করেছিল – সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছিলেন বাবা। বলেছিলেন – আর যেন বাড়ি আসে না প্রদীপ।

-‘কই থাকস এখন বীরু?’

-‘রিটায়ার করিয়া কৈলাসহরো বাড়ি করছি।‘

-‘দরগাপুরোর বাড়িটা আছে?’

-‘না রে। . . . আমরার বাড়ি, তোরার বাড়ি . . . সবের উপর দিয়া রেললাইন হইছে। . . . দেখলে

                                                                                                                                    

জায়গাটারে আর চিনতে পারবি না। নদীর উপর দিয়া লম্বা রেলব্রীজ হইছে।‘

-‘দরগাটা আছে তো?’

-‘আছে।. . এমনকি মাঠটাও পুরা আছে। মাঠসুদ্ধা দরগা বাঁচানির লাগি তোর বাবায় খুব দরবার করছিলেন। . . . তাইন তো প্রধাণ আছলা। রেলকর্তৃপক্ষ বাধ্য হইছল এক কিলোমিটার ঘুরাইয়া লাইন পাততে।‘

বন্ধু-বান্ধব, সহপাঠীদের কথা জিজ্ঞাসা করতে করতে এক সময় প্রদীপ বলে লালমোহনের কথা। লালমোহন নামটা বীরু দিয়েছিল। নেড়ি কুকুর একটা। রোজ স্কুলে যাওয়ার সময় পিছু নিত। স্কুলের গেট অব্দি পৌঁছে দিত ওদের। ফেরার সময়ও এসে নিয়ে যেত। বিকেলে মাঠে ফুটবল খেলার সময় গোল হলে বীরু যখন উল্লাসে লাফাত, লালুও ছুটে এসে বীরুর সাথে লাফাত। ছেলেরা খুব মজা পেত। লালুকে খেপানোর জন্য বীরুকে হাত তুলে মারার ভঙ্গি করত তারা। তখন লালু তেড়ে যেত ওদের দিকে। প্রায়ই এমন রগড় হত। আনন্দ আর আনন্দ!  

-‘কাশীনাথরে মনো আছে নি তোর?’

-‘থাকব না!’

নদীর ওই পার থেকে প্রদীপের বাবা একটা দামা কিনেছিলেন। তার নাম দেয়া হয়েছিল কাশীনাথ। আরেকটা দামা অলরেডি ছিল বাড়িতে। দুই দামা দিয়ে লাঙল চষতেন বাবা। মা খুব যত্ন করতেন দামা দু’টোর। খুব স্বাস্থ্যবান ছিল দু’জনে। কাশিনাথকে নাম ধরে ডাকলে চামর দোলানোর মতো করে লেজ নাড়ত আস্তে আস্তে। ওর লেজের ডগায় কিছু চুল ছিল সাদা । ঘাড়ের কাছেও শরতের মেঘখণ্ডের মতো সাদা ছোপ ছিল। বাকি শরীর নিকষ কালো।

কাশীনাথ বুড়ো হয়ে চোখে দেখতে পেত না। এক সময় আর হাল টানতে পারত না। গোয়ালে বসে ঝিমোত। একদিন রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে কী মনে করে বাবা ওর গলার দড়িটা খুলে দিয়েছিলেন। সেদিন সকাল থেকে কাশীনাথ জাবের গামলায় মুখ ছোঁয়ায় নি। সকালে উঠে দেখা গেল – কাশীনাথ নেই।

অনেক খোঁজাখুঁজি হল। দুপুরে কেউ এসে জানিয়ে গেল – কাশী চলে গেছে তার আগের মালিকের বাড়ি।

‘কেমনে! নদী পার হইয়া গেল। শরীরে একফোঁটা বল ছিল না, তবুও নদী সাঁতরাইয়া গেল গিয়া!’

প্রদীপ বাবার সাথে গিয়েছিল তাকে দেখতে। কাশীর তখন অন্তিম দশা।

তাসের প্যাকেট দিতে এসে পি.কে. স্যরকে চৌকিতে শুয়ে থাকতে দেখে অবাক হয় বিদ্যুৎ।

                                                                                                                                      

দিল্লির বিখ্যাত ডাক্তার . . . প্রচুর পয়সাওয়ালা . . . এমন একজন এলেবেলে গাঁইয়া লোকের বোজম ফ্রেন্ড!

-‘থ্যাঙ্ক ইউ বিদ্যুৎ।‘

-‘চা পাঠাব স্যর?’

-‘তাহলে তো খুব ভালো হয়।‘

তাসের প্যাকেটটা বীরুর দিকে বাড়িয়ে ধরেন প্রদীপ – ‘শাফল কর। . . . খেলার নিয়মটা ঝালিয়ে নিতে হবে . . . কবে লাস্ট খেলেছি, ভুলে গেছি।‘

-‘আমি তো রোজ খেলি। রিটায়ার্ডদের কয়েকটা গ্রুপ আছে কৈলাসহরে . . . ।‘

-‘বেশ আছস!’

প্রদীপের গলার স্বরটা কেমন উদাস শোনাল। তবে কি প্রদীপ সুখে নেই? ভাবেন বীরজিৎ।

চা নিয়ে আসে বিদ্যুৎ নিজে। ততক্ষণে তাস খেলা শুরু হয়ে গেছে। চায়ের ট্রে নামিয়ে রেখে দাঁড়িয়ে থাকে বিদ্যুৎ। মাথা চুলকোয়।

-‘কিছু বলবে?’

-‘স্যর, আমার স্ত্রীকে যদি একটু দেখে দেন।‘

-‘আমার সঙ্গে তো ডাক্তারির সরঞ্জাম নেই। . . তার সমস্যাটা কী?’

-‘পেটে একটা ব্যথা। . . . প্রচুর ওষুধপত্র খেয়েছে। সনোগ্রাফি, হাজার রকমের ব্লাডটেস্ট, হ্যানোত্যানো, সব করানো হয়েছে।‘

কী যেন ভাবেন প্রদীপ। তারপর বলেন – ‘ঠিক আছে। আটটার পর নিয়ে এসো। রিপোর্টটিপোর্টগুলো, প্রেসক্রিপশন – সব নিয়ে আসতে বলবে।

কাকে যেন ফোন করেন প্রদীপ। আটটার আগে একটা স্টেথো আর স্পিগমেনোমিটার দিয়ে যেতে বলেন।

খুব সহজে খেলা আবার রপ্ত হয়ে ওঠে প্রদীপের। রামির নিয়মগুলো . . . গেটপাস . . . সিকোয়েন্স – সব মনে পড়ে যায়। কোথা দিয়ে যে সময় কেটে গেল। এক সময় বিদ্যুৎ এসে উঁকি মারে। প্রদীপ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক হন – এরই মধ্যে আটটা বেজে গেল!

লাইব্রেরির রীডিংরুমে কেবল বিদ্যুতের স্ত্রী নয় – আরো জনা পাঁচেক রোগী দেখতে হল ডঃ

                                                                                                                              

পি.কে. দাসকে।

-‘তুই দেখতাসি দিল্লির বিধান রায়!’

প্রদীপের মনে হয় – বিধান রায় হয়তো মানুষের নিঃশর্ত ভালোবাসা পেয়েছিলেন। . . . এখন সব ভালোবাসা শর্তাধীন। বছর খানেক আগের কথা মনে পড়ে প্রদীপের। অত্যন্ত জটিল এক ডেলিভারি কেস-এ . . . বাচ্চাটা স্টিলবর্ন হয়েছিল বলে . . . যদিও রুকসানার কোনোই গাফিলতি ছিল না, তবুও অজস্র হেট-মেল এসেছিল তার কাছে। একজন লিখেছিল – ‘গো টু পাকিস্তান, কিল নিউবর্নস দেয়ার!’ সারাজীবন ধরে অর্জিত পেশেন্টদের আস্থা-ভালোবাসা, ডাক্তার হিসেবে সুনাম – সব একদিনে হারিয়েছিল রুকসানা।

প্রদীপ হঠাৎ চুপ হয়ে গেল কেন ভেবে পান না বীরজিৎ। তিনি বিপন্ন চোখে বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। প্রদীপ বলেন – ‘আজকের সুনাম-বিশ্বাস-ভরসা কাল হেট-মেলে রূপান্তরিত হয়ে যেতে সময় লাগে না রে বীরু! . . . এইবার যাই। রাইত দশটা বাজে।‘

প্রদীপ চলে গেলে বীরজিৎ ভাবেন – সবকিছু যেন মেলাতে পারছেন না। ডাক্তার হিসেবে প্রদীপের খুব নামডাক – সে তো দেখাই গেল। কিন্তু সে যে খুব টাকাপয়সা করেছে, মনে হয় না। গাড়ি-ড্রাইভার, এসব নেই। বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথা একবারও বলল না। এর কী কারণ হতে পারে। বাড়িঘর কি ভালো নয়! এতটা সময় গেস্ট-হাউসে না কাটিয়ে বাড়িতে কাটাতে পারত। সবাই যে বলেছিল – প্রচুর টাকাপয়সা কামিয়ে ঠাটবাটের জীবন হয়েছে প্রদীপের – সেসব হয়তো মনগড়া কথা। বেশ দুখি মানে হল প্রদীপকে। একবারও বৌয়ের কথা বলল না। প্রদীপ শুনেছিলেন, প্রদীপের দুই ছেলে। কোথায় থাকে তারা? সব চাইতে বড় কথা – বীরজিৎ শুনেছিলেন, পুরোনো বন্ধুদের আমল দেয় না প্রদীপ। একেবারে অমূলক কথা।

মনে মনে হাসেন বীরজিৎ। প্রসন্ন হাসি। শুরুতে একটু আটকাচ্ছিল, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে নিজের আদি-ভাষায় কেমন অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল সে। ছেলেবয়সের স্মৃতিচারণ করতে করতে যখন বলে উঠেছিল – ‘ . . আমাদের সেই দামা, . . কাশীনাথ . . ।‘ দামা শব্দটা বীরজিৎ নিজেই ভুলে গিয়েছিলেন। শব্দটা এখন আর কাউকে ব্যবহার করতে শোনা যায় না। সবাই বলে ‘বলদ’। ‘দামা’ থেকে ‘বলদ’-এ সরে যাওয়ার ব্যাপারটা কেউ লক্ষ করে না। এরকম আরো শব্দ আছে নির্ঘাৎ - যা অব্যবহারে হারিয়ে গেছে কিংবা যাচ্ছে। বিদেশ হলে এসব ব্যাপার ভাষাতাত্বিকের গবেষণার বিষয় হতে পারত। বীরজিৎ ভাষাতাত্বিক না হলেও বাংলার অধ্যাপক তো ছিলেন। বিকেল-সন্ধ্যা তাস না পিটিয়ে তিনি নিজেও তো এই কাজটা করতে পারেন, কতটা সফল হবেন – সেই চিন্তা মুলতুবি রেখে। প্রদীপ এখনো কেমন পুরোদমে ডাক্তারি করছে। বয়স সত্তর পেরিয়েছে – তবুও মাথাটা কেমন সতেজ রেখেছে। বীরজিৎ খুব উদ্বুদ্ধ বোধ করেন।

প্রদীপটা সব সময়ই বিষম প্রতিভাধর ছিল। ওর ভাবনার জগৎ সবার চাইতে এগিয়ে ছিল। একবার

                                                                                                                            

শীত পড়েছিল খুব। নদীর চরের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল তারা। এক জায়গায় বালি একটু উঁচু হয়ে আছে। হাত দিয়ে বালি সরাতেই তার নিচে অনেকগুলো কচ্ছপের ডিম। পাঁচ-ছ’টা ডিম কেবল পকেটে পুরে নিতে দিয়েছিল প্রদীপ। বলেছিল – এর বেশি নিলে নাকি তা হবে প্রকৃতিবিরুদ্ধ কাজ। লোভ আর প্রয়োজনের মধ্যে যে বিরোধ আছে – সেই প্রজ্ঞা সে ওই বালক বয়সেই কোথা থেকে অর্জন করেছিল কে জানে। তখন তো এইভাবে ভাবত না কেউ, এখন যেরকম পত্র-পত্রিকা, সোশ্যাল মিডিয়া খুব সোচ্চার এসব নিয়ে।

ডিমিগুলোতে নদীর কাদার প্রলেপ মাখিয়ে, শুকনো ডালপাতা জড়ো করে আগুন বানিয়ে তাতে সেগুলো পুড়িয়ে নিয়ে খোসা ছাড়িয়ে খেয়েছিল তারা। তারা তিনজন। প্রদীপ, বীরজিৎ আর জ্যোতির্ময়। জ্যোতির্ময়, আরো সব বন্ধুদের কথা একজন একজন করে জিজ্ঞাসা করেছে প্রদীপ। সবাইকে মনে আছে তার।

লাব্রেরিয়ান বিদ্যুৎ ভাবেন – পি.কে.-র অন্য এক রূপ দেখলেন আজ। অতবড় ডাক্তার। তাঁর কাছে গিয়ে দাঁড়ালেই রোগী অর্ধেক সেরে ওঠে। গাদা গাদা ওষুধ খেতে দেন না। ওষুধ বদলান না। ফিজ-ও অন্য ডাক্তারদের তুলনায় অনেক কম নেন। আজ তো এখানে পাঁচজন রোগীর থেকে কোনো ফিজ নিলেনই না। মানুষের অত্যন্ত আস্থাভাজন, শ্রদ্ধাভাজন পি.কে.। আজ তাঁর তুই-তোকারির বন্ধুত্ব, গ্রাম্য ভাষা আর বন্ধুকে পেয়ে কী যে খুশি , বোঝাই যাচ্ছিল . . . । পি.কে.-র এরকম একখানা জীবনও আছে, জানতেন না বিদ্যুৎ।

মন্দিরমার্গ ধরে প্রদীপের ট্যাক্সি এগোয়। এপ্রিলের আকাশ বেশ পরিষ্কার। সেই আকাশে গোল চাঁদ লটকে আছে। আজ কি পূর্ণিমা? গুগল দেখেন প্রদীপ। না। শুক্লা চতুর্দশী। এই চাঁদের আলোয় তো চরাচর চন্দন-চর্চিত হওয়ার কথা। কিন্তু এত যেখানে ইলেক্ট্রিক আলো – সেখানে জ্যোৎস্নার হার মানা অবধারিত। দিল্লি শহরে ফুটফুটে জ্যোৎস্না বলে কিছু হয় না।

বছরের এই সময়ই তো তোতাপীরের দরগার মাঠে তিনদিন ধরে মেলা হয়। বীরু বলল – বাবার চেষ্টাতেই নাকি দরগার মাঠটা রক্ষা পেয়েছিল, নইলে বটগাছটি সুদ্ধ মাঠের অনেকটাই চলে যেত রেললাইনের নির্মাণে। বাবা সুফী পীরের ভক্ত ছিলেন। কিন্তু ছেলের মুসলমান বিয়ে মানতে পারেন নি। স্প্লিট পার্সোনালিটি!

মাঠের বিশাল বটগাছটা চোখের সামনে ভাসে প্রদীপের। তাতে অজস্র টিয়াপাখি। পাকা বটফল খেত তারা। তোতাপীরের লাগানো বটগাছ। তোতাপীর নাকি মৌন ছিলেন। তাঁর হয়ে কথা বলত তাঁর তোতাটি, নিদান দিত আধিব্যধির, বলে দিত দুঃখকষ্টের প্রতিকার। সেই তোতার বংশধরেরা এখনো আছে সেখানে – কয়েকশো বছর ধরে।

সামনের বছর মেলার সময় দরগাপুর যাবেন প্রদীপ। বাড়িঘর নেই, তবে দরগা আছে। বটগাছের তলায় রুকসানাকে নিয়ে বসবেন প্রদীপ। তাকে ফুটফুটে জ্যোৎস্না দেখাবেন। কয়েক পুরুষ ধরে

                                                                                                                             

 চাঁদনি-চকের বাসিন্দা রুকসানা ‘চাঁদনি’ দেখে নি। দু’জনে একসাথে জ্যোৎস্না চন্দনে চর্চিত হবেন। এমন জ্যোৎস্না – যা শরীরের ভেতর সেঁধোয়। প্রাণে আরাম দেয়। হেট্মেলের ট্রমা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারে নি রুকু। বলা যায় না, টিয়াপাখিগুলো হয়তো বাৎলে দেবে শুশ্রুষা।

 

 

Comments

Popular posts from this blog

স্ত্রীর পত্র

কচুয়া শাড়ি দারাসিং লাফ