মনা দাসের গল্প

 


                                                                               

মামাবাবু মরেছে আজ তিনদিন। সেই থেকে চেষ্টা করছি যাওয়ার। পারছি না। পার করানোর জন্য কারবারি নগদ পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছে। পাঁচশ টাকার কড়কড়া দশটি নোট আগাম ধরিয়েছি ওর হাতে। তারপর থেকে রোজ রাতে এসে ওর বাড়িতে বসে থাকছি। সুবিধা মতো পার করিয়ে দেবে। আগে পার করানোর জন্য বাঁশের চকম* ছিল। এখন কাঠের শক্তপোক্ত চকম বানিয়েছে। কিন্তু হলে কী হবে, ফাঁক পাচ্ছে না, যখন বি.এস.এফ. টহলে ঢিলা দেবে আর কারবারি কাঁটাতারের বেড়ায় চকম ধরবে আর আমি বেড়ালের মতো মুহূর্তে চকম বেয়ে উঠে ওইদিকে লাফ মারব। হ্যাঁ, বেড়ালের মতোই নিঃশব্দে লাফিয়ে পড়তে হবে। ‘ঝুপ’ শব্দ হলেই বিপদ। বি.এস.এফ. ‘কৌন হ্যাঁয়’ বলে দৌড়ে আসবে।

আগে এপার-ওপার হওয়া এত কঠিন ছিল না। টাকাও এত লাগত না। এখন নূতন সরকার নাকি খুব টাইট। বলে – বাংলাদেশিদের অনুপ্রবেশ বন্ধ করাবে। বাংলাদেশিরা এসে নাকি ভারতের জনসংখ্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে, সব ভাত খেয়ে নিচ্ছে। আমি ভাবি, ওদের অত ভাতের ঠেকা নাই,  যতটা আমাদের। আর আমি যে এদিক থেকে ওদিকে যাই, আমার মতো শত শত লোক যায়, তারাও তাহলে বাংলাদেশের লোকসংখ্যা বাড়ায়। সরকারের মাথাব্যথা, এদিকের ভাত খেয়ে ফেলল ওদিকের লোক। ওদিকে গিয়ে যে মাছ-ভাত পেট ভরে খাই এক নাগাড়ে কম করে হলেও দু’তিন মাস, তার বেলা?

ওদিকের মাছভাতের স্বাদই আলাদা। তাজা মাছ। বরফের মাছ নয়। সে পুঁটি-ট্যাংরা হোক, কিংবা বোয়াল-ইলিশ। বরফে যাওয়ার আগে ইলিশের স্বাদ কেমন হয়, এদিকের লোক তা জানবে না কোনোদিন। একবার বনমালীপুরে এক বাড়ি রং করেছিলাম। পুলিশের বাড়ি।পুলিশ জানে আমার বাংলাদেশ যাওয়া-আসার কথা। বলেছিল, একবার বরফহীন ইলিশ খাওয়াতে। খাইয়েছিলাম। পুলিশ, তার বউ-পোলা – সবাই কত আহা! আহা!, কী সোয়াদ! কী সোয়াদ করেছিল। পুলিশ টাকা দিতে চেয়েছিল। নিই নি। পুলিশকে হাতে রাখলে লাভ আছে।

 রংমিস্ত্রী হয়েছি পেটের দায়ে। নইলে আমরা চোদ্দ পুরুষ মৎস্যদাস। মাছমারা আমাদের জাত ব্যবসা। এইদেশে জল কই যে মাছ ধরব। বাংলাদেশে যেখানে মামাবাড়ি, সেখানে চারদিক জলে থইথই। বর্ষায় তো কথা নাই, এই শীতেও খাল-বিল-নদী-নালায় জল থাকে। শীতে জলে টান দিলে মাছ কিলবিল করে। এক খেপ জাল মারলেই হল। যত পার খাও, বাকিটা বেচ।

মাছধরা শিখিয়েছে মামাবাবু। কোন জলে কোন জাল, কোন মাছে কোন জাল, সব হাত ধরে শিখিয়েছে মামাবাবু। জালে টান পড়লে কীভাবে তা ধীরে ধীরে গোটাতে হয়, শিখেছি আমার যখন দশ বছর বয়স। আমি আর আমার মামাতো ভাই নসু, এক বয়স আমাদের। জাল বাওয়া, নাও বাওয়া, সাঁতার দিয়ে নদীর এপার-ওপার হওয়া – সব একসাথে করতাম।

আমাকে মামাবাড়ি রেখে মা-বাবা এদেশে চলে এসেছিল। একদিন বাবা বলল – বাংলাদেশে থাকা যাবে না আর। হিন্দুরা এখানে নিরাপদ নয়। মুসলমানবাদী দল ভোটে জিতে সরকার বানাল। তারপর হিন্দুরা এখানে-ওখানে মার খাচ্ছিল। বাবা দেশ ছাড়ল। আমাকে রেখে গেল মামার কাছে। ইন্ডিয়াতে থাকা-খাওয়ার একটা ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত আমি এখানে থাকব – এরকমই ভেবেছিল বাবা।

থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা বলতে ছোট একখানি টিনের চাল, টিনের বেড়ার ঘর। ভাড়া ঘর। মা লোকের বাড়ি বাসন মাজে, বাবা যখন যা  কাজ পায় করে। আমি এসে সব দেখেশুনে ফিরে গেলাম মামাবাড়ি। ওই টিনের ঘরে গরমে সিদ্ধ হয়ে আর মোটা  চালের ভাত আর আধপচা পুঁটিমাছের ঝোল খেয়ে দু’দিনেই আমার প্রাণ যায় অবস্থা।

ফিরে এসে মামির রাঁধা মাছ-ভাতের স্বাদ যেন আরো বেড়ে গেল। রান্না সেই একই। কিন্তু গত কয় দিন আগরতলার অখাদ্য মাছ-ভাত খাওয়ার পর এ যেন অমৃতের মতো লাগছিল।  কিন্তু সাথে সাথে এও মনে হচ্ছিল – এভাবে চলে এসে কাজটা ভালো করলাম না। মা-বাবা কত কষ্টের মধ্যে আছে। ছেলে হিসাবে আমার তো কিছু করা উচিত। মনটা অস্থির। খুব স্বার্থপর লাগছিল নিজেকে।। কিছু একটা করতেই হবে। কিন্তু কী যে করি – বুঝে উঠতে পারি না। মাথায় নানা ফন্দি। কিন্তু কোনোটাই জুতের মনে হয় না। মামা আমার ভাবসাব দেখে কী বুঝল কে জানে, আমাকে ডেকে বলল – ‘মনা, এক কাম কর. . . . ।‘

কাম করা শুরু করলাম। মাছ ধরে টুকরি ভর্তি মাছ বর্ডারে নিয়ে যাই। ওই পারে লোক ফিট করা থাকে। তারা মাছ নিয়ে যায়, মাছের দাম বাবাকে দেয়। মা-বাবার জন্য ওইটুকু করতে পেরে মনটা শান্তি হল। লোকে বলে – চোরা কারবার অসৎ উপায়। অসৎ লোকের কাজ। যারা আমার মাছ নিয়ে যেত, তারা পাই-পয়সা দাম বাবাকে দিত। অসৎ হলে তা করত না। ঠকাত।

একদিন খবর পেলাম – আমার বোনের বিয়ে লেগেছে। টাকাপয়সা যতটা পারি যোগাড় করে, মামাবাবুও দিল কিছু টাকা, গেলাম বিয়ের কয়েকদিন আগে। বাবা একটুখানি জায়গা কিনে, নাল জায়গা, বর্ষায় জল ওঠে, তবু তো নিজের জায়গা, একখানি ঘর বানিয়েছে তাতে। সরকার থেকে ঘর বানানোর জন্য টাকা দিয়েছে। দিয়েছে, কারণ বাবা ভারতের নাগরিক। বাবার আধার কার্ড আছে।  আধার কার্ড করাতে হলে প্রমাণ দিতে হয়, তুমি ভারতের মানুষ। বাবার কাছে প্রমাণ ছিল। দেশ যখন দুই ভাগ হয়েছিল, ঠাকুর্দা এসে পড়েছিল এই দেশে। রিফ্যুজি কার্ড পেয়েছিল। বাড়ি বানানোর জন্য নাকি জায়গা আর টাকা পেয়েছিল। কিন্তু মন টেঁকে নি। লাল টিলামাটির দেশে এসে জলের দেশের মানুষটা হাঁপিয়ে পড়েছিল। তাই সব বেচেবুচে ফিরে গিয়েছিল। বাবার তখন বালক বয়স। বাবার নাম ছিল রিফ্যুজি কার্ডে। সেই কার্ড যত্ন করে রাখা ছিল। সেই কার্ড দেখিয়ে বাবা নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করেছিল।

মা-বাবা দুজনে মিলে খেটেখুটে নিজেদের অবস্থা আগের চাইতে ভালো করেছে। আমিও মাঝে মাঝে আসি, টকাকড়ি দিয়ে যাই। এখন আর আগের মতো মাছ পাচার করি না। ওতে মেলা হ্যাঙ্গাম। লাভও কম। তার চাইতে বাংলাদেশে অন্যভাবে রোজগার করে মাঝে মাঝে  টাকা দিতে আসি। টাকা দিই, দেখাও হয়। অন্যভাবে রোজগার মানে মামা, নসু আর আমি মিলে ঢাকা শহরে মাছের চালান দিয়ে ভালো আয় করি।

থাকি ওই দেশে, আবার বাবার ছেলে হিসেবে আমি এই দেশেরও নাগরিক। বোনের বিয়েতে এসে মনে হল, বাবা-মা বেশ বুড়ো হয়েছে। আমার উচিত, তাদের দেখা-শোনা করা। ফিরে গিয়ে মামাবাবুকে বললাম কথাটা। মামাবাবু বললেন – ‘ঠিক কথা।‘

কাজেই এখন আমি এদেশেই থাকি। আমারও আধার কার্ড আছে। রংমিস্ত্রিগিরিও ভালো শিখে গেছি। তবে বর্ষার চারমাস কাজ থাকে না। তখন মামার বাড়ি কাটাই। এ ছাড়াও এক-আধবার  আসি-যাই। আমার মন পড়ে থাকে মামাবাড়ি। কিছুদিন সেখানকার জলেভাতে না থাকলে শইল* খারাপ লাগে। আমার কাছে আমার বাপ যা, মামাও তাই।

সেই মামা মরেছে খবর পেয়েও যেতে পারছি না। মন অস্থির লাগছে। যে লোকটা পার করে দেবে বলে অতগুলো টাকা নিয়েছে, তার বাড়ি বর্ডারের খুব কাছে। বাড়ির উঠানে মস্তবড় কাঁঠালগাছ। সেই গাছের ডালে বসে সন্ধ্যার পর থেকে সে কাঁটাতারের বেড়ার দিকে নজর রাখছে। আমিও গাছে উঠে বসলাম। একটু পর পর রাইফেল হাতে বি.এস.এফ. জওয়ান টহল দিচ্ছে। কাঁঠালগাছ থেকে অন্ধকারে আবছা দেখা যাচ্ছে ওদের গতিবিধি। সকাল থেকে আকাশ মেঘলা বলে অন্ধকার একটু বেশিই। তাতে আমাদের সুবিধা। ডালে বসে থাকা আমাদের ওরা দেখে ফেলবে, সেই ভয় নেই। ডান-বাঁ, দুই দিক থেকে ওরা বেড়ার ধার ঘেঁষে হাঁটছে।  ডানদিকের জন গেল তো বাঁ দিকের জন এল। পাঁচ-দশ মিনিটেরও ফাঁক নেই যে বেড়া  টপকে দৌড় দেব। অবস্থা বেশ হতাশাজনক।

এত নজরদারির কারণ, সামনেই প্রজাতন্ত্র দিবস। সন্ত্রাসবাদীরা যাতে ভারতে ঢুকতে না পারে, তাই এত কড়া পাহারা। মনে ভাবি, মামা মরার আর সময় পেল না!

তৃতীয়দিন রাত বাড়লে পরাপারের কারবারি বলে, আজ যে করেই হোক, আমাকে পার করিয়ে দেবেই দেবে। বলে, চকম লাগিয়ে পার হওয়া অসম্ভব, ধরা পড়ে যাব। তাই অনেকটা পিছিয়ে গিয়ে,  চারদিকে ঝোপঝাড়, বেশ অন্ধকার এক জায়গায় আমাকে নিয়ে গুঁড়ি মেরে বসে থাকে কারবারি। বাড়ি থেকে বেরোনোর আগেই আমাকে বুঝিয়ে বলে দিয়েছে, ফন্দিটা কী। আমাকে পেরোতে হবে এক কালভার্টের তলা দিয়ে।

আকন্দঝোপে লুকিয়ে আছি। শীতকাল বলে সাপের ভয় নেই, বড় বাঁচা বেঁচে গেছি। এমন সময় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়া শুরু হল। বৃষ্টিতে টহলদারি বন্ধ রাখবে বি.এস.এফ.। এই সুযোগ। একটুও শব্দ না করে নালায় নামলাম। আমি বেশ মোটাসোটা। শরীরটাকে যতটা পারি কুঁচিমুচি করে কালভার্টের তলা দিয়ে গলে বেরিয়ে গেলাম। সে এক মহা অভিজ্ঞতা। শরীরের এখানে-ওখানে ছড়ে গিয়ে জ্বালা করছে। সারা শরীরে কাদা। কিন্তু এসব নিয়ে মাথা ঘামালে চলবে না। বৃষ্টি থেমে গেছে। এখনি আবার শুরু হবে টহলদারি। আমার পেটমোটা রেক্সিনের ব্যগটা আগেই এদিকে ছুঁড়ে দিয়েছে কারবারি। একটু খুঁজতে হল ব্যগটা। অন্ধকারে গুঁড়ি মেরে কিছুক্ষণ বসে থেকে চোখটাকে সইয়ে নেয়ার পর বেশ যেন দেখতে পাচ্ছি মনে হল। ওই তো – ঝোপ-ঝাড়ের মাঝখানে দেখা যাচ্ছে ব্যগ। কুড়িয়ে নিয়ে দৌড় ! দৌড় ! যেকোনো সময় গায়ে চার-ব্যটারি টর্চের আলো এসে পড়বে – ভয়ে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড় লাগাই।

এক মাইল দূরে নদিতে নৌকা নিয়ে একজন অপেক্ষা করছিল আমার জন্য। আগে থেকেই সেভাবে বন্দোবস্ত করা ছিল। নৌকা আমাকে হাজির-ঘাট পৌঁছে দিল। সেখান থেকে আবার হাঁটা দিলাম। এখনো সকাল হয়নি। নইলে অটোরিক্সা নিতে পারতাম। তবে আমার কাদামাখা ভূতের মতন চেহারা। সকাল না হয়ে ভালোই হয়েছে।

হনহন হাঁটি। তিন মাইল মতন হেঁটে মামাবাড়ি পৌঁছাই । দরজা ধাক্কালে নসু বেরিয়ে আসে। আমি বলি – ‘গামছা দে – আগে স্নান কইরা আসি।‘  স্নান করে এলে মামি আমার ছড়ে যাওয়া চামড়ায় গেন্দা পাতার রস লাগিয়ে দিল।

আমাদের জাতের নিয়ম হল এক মাসের অশুচ। কিন্তু এতদিন কীভাবে থাকব। এক বাড়ির রঙের কাম আধা অবস্থায় ফেলে রেখে এসেছি এবং না জানিয়ে চলে এসেছি। বেশিদিন দেরি করলে বদনাম হবে। একবার বদনাম হলে কাজ পেতে মুশকিল হবে। আগরতলায় আজকাল রঙমিস্ত্রির ছড়াছড়ি। কাজেই সুনাম বাঁচিয়ে চলতে হয়। নসুকে বলি – আজকাল কেউ একমাস অশুচ রাখে না, তেরো দিনে না হলেও পনর দিনে শ্রাদ্ধ করে নেয়। নসুর তাতে আপত্তি নেই, কিন্তু মামি বলে – এরকম করা ঠিক না। মামিকে বোঝাই – এতদিন কেন থাকতে পারব না। তাহলে আমাকে ফিরে যেতে হবে। চেষ্টা করব – শ্রাদ্ধের আগে আবার আসার।

এবার আসতে গিয়ে কেমন দিগদারি হয়েছে, টাকাও কত বেশি লেগেছে, এসব যুক্তি দিয়ে নসু তার মাকে বোঝায়, পনর দিনে শ্রাদ্ধ করে নিতে বলে। আমি যদি আবার না আসতে পারি . . .’বাবার শ্রাদ্ধে মনা থাকব না, এইটা ভাবন যায়?’ মামি বলে – পাপ লাগবে। আমি বলি – এসব নিয়ম মানুষের বানানো, পাপ-পুণ্যের সাথে এসবের সম্বন্ধ নাই।

 মামার শ্রাদ্ধশান্তির আয়োজনে নসুকে সাহায্য করি। মামা কোনোদিন নসুকে আর আমাকে আলাদা চোখে দেখে নি। ওসব কথা মনে করে বুক ফাটে। তবে প্রাণের কথা বোঝানোর জন্য যেসব ভাষা লাগে, সেসব আমার নাই। তাই চুপচাপ দুজনে আলের ধারে বসে বিড়ি টানি। নসু বলে – ‘ইন্ডিয়ার বিড়ি খুব ভালা . . . আর ইন্ডিয়ায় থাকার ফলে আমি অনেক বুদ্ধিমান হয়েছি।

-‘এই কথা ক্যান কস?’

-       ‘ . . মায়েরে কেমন বুঝাইলি, মানুষের বানানো নিয়ম . . .।‘

মনে ভাবি – নিয়ম বদলায় পেটের দায়ে। একমাস কামকাজ বন্ধ করতে হলে পেটের ভাতে টান পড়ে . . । নসুদের সেই দুর্ভাগ্য হয় নি, তাই তারা একমাস ধরে শোক পালন করতে পারে। মনে দুঃক্ষ হয়, আমাদের কোনো উপায় নাই একমাস ধরে বিনা কাজে দিন কাটানোর। নসু আমার মুখের দিকে তাকায়, হয়তো বোঝে আমার মনের কষ্ট, বলে – ‘আইজকাইল কম আসস !’   

আমি বলি, আসা কেমন কঠিন হয়েছে এখন। এবারের আসার অভিজ্ঞতা আরো বিশদভাবে বলি নসুকে, কীভাবে প্যাকে ডুবে পার হয়েছি শুনে নসু বলে – ‘হালা, ভাষা এক, মানু* এক, ডাইলভাত এক, তবুও দুই দেশ !’

শ্রাদ্ধ হয়ে গেলেই রওয়ানা দিলাম। এবারও বর্ডার-সংলগ্ন এক বাড়িতে এসে দুই দিন অপেক্ষা করেতে হল । কপাল খারা‌প, বেড়া টপকাতেই বি.এস.এফ. ধরে ফেলল।  এবং আমাকে বাংলাদেশি হিসাবে জেলে ঢোকাল। আমিও বললাম না যে আমি ভারতের নাগরিক। পনর দিন জেলের ভাত খেলাম। ততদিনে প্রজাতন্ত্র দিবস পেরিয়ে গেল। জেলের মিয়াদ শেষ হলে বি.এস.এফ. আমাকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করল। দিনের বেলা একদিক দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাল। রাতে অন্যদিক দিয়ে ফিরে এলাম।

মাঝরাতে বাড়ি পৌঁছলাম। এতদিন আমার কোনো খবর না পেয়ে মা-বাবা, ওদিকে নসু আর মামিমা তো দুশ্চিন্তায় অস্থির। নসুকে হোয়াটস-আ্যপ করলাম। আমার মেসেজ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে নসু ফোন করে। বলি – ‘এখনো ঘুমাস নাই?’

-       ‘ঘুম ছুইট্টা গেছে আইজ পনর দিন !’

আমি আমার ধরা পড়ার কথা বলি। নসুর সাথে আমার কথোপকথন মা-বাবা শোনে।  মা ঘন ঘন কপালে হাত জোড় করে অদৃশ্য দেবতাদের প্রণাম করে। মায়ের অসংখ্য দেবদেবীদের সোয়া পাঁচ আনা পূজার মানত পনর দিন আগেই হয়ে গেছে, এ তো জানা কথা। এই ঘন ঘন প্রণাম যে সেইসব মানত রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি পালনের দৃঢ় সঙ্কল্পকে নিশ্চিত করছেন মা, বুঝতে অসুবিধা হয় না। আমি বলি – ‘তোমার দেপতাদের পরে দিলেও চলব, আমারে এক্ষুণি সিদ্ধভাত রাইন্ধা দেও, খুদায় পেট পাকাইতাছে। ‘ মা ভাত বসায়। ফুটন্ত ভাতের সুগন্ধ এই দেশ, ওই দেশ, দুই দেশের বাতাসকে একাকার করে দেয়। গরম ভাত থালায় বেড়ে হাতা দিয়ে মেলে দেয় মা, একটু ঠাণ্ডা হবে বলে। আলুসিদ্ধ চটকাতে চটকাতে  জিজ্ঞাসা করে – ‘মামিরে কেমন দেখলি?‘

 -‘ভালা না। এক্কেরে চুপচাপ হইয়া গেছে।‘   

  ভাত মাখতে মাখতে মাকে বলি – ‘মামিরে কইয়া আইছি, বর্ষার সময় তোমারে কিছুদিনের লাইগ্যা তাইনের কাছে রাইখ্যা আইমু।‘

-‘আমি তো চকম বাইয়া পার হইতে পারুম না।‘

-‘অন্য ব্যবস্থা আছে। . . . সোনামুড়ার বর্ডার দিয়া বেড়া কাইট্যা পার করাইয়া দেয়। টেকা আরো বেশি নিব . . . ।‘

মা ঘাড় নেড়ে সম্মতি দেয়। বুকচিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর আপনমনে বলে – ‘টেকাই তো সব না।‘

মনে মনে ভাবি – মা ঠিক কথা বলছে।

 

                                                          -------------

*শইল - শরীর

* চকম - মই

 *মানু -মানুষ

 

Comments

Popular posts from this blog

স্ত্রীর পত্র

কচুয়া শাড়ি দারাসিং লাফ